‘কামে আইমু, যাইমু, দিবস–টিবস জানি না’
রাজধানীর মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে আসাদ অ্যাভিনিউ হয়ে নূরজাহান রোডের দিকে ভ্যান টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন ৭৫ বছর বয়সী চালক আবুল কাশেম। তাঁর ভ্যানে কলার আঁটি বোঝাই করা। ধীরে ধীরে সামনে এগোচ্ছিলেন তিনি। এভাবে ভ্যান টেনে এনেছেন রায়েরবাজার থেকে।
আজ শুক্রবার বেলা ১১টায় আবুল কাশেমের সঙ্গে দেখা হয়। তাঁর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে জানতে চাই, আজ তো মহান মে দিবস। সরকারি ছুটি। তার ওপর শুক্রবার। এইদিনেও কাজ করতে হচ্ছে কেন।
উত্তরে আবুল কাশেম বললেন, ‘মে দিবস কারে কয়, ওই সব আমি জানি না।’ এই বৃদ্ধ ভ্যানচালকের বাড়ি শরীয়তপুরের জাজিরায়। তিনি থাকেন কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরায়। সেখানে তাঁর তিন ছেলেও থাকেন। তবে তাঁরা কেউ আবুল কাশেমের খরচ বহন করেন না।
আধা পাকা যেই ঘরটিতে থাকেন আবুল কাশেম, সেটির ভাড়া তিন হাজার টাকা। নিজের উপার্জনের টাকা থেকে মাস শেষে এই ভাড়া পরিশোধ করতে হয় তাঁকে।
আবুল কাশেমের বড় ছেলেও রিকশা চালান। মেজ ছেলে একটি দোকানে কাজ করেন। আর ছোট ছেলে একটি কারখানায় কাজ করে। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা শ্বশুরবাড়িতে থাকেন। স্ত্রী থাকেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়।
ছেলেমেয়েরা সবাই নিজেদের মতো করে আছেন। প্রতিদিন শুধু রাতের বেলা ছেলেদের থেকে এক বেলা খাবার খান আবুল কাশেম। সকাল আর দুপুরে নিজের টাকায় খেয়ে নেন। ছেলেদের কথা তুলতে তিনি বললেন, ‘যার যার সংসার লইয়া হে পেরেশান। কে কারটা দেখে। নিজের ওপরেই ভরসা।’ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এখন বেশি কাজ করতে পারেন না তিনি। মাসে ১৫ থেকে সর্বোচ্চ ২০ দিন ভ্যান চালান। তিনি বললেন, ‘অনে আমার জানে কুলায় না। বহুত কষ্ট করে খাটতাসি।’
দুপুরের দিকে ধানমন্ডি ৫ নম্বরে নির্মাণাধীন একটি ভবনে কাজ করছিলেন শুক্কুর আলী। তাঁর বয়স ৫৫ বছর। বাড়ি সিরাজগঞ্জ। কাজের প্রয়োজনে থাকেন নির্মাণাধীন ভবনে অন্য শ্রমিকদের সঙ্গে। ভবনের ১১ তলায় তাঁর সঙ্গে কথা হয়।
শুক্কুর আলীর কাছেও জানতে চাই, আজ মে দিবস। এই দিনেও তিনি কাজ করছেন কেন? উত্তরে তিনি বললেন, ‘খাই অইল কাজ কইরা, কাজ না করলে খামু কী?’
মে দিবস সম্পর্কে শুক্কুর আলীও তেমন কিছু জানেন না। জানার প্রয়োজনও হয়নি কখনো। কারণ, এমনিতেই মাসের কয়েক দিন কাজ জোটে না তাঁর। যেদিন কাজ থাকে না সেদিন আয়ও থাকে না। তাঁর ভাষায়, ‘আইজকা কাজ করতেছি, আইজকা হাজিরা আছে। কাজ করতেছি না, হাজিরা নাই।’
হাজিরা অনুযায়ী রোদ, বৃষ্টি, ঝড় যা–ই থাকুক, প্রতিদিন কাজ করেন শুক্কুর আলী।
শুক্কুর আলীর দুই ছেলে দুই মেয়ে। বড় ছেলে ও মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। মেয়ে থাকে সিরাজগঞ্জে শ্বশুরবাড়িতে। আর বড় ছেলেও পরিবার নিয়ে আলাদা থাকেন। তাই এখন ছোট দুই ছেলেমেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে তাঁর পরিবার। পরিবারকে রাখেন হেমায়েতপুরে।’
শুক্কুর আলী কাজের ফাঁকে জানালেন, খরচ বাদে মাসিক আয় তাঁর ১২ হাজার থেকে ১৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে যেই ঘরে পরিবার থাকে, সেখানকার ভাড়া ছয় হাজার টাকা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাগোরে একদিন কাজ না করলে অনেক সমস্যা। সংসার, ছেলেপেলে, সব চিন্তা করলে কাজ না করে উপায় নাই।’
ভ্যানচালক আবুল কাশেম, নির্মাণশ্রমিক শুক্কুর আলীর মতো গৃহকর্মীর কাজ করা হুসেনা বেগমের কাছেও মে দিবস কোনো বিশেষ দিন নয়। বরং প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করেই চলে তাঁর সংসার।
সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর শেখেরটেক ৪ নম্বর রোডের একটি বাড়ির সামনে কথা হয় হুসেনা বেগমের সঙ্গে। তিনি তখন প্রথম বাসার কাজ শেষে হুড়াহুড়ি করে পরের বাসায় যাচ্ছিলেন। সেই বাসায় কাজ শেষে আরও একটি বাসায় তাঁর কাজ করতে হবে।
মে দিবস সম্পর্কে জানতে চাইলে হুসেনা বেগম বলেন, ‘তুমি না কইলে ত আমি পাগলের মতো যাইতাম আরক জাগাত। ওইসব দিবস দিয়া কী অইব।’
৪৭ বছর বয়সী হুসেনা বেগম থাকেন শেখেরটেক ৭ নম্বর রোডের মাথায় আহসান উল্লাহ মাস্টার বাড়ির পাশের একটি জায়গায়। সেখানে টিনশেডের এক রুমে তাঁর দুই ছেলেকে নিয়ে থাকেন তিনি। জানান, বড় ছেলেকে একটি গাড়ির কারখানায় কাজ শিখতে দিয়েছেন। আর ছোট ছেলে পড়ে সপ্তম শ্রেণিতে। স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে অন্য জায়গায় থাকেন। তাই সংসারের খরচের ভার হুসেনা বেগমের কাঁধেই।
তিনটি বাসায় কাজ করে হুসেনা বেগমের আয় হয় ১২ হাজার টাকা। সেখান থেকে ঘরভাড়া দেন হয় ৫ হাজার টাকা। বললেন, ‘ঘরভাড়ার সময় অইলে বুঝি, মাস শেষ। এর বাইরে কামে আইমু, কাম থেইকা যাইমু। দিবস টিবস জানি না।’