‘আমার ছেলেকে বাঁচান’, ট্রেন থেকে পড়ে বাঁ হাত ও বাঁ পা হারানো আজমীরের মায়ের আকুতি
বাবার বকাঝকায় অভিমান করে বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাতে কুমিল্লার কাপড়ের দোকান থেকে বেরিয়ে ট্রেনে চড়ে ঢাকায় এসেছিল কিশোর আবু হুরাইবা আজমীর (১৪)। ঢাকায় এসে ভালো না লাগায় পরদিন সকালে আবার কুমিল্লায় ট্রেনে ফিরছিল সে; কিন্তু বাড়ি ফেরার আগেই ঘটে গেল ভয়াবহ দুর্ঘটনা। ঢাকায় বিমানবন্দর এলাকায় চলন্ত ট্রেন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হয় আজমীর। এতে তার বাঁ হাত ও বাঁ পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সে এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
হাসপাতালে ছেলের পাশে বসে আজমীরের মা কুলসুম বেগমের একটাই আকুতি—ছেলেকে বাঁচাতে হবে; কিন্তু চিকিৎসার খরচ জোগানোর সামর্থ্য তাঁদের নেই।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আজমীরের মায়ের ভাষ্যমতে, ট্রেনে এক যুবক জোর করে তার মানিব্যাগ নিয়ে নেয়। মানিব্যাগে ২০০–৩০০ টাকা ছিল। সে বাধা দিলে ওই যুবক তাকে ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। এরপর কী হয়েছে, তা আর বলতে পারেনি আজমীর।
গুরুতর আহত অবস্থায় আজমীরকে ফায়ার সার্ভিসের এক সদস্য উদ্ধার করেন। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকাল আটটার দিকে বিমানবন্দর তৃতীয় টার্মিনাল বরাবর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
পরে ঢাকা রেলওয়ে থানার বিমানবন্দর ফাঁড়ির এক কর্মকর্তা আজমীরকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। এরপর ফায়ার সার্ভিসের ওই সদস্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরে খবর পেয়ে তাঁর আত্মীয়স্বজন হাসপাতালে আসেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আজমীরের বিচ্ছিন্ন বাঁ হাত ও বাঁ পায়ে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। কর্তব্যরত চিকিৎসক জানিয়েছেন, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক। হাসপাতালের পক্ষ থেকে রক্ত সংগ্রহ করে তাঁকে দেওয়া হয়েছে। তবে আরও চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের জন্য রক্তের প্রয়োজন। তাঁর রক্তের গ্রুপ ‘ও পজিটিভ’।
বাবার দোকানে হিসাব রাখত আজমীর
হাসপাতালে আজমীরের মা কুলসুম বেগম প্রথম আলোকে জানান, তাঁর স্বামী আলামিন কুমিল্লায় কাপড়ের ব্যবসা করেন। তাঁদের বাড়ি নরসিংদীর বেলাবর ওয়ারী গ্রামে। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে আজমীর বড়। সে তার বাবার কাপড়ের দোকানের ব্যবসা দেখাশোনা করত। এর আগে সে কুমিল্লার একটি হেফজখানায় পড়ত। সেখানে সে পবিত্র কোরআনের ২০ পারা মুখস্থ করেছিল।
গত কোরবানির ছুটিতে বাড়িতে আসার পর আর হেফজখানায় যায়নি আজমীর। এরপর তাঁকে বাবার কাপড়ের দোকানে বসানো হয়। ব্যবসার হিসাব-নিকাশ ঠিকমতো রাখলেও একদিন এ নিয়ে বাবার বকাঝকা শুনতে হয় তাকে।
কুলসুম বেগমের ভাষ্যমতে, বাবার বকাঝকায় অভিমান করে বুধবার রাতে দোকান থেকে বের হয়ে ট্রেনে চড়ে ঢাকায় চলে আসে আজমীর; কিন্তু ঢাকায় এসে ভালো লাগছিল না তার। তাই পরের দিন সকালে কমলাপুর থেকে চট্টলা এক্সপ্রেসে করে কুমিল্লার উদ্দেশে বাড়ি ফিরছিল সে।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা রেলওয়ে থানার বিমানবন্দর ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. মাহবুব প্রথম আলোকে বলেন, আজমীরের সঙ্গে আরও কয়েকজন কিশোর ছিল। তারা ট্রেনের ছাদে ছিল। তবে আজমীর ট্রেনের ছাদ থেকে পড়েছে, নাকি ট্রেনের ভেতর থেকে পড়েছে, নাকি কেউ তাকে ফেলে দিয়েছে—এই বিষয়ে তাঁরা এখনো নিশ্চিত নন। এই পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, আজমীর একেকবার একেক কথা বলছে। কিছুটা সুস্থ হলে তার সঙ্গে কথা বলে ঘটনার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।