বাবার চোখে পানি দেখে নিজেকে আড়াল করলেন মেয়ে

দুর্নীতির মামলায় পুলিশি পাহারায় আদালতে আনা হয়েছিল অধ্যাপক আবুল বারকাতকে। ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ছবি: প্রথম আলো

সময় তখন দুপুর ১২টা ২২ মিনিট। কাঠগড়ার পেছনে দাঁড়িয়ে আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবুল বারকাত। তাঁর দিকে বারবার তাকাচ্ছিলেন মেয়ে অরণি বারকাত। প্রতিবারই চোখ ভিজে উঠছিল তাঁর। মুখ ঘুরিয়ে অশ্রু লুকানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি।

আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলার ফাঁকে আড়চোখে এই দৃশ্য দেখেন অধ্যাপক বারকাত। তাঁর চোখেও পানি আসে। কথা বন্ধ করে তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন। বাবার অশ্রুসিক্ত চোখ দেখে আদালতের এক কোণে নিজেকে আড়াল করে নেন অরণি।

বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বাবা-মেয়ের এমন আবেগঘন দৃশ্য দেখা যায়।

তাঁদের এক আত্মীয় প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাত মাস ধরে উনি (অধ্যাপক আবুল বারকাত) কারাগারে আছেন। এই মামলায় গ্রেপ্তার পাঁচজন জামিন পেয়েছেন। তবে টাকার অভাবে ভালো আইনজীবী ধরতে পারেননি। উনি খুবই সাধারণ মানুষ। কার কাছে যাবেন, কীভাবে গেলে সহজে জামিন পাবেন, সেটা জানেন না। সে জন্য এখনো জামিন হয়নি।’

দুদকের একটি মামলায় অভিযোগপত্র (চার্জশিট) গ্রহণের শুনানির থাকায় অধ্যাপক বারকাতকে সকাল ১০টার দিকে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে এনে হাজতখানায় রাখা হয়। দেড় ঘণ্টা পর মহানগর আদালতে তোলার জন্য তাঁকে হাজতখানা থেকে বের করা হয়। এ সময় তাঁর শরীরে ছিল বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, মাথায় হেলমেট। দুই হাতে পরানো ছিল হাতকড়া।

কিছুক্ষণ পর তাঁকে আদালতের কাঠগড়ায় তোলা হয়। সে সময় তিনি এদিক–ওদিক কাউকে খুঁজছিলেন। পরিচিত কয়েকজন শিক্ষার্থী ও সহকর্মী তাঁর সঙ্গে সালাম বিনিময় করেন। পরে তিনি কাঠগড়ার ভেতরের বেঞ্চে বসে পড়েন। দুপুর ১২টার দিকে তাঁর মেয়ে, জামাতা ও কয়েকজন নিকটাত্মীয় আদালতে আসেন। তাঁদের দেখে তিনি খুশি হন এবং বেঞ্চ থেকে উঠে কাঠগড়ার পেছনের অংশ এসে সবার সঙ্গে ইশারায় কুশল বিনিময় করেন।

দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে দুদকের মামলায় অভিযোগ গ্রহণের বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। অন্যান্য আসামির পক্ষে আইনজীবী মাসুদ আহমেদ তালুকদার জামিনের আবেদন করলেও আদালত তা নামঞ্জুর করেন। আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে মামলার পলাতক সব আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

শুনানি শেষে আবুল বারকাতকে আবার হেলমেট, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হাতকড়া পরিয়ে আদালতের হাজতখানার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।

তাঁকে আদালত থেকে বের করার সময় উপস্থিত এক আইনজীবী প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। তাঁকে জঙ্গিদের মতো নেওয়া হচ্ছে কেন?’

এ বিষয়ে দুদকের আইনজীবী তরিকুল ইসলাম বলেন, আবুল বারকাতসহ অন্য আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে জনতা ব্যাংক থেকে ২৯৭ কোটি ৩৮ লাখ ৮৭ হাজার ২৯৬ টাকা আত্মসাৎ করেছেন, যা সুদে-আসলে বেড়ে ৫৩১ কোটি টাকা হয়েছে। আজ এই মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণের বিষয়ে শুনানি ছিল। আদালত অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিলসংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৪ মার্চ তারিখ রেখেছেন।

মামলার অপর আসামিরা হলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান, সাবেক ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান, সাবেক সহকারী পরিচালক মোছাম্মৎ ইসমত আরা বেগম, জনতা ব্যাংকের সাবেক পরিচালক জামাল উদ্দিন আহমেদ, মো. ইমদাদুল হক, নাগিবুল ইসলাম দীপু, আর এম দেবনাথ, মো. আবু নাসের, সঙ্গীতা আহমেদ ও অধ্যাপক নিতাই চন্দ্র নাথ। এ ছাড়া জনতা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আবদুছ ছালাম আজাদ, সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক আজমুল হক, সাবেক এজিএম অজয় কুমার ঘোষ, সাবেক ম্যানেজার (শিল্প ঋণ–১) মো. গোলাম আজম, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহজাহান, এসইও মো. এমদাদুল হক, সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক মো. আবদুল জব্বার, সাবেক ডিএমডি মো. গোলাম ফারুক ও ওমর ফারুক, এননটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. ইউনুছ বাদল, মেসার্স সুপ্রভ স্পিনিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন ও পরিচালক মো. আবু তালহা।