বিইআইয়ের জরিপের ফল
৪০% মানুষ গণভোট সম্পর্কে সচেতন
৫০% নাগরিক নির্বাচন–পরবর্তী দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী।
সংলাপে উঠে এসেছে, গণভোট নিয়ে বেশির ভাগ মানুষের স্বচ্ছ ধারণা নেই।
দেশের ৪০ শতাংশ মানুষ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় গণভোট সম্পর্কে সচেতন। আর ৩০ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়িত হবে।
এমন তথ্য জানিয়েছে বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই)। গতকাল বুধবার রাজধানীর গুলশানে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এমন তথ্য উপস্থাপন করে সংস্থাটি। সংস্থাটি ‘শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও সহিংসতা প্রতিরোধ: মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার আলোকে’ একটি গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে।
সংস্থাটি জানায়, তারা মাঠপর্যায়ে ভোটারদের সঙ্গে সংলাপ ও উপস্থিত জরিপ করেছে। সেখানে এমন তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটির সংলাপ এবং উপস্থিত জরিপে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেন ৪০০ নারী–পুরুষ। আর বিইআই অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ করেছে ২০০ জনের সঙ্গে। এর মধ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ছিলেন। এ ছাড়া বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধি এবং প্রতিটি এলাকার প্রার্থী ও নাগরিকেরাও এতে মতামত দিয়েছেন।
বিইআই জানায়, ৫০ শতাংশ নাগরিক নির্বাচন–পরবর্তী দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। আর ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ সহিংসতাবর্জিত নির্বাচন হবে বলে প্রত্যাশা করেন। মানুষ চান একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাঁদের প্রত্যাশা, নির্বাচনে কোনো কারচুপি, ভয়ভীতি ও পক্ষপাত থাকবে না।
বিইআই জানায়, সংলাপে উঠে এসেছে, গণভোট নিয়ে বেশির ভাগ মানুষের কোনো স্বচ্ছ ধারণা নেই। ভোটাররা গণভোট নিয়ে আরও বেশি প্রচার–প্রচারণার দাবি জানিয়েছেন। সংলাপ ও জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন বিইআইয়ের উপপরিচালক সামিউল হক।
সংস্থাটির সংলাপ এবং উপস্থিত জরিপে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেন ৪০০ নারী-পুরুষ। ২০০ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।
গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশে আগের ১২টি নির্বাচন থেকে আলাদা। কারণ, এই নির্বাচনে নির্ধারিত হবে, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক রূপান্তরে যাত্রা শুরু করবে কি না। রাজনৈতিক দল, বিশ্লেষক এবং সংশ্লিষ্ট মহল যদি এই বাস্তবতা বুঝতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে একটা বড় বিপদের মুখোমুখি হবে।
গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো না থাকাকে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘যে প্রতিষ্ঠানগুলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা তৈরি করে, সেই প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরির ব্যাপারে আমরা আন্তরিক কি আন্তরিক না, রাজনৈতিক দলগুলোকেই এ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’
বিদ্যমান সংবিধান অতীতে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ তৈরিতে সহায়তা করেছে উল্লেখ করে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে রাজনৈতিক দলগুলো যদি শুধু ক্ষমতার পালাবদলের জন্য একটি গতানুগতিক নির্বাচন হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে দেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণ প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশে আগের ১২টি নির্বাচন থেকে আলাদা। কারণ, এই নির্বাচনে নির্ধারিত হবে, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক রূপান্তরে যাত্রা শুরু করবে কি না।অধ্যাপক আলী রীয়াজ, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী
বিদ্যমান সংবিধানকে অক্ষুণ্ন রেখে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয় বলে মনে করেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, যে সংস্কারগুলো অন্তর্বর্তী সরকার করেছে, সেটা নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় যাওয়া দল যদি ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদে উপস্থাপন না করে, তাহলে সেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর হয়ে যাবে।
জুলাই জাতীয় সনদকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সাধারণ মানুষের একটা চুক্তি বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্ব নিতে হবে।
গোলটেবিল আলোচনায় স্বাগত বক্তব্য দেন বিইআইয়ের সভাপতি ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে তাঁরা মাঠপর্যায়ে মানুষের প্রত্যাশা, অভিমত ও উপস্থিত জরিপ করেছেন।
সাবেক এই রাষ্ট্রদূত জানান, জনমতের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা দেখেছেন, দেশের জনগণ ইতিমধ্যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। তবে মানুষ বেশ কিছু বিষয়ে এখনো শঙ্কায় রয়েছেন। যদিও তাঁরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন।
হুমায়ুন কবির জানান, মাঠপর্যায়ে তাঁরা দেখেছেন, দেশের তরুণ প্রজন্ম উচ্ছ্বাস নিয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য অপেক্ষায় আছে। বিইআই মনে করে, চার কোটি তরুণ ভোটার আগামী নির্বাচনে ফল নির্ধারণে ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবেন। এ ছাড়া প্রায় ৫১ শতাংশ নারী ভোটারও ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবেন।
বিইআইয়ের ফেলো ও সাবেক রাষ্ট্রদূত ফারুক সোবহান বলেন, মানুষ নির্বাচনী সহিংসতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। ভোটাররা বারবার নিরাপত্তা, সুষ্ঠু ভোট, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং উত্তেজনা নিয়ে তাঁদের ভয় ও উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
যে সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমে সেই সংস্কার দৃশ্যমান হচ্ছে না বলে উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমেনা মহসিন। তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট অবস্থান জানানোর আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন, এনসিপির প্রতিনিধি আলাউদ্দিন মোহাম্মদ, এবি পার্টির প্রতিনিধি আলতাফ হোসেন, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির আবদুল্লাহ আল হারুন প্রমুখ।