ঈদযাত্রায় ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুরে সবচেয়ে বেশি যানজটের শঙ্কা, মহাসড়কে ২০৭টি যানজটপ্রবণ স্থান চিহ্নিত

  • গত ঈদের চেয়ে যানজটপ্রবণ স্থান বেড়েছে ৪৮টি।

  • ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুরে সবচেয়ে বেশি যানজটের শঙ্কা

  • ২-৩ দিনে ঢাকা ছাড়বে দেড় কোটি মানুষ।

  • বাড়তি ভাড়া নিলে রুট পারমিট বাতিল।

আসন্ন ঈদযাত্রায় সারা দেশের সড়ক-মহাসড়কে ২০৭টি স্থানে যানজটের আশঙ্কা রয়েছে।ফাইল ছবি: প্রথম আলো

এবারের ঈদযাত্রায় সারা দেশে যানজটের গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য ২০৭টি স্থান চিহ্নিত করেছে হাইওয়ে পুলিশ। ঈদে ঘরমুখী মানুষের চাপে এসব স্থানে যানজট হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে

আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সম্মেলনকক্ষে ঈদযাত্রা নিয়ে বৈঠকে এ তথ্য উঠে আসে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলন করেন সড়কমন্ত্রী।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, প্রতিবার ঈদের আগে যানজটপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে হাইওয়ে পুলিশ। গত ঈদুল ফিতরে যানজটপ্রবণ এলাকার সংখ্যা ছিল ১৫৯। গতবারের চেয়ে এবার যানজটপ্রবণ স্থান বেড়েছে ৪৮টি। গতকালের বৈঠকে যানজটপ্রবণ স্থানগুলোতে ঈদের আগে ও পরে পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে যানজট হতে পারে এমন ২০৭টি স্থানের মধ্যে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে আছে ১৪টি, ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কে ৫৫টি, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ২১টি, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ৪৩টি, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৪৫টি, ঢাকা-কক্সবাজার মহাসড়কে ৯টি, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কে ১৪টি, যশোর-খুলনা মহাসড়কে ৬টি রয়েছে।

চাঁদাবাজির পক্ষে আবারও মন্ত্রী

বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে ঈদে সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধে করণীয় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সড়কমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে মালিক বা শ্রমিক সমিতি যদি নিবন্ধিত ও বৈধভাবে তাদের কল্যাণ তহবিলের জন্য নির্ধারিত অর্থ সংগ্রহ করে, সেটিকে চাঁদাবাজি বলা যাবে না।

এর মাধ্যমে সরকার চাঁদাবাজিকে বৈধতা দিচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, কোনো সমিতি বা সংগঠনের বৈধতা না থাকলে এবং তারা স্বেচ্ছাচারীভাবে মালিক বা শ্রমিকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করলে তা চাঁদাবাজি হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের অভিযোগ নির্দিষ্টভাবে জানালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নিয়ে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে শেখ রবিউল আলম বলেছিলেন, ‘সড়কে পরিবহনের চাঁদা যেটা বলা হয়, সেভাবে আমি চাঁদা দেখি না। মালিক সমিতি, শ্রমিক সমিতি আছে, তারা তাদের কল্যাণে এটা ব্যয় করে। এটা অলিখিত বিধির মতো। চাঁদা আমি সেটাকে বলতে চাই, যেটা কেউ দিতে চায় না বা বাধ্য করা হয়। মালিক সমিতি নির্দিষ্ট হারে টাকা তুলে মালিকদের কল্যাণে ব্যবহার করতে চায়। কতটুকু ব্যবহার হয়, সেটা নিয়ে হয়তো বিতর্ক আছে। কিন্তু তারা সমঝোতার ভিত্তিতে এ কাজটা করে।’

সড়ক পরিবহন আইনে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের কল্যাণে চাঁদা তোলার কোনো বিধান নেই। অতীতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সরকার আমলে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে নেওয়া চাঁদার বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সমালোচনার মুখে আর এগোয়নি। পরিবহন খাতে প্রতিদিন প্রতিটি যানবাহন থেকে চাঁদা তোলার অভিযোগ আছে। এর ফলে যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী যানের ভাড়া বেড়ে যায়, যার প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।

ঈদে দেড় কোটি মানুষ ঢাকা ছাড়বে

নিরাপদ ও স্বস্তির ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন খাতের সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা, মালিক-শ্রমিক সংগঠন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করা হয় বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। এসব বৈঠক থেকে নেওয়া সিদ্ধান্ত সম্পর্কে শেখ রবিউল আলম বলেন, ঈদের আগে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি মানুষ ঢাকা ছাড়বেন, যা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। তবে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি তৎপর থাকবে এবং সমন্বিত প্রস্তুতির মাধ্যমে স্বস্তির ঈদযাত্রা নিশ্চিত করা হবে।

ঈদযাত্রায় শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) বাসের ভাড়া দ্বিগুণ হয়ে যায়, কমানোর উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে সড়কমন্ত্রী বলেন, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কেউ বেশি নিতে পারবে না। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বা অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে এক টাকাও বেশি নেওয়া হলে সংশ্লিষ্ট পরিবহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এমনকি প্রয়োজন হলে রুট পারমিট বাতিল করা হবে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, হাইওয়ে পুলিশ ও ভ্রাম্যমাণ আদালত সড়কে তদারকি জোরদার করবে।

অবশ্য সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এসি বাসের ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে না। এ সুযোগে ঈদে বা উৎসবে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করে থাকেন এসি বাসের মালিকেরা। সড়কমন্ত্রী হয়তো এই বিষয় সম্পর্কে অবগত নন।

সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী আরও বলেন, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে মহাসড়কে অস্থায়ী দোকান, অবৈধ পার্কিং ও ব্যাটারিচালিত যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। চলাচলের অনুপযোগী বা বিকল হওয়ার ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন সড়কে নামতে দেওয়া হবে না। পাশাপাশি সড়কের চলমান সংস্কারকাজ দ্রুত শেষ করে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী জানান, পোশাক কারখানাগুলো ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে একসঙ্গে অতিরিক্ত চাপ তৈরি না হয়। এ ছাড়া প্রয়োজনে বিআরটিসির অতিরিক্ত বাস প্রস্তুত রাখার বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে যাত্রীরা নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন।

ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছে: ঢাকার পাঁচটি টার্মিনালে সিসিটিভির মাধ্যমে নজরদারি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। পদ্মা ও যমুনা সেতু এবং কর্ণফুলী টানেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে টোল আদায়ের বুথ চালু থাকবে। ১৭ থেকে ২৩ মার্চ পর্যন্ত মহাসড়কে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল বন্ধ রাখা হবে। যাত্রী পারাপারে পর্যাপ্ত ফেরির ব্যবস্থা রাখা হবে এবং রাজধানীর কাঞ্চন ব্রিজ ও বছিলা এলাকায় লঞ্চ চলাচলের ব্যবস্থাও করা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন রেল ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও সেতু বিভাগের প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি ও বিএনপি নেতা শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের শীর্ষস্থানীয় নেতা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।