মেহেরপুরে ছুটির দিনে ঈদের কেনাকাটার ধুম, দরজির দোকানে অর্ডার নেওয়া বন্ধ

কাপড়ের দোকানগুলোতে ছুটির দিনে ক্রেতাদের ভিড়। শুক্রবার বিকেলে মেহেরপুর শহরের বড় বাজার এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সাধারণত মেহেরপুর শহরের পথেঘাটে আলস্য নামে। কিন্তু ঈদ সামনে থাকায় বদলে গেছে দৃশ্যপট। সকাল থেকেই মেহেরপুর শহরের বড় বাজার, মল্লিক পাড়া ও হোটেল মোড় এলাকার বিপণিবিতানগুলোতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। ছুটির দিনে দোকানপাটে ক্রেতা সামলাতে হিমশিম খান বিক্রেতারা। তবে ভিন্ন চিত্র দরজির দোকানে। সেখানে এখন ‘নতুন অর্ডার নেওয়া বন্ধের’ নোটিশ।

মেহেরপুর শহরের বড় বাজার এলাকায় ঐতিহ্যবাহী ও শতবর্ষী কাপড়ের দোকান ‘আগারওয়াল বস্ত্রালয়’। শুক্রবার সকালে সেখানে স্তূপ করা কাপড়ের মধ্য থেকে প্রিয় পোশাকটি খুঁজে নিতে দেখা যায় ক্রেতাদের। আগারওয়াল বস্ত্রালয়ের স্বত্বাধিকারী মোহন কুমার চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘অন্যান্য শুক্রবারে আমরা সাধারণত দোকান বন্ধ রাখি। এবার ঈদের কেনাকাটার যে জোয়ার শুরু হয়েছে, তাতে ক্রেতাদের সুবিধার্থে আজ দোকান খুলে রাখতে হয়েছে। এবার বাজারে পাকিস্তানি সালোয়ার-কামিজের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তবে সিল্ক, সুতি, অরগেন্ডি আর টিস্যু কাপড়ের সালোয়ার-কামিজের চাহিদাও কোনো অংশে কম নয়।’

​এবারের ঈদে মেহেরপুরের নারীদের কেনাকাটায় আভিজাত্য আর আরামের সমন্বয় দেখা গেছে। সুতি ও ভয়েল কাপড়ের বাহারি ডিজাইনের পাকিস্তানি ও ভারতীয় লন সেটগুলো পছন্দের শীর্ষে রয়েছে। ফ্যাশন–সচেতন তরুণীদের প্রিয় হালকা নীল, গোলাপি বা হালকা সবুজ রঙের আনারকলি স্যুট। আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের মিশেলে ডিজাইন করা শারারা ও গারারা সেট, স্বাচ্ছন্দ্য ও স্টাইলের জন্য স্ট্রেইট কাট সিল্ক স্যুট বা কুর্তার সঙ্গে চওড়া পালাজ্জোর চাহিদাও অনেক। এ ছাড়া গরমে ফ্লোরাল প্রিন্টের সুতি কাপড়ের আরামদায়ক কাপড়ের চাহিদা এবার বেশি।

​পুরুষদের ফ্যাশনেও এসেছে পরিবর্তন। তরুণদের মধ্যে এবার ড্রপ শোল্ডার ডিজাইনের পাঞ্জাবি ও শার্টের ব্যাপক চাহিদা লক্ষ করা যাচ্ছে। ফ্যাশনে নতুনত্বের জন্য ট্রাউজার বা জিনস হিসেবে বুটকাট প্যান্ট এখন চাহিদার শীর্ষে। তবে অনেক ক্রেতা এমব্রয়ডারি করা সুতি পাঞ্জাবি, পাঠান স্যুট বা হালকা কাজের শেরওয়ানি পছন্দ করছেন।

ক্রেতারা ঈদের কেনাকাটা করছেন। শুক্রবার বিকেলে মেহেরপুর শহরের বড় বাজার এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

​শহরের দরজির দোকানগুলোতে কারিগরদের যেন দম ফেলার সময় নেই। দিন-রাত মেশিনের খটখট শব্দে মুখর থাকলেও অনেক টেইলার্স এরই মধ্যে দোকানের সামনে ঝুলিয়ে দিয়েছে ‘অর্ডার নেওয়া বন্ধ’র সাইনবোর্ড।

​শহরের কেশবপাড়া এলাকার শাপলা টেইলার্স। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী হাসেম মিয়া বলেন, কাজের চাপে তাঁরা দিশেহারা। আগে যে পরিমাণ কাপড় তৈরির অর্ডার নেওয়া হয়েছে, সেগুলোই ঈদের আগে শেষ করা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আগে যে অর্ডারগুলো নিয়েছি, সেখান থেকে সব কটি সালোয়ার-কামিজ সময়মতো তৈরি করে দেওয়া সম্ভব হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।’

কাপড় হাতে নিয়ে বিভিন্ন দরজির দোকানে ঘুরছেন ক্রেতারা। কারিগরেরা সাফ জানিয়ে দিচ্ছেন—এখন অর্ডার নিলে ঈদের আগে পোশাক সরবরাহ করা অসম্ভব। অনেকে কাপড় কিনেও তা বানাতে না পেরে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।

পৌর শহরের বাসিন্দা ইরানি আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘শ্বশুরবাড়ি, মামাবাড়ি আর বাবার বাড়ি মিলিয়ে পাঁচটি সালোয়ার–কামিজ পেয়েছি। কিন্তু বিপাকে পড়েছি, এখন ভালো মানের দরজিরা আর নতুন অর্ডার নিচ্ছে না। কীভাবে নতুন পোশাক বানাব, তা ভেবে পাচ্ছি না।’

​শুক্রবার সরেজমিন দেখা গেছে, দুপুরের পর থেকে ভিড় আরও বেশি। বিশেষ করে নারী ও শিশুদের পোশাকের দোকানগুলোতে ভিড় সবচেয়ে বেশি। দাম নিয়ে ক্রেতাদের কিছুটা অসন্তোষ থাকলেও কেনাকাটায় তার প্রভাব পড়েনি।

​সুমি আক্তার নামে একজন ক্রেতা বলেন, ‘বাচ্চাদের কাপড় কেনা শেষ। এখন নিজের জন্য শাড়ি ও থ্রি-পিস দেখছি। তবে গত বছরের তুলনায় এবার কাপড়ের দাম অনেকটা বেশি মনে হচ্ছে। আর দরজিরা কাপড় নিতে চাইছেন না, এটাই বড় সমস্যা।’

বড় বাজারের চারটি বস্ত্রবিতান ঘুরে দেখা গেছে, এবার মেয়েশিশুরা পছন্দ করছে সালোয়ার-কামিজ, ফ্রক, টিউনিক, ঘাগরা-চোলি, ওয়ান–পিস, টু–পিস ও থ্রি–পিস।

আরও আছে সারারা, খাটো কামিজ ও লেহেঙ্গা ধাঁচের স্কার্ট। আগে ফ্রক ও টিউনিকের চাহিদা বেশি থাকলেও এবার সালোয়ার-কামিজ আর ঘাগরা-চোলির দিকেই ঝোঁক বেশি। ছেলেশিশুদের পছন্দ পাঞ্জাবি–পাজামা, কাবলি পাঞ্জাবি, টি-শার্ট, পোলো শার্ট ও ফতুয়া। এ ছাড়া আছে হাফহাতা, ফুলহাতা এবং থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট।

ভিড় সামলাতে মেহেরপুর শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বিশেষ করে বড় বাজার ও হোটেল মোড় এলাকায় রিকশা, ইজিবাইক ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ জটলা নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ট্রাফিক পুলিশকে।

মেহেরপুর জেলা দোকান মালিক সমিতির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁরা সজাগ রয়েছেন এবং ঈদের আগে প্রতিদিন গভীর রাত পর্যন্ত দোকানপাট খোলা রাখা হবে। একাত্তরের স্মৃতিবিজড়িত এই প্রাচীন জনপদে এখন উৎসবের আমেজ।