বিদায় হে ২০২৫
আশা, সুখ, শান্তি, স্বস্তি এসব খুবই কম অক্ষরের শব্দ। এ দেশের সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা তত বেশি নয়, খুব সামান্যই। সামান্য, কম কিন্তু সহজে সাধারণ সেসবের নাগাল পায় না। পাবে পাবে করে কেটে গেছে বহু বছর। পাওয়া হয়নি কখনোই। না পেয়ে অনেকেই কপালকে দোষ দেয়। ভাবে ‘কপালের দোষ’।
এই যে কপালের দোষ ভাবে, এটাই হতাশা। হতাশা পয়সা খরচ করে, চেষ্টা করে অর্জন করতে হয় না। মানুষ তা পাওয়ার জন্য প্রার্থনাও করে না কিন্তু পেয়ে যায়। পেয়ে যায় বিনা পয়সায়, মাগনা। যারা অসচেতন, যারা দায়িত্ব–কর্তব্য নিয়ে খুব একটা ভাবেটাবে না, যাদের মনভর্তি স্বার্থপরতা—তারাই যাবতীয় হতাশার মহান উৎপাদক।
আমরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, ঘৃণা, বিভেদে যে অর্জন, তা গৌরবের নয়। গৌরবজনক অর্জন হয় নিষ্ঠায়, প্রেমে, বিশ্বাসে। সকলের জন্য শুভ হোক ২০২৬।
এখন দুঃখের বীজ বপন করে হতাশার চাষাবাদ করা হয়। একশ্রেণির মানুষ জানে, মানুষের দুঃখে ঘা দিলে অতি দ্রুত কাছের বানিয়ে ফেলা যায়। হতাশায়, অনাভ্যাসে ন্যায্য কিংবা ভালো কথা শোনার আগ্রহ ও ধৈর্য কমেছে মানুষের। সে সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য সুবিধাবাদী মানুষ তৈরি হয়েছে, তারা জানে মানুষ ভালোর আশা করে করে ক্লান্ত, অবসন্ন। মন্দ কথা শুনিয়ে অবসন্নদের জাগিয়ে তোলার চেষ্টায় সাধারণের শক্তি গুঁড়ো গুঁড়ো করে ফেলা যায়। মানুষদের রোজ ভেঙে টুকরো টুকরো করা হচ্ছে।
অসভ্যতা, মোটামুটি লম্বা শব্দ। লম্বা কিন্তু ততটা ওজনদার নয়। একত্রে অনেক সংখ্যক মানুষ যদি সগৌরবে অসভ্যতা করে, করতেই থাকে, লম্বা কিন্তু হালকা শব্দটার ওজন বেড়ে যায়। সে ওজনে ঋজু সাধারণ ধীরে কুঁজো হতে থাকে।
মানে দাঁড়াল, এ দেশের বেচারা সাধারণের মনে আশা থাকে, সুখ–শান্তি ও স্বস্তি প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা থাকে, থাকে বলে তারা দুর্ভোগ সয়, বহু ত্যাগ স্বীকার করে, স্বার্থ ত্যাগেও দ্বিধা করে না। এত কিছুর পর তাদের কপালে জোটে অশ্বডিম্ব। সাধারণ চুয়ান্ন বছর ধরে বানরের পিঠা ভাগ দেখে আসছে। বলা যায় চুয়ান্ন বছর ধরে অধিকাংশ সাধারণ আশা করে আর নিরাশ হয়।
হতাশার ভার কাঁধে বয়ে বয়ে একদল এখন বড়ই ক্লান্ত আর একদল প্রচণ্ড পরিমাণে রুষ্ট, ক্ষিপ্ত। জমানো ক্ষোভ যেন বিস্ফোরণের মতো ফেটে পড়ে, মানুষ যেন মানুষ থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হয়, সে চেষ্টার চর্চা চলছে। তাতে কতটা লাভ না ভয়ংকর মাত্রার লোকসান, তা একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখা দরকার। ভেবে দেখা দরকার, প্রায় পুরো একটা জনম আশা করে করে কেটে গেল, আশা পূর্ণ হওয়ার পথে পা ফেলতে পারা হয়নি কেন?
আমরা এখন স্বার্থের খাতিরে মানুষকে মান্য ও অমান্য করি। একসময় এমন ছিলাম না। মানুষ এখন অতিমাত্রায় অশ্রদ্ধাশীল, অবিশ্বাসী। কেউ সহজে কাউকে বিশ্বাস করে না। অদ্ভুত এক মানসিকতায় দৃষ্টিশক্তি ঘোলাটে হয়ে গেছে। যে মানুষের ওপরে বিশ্বাস রাখি, ভাবি সেই কেবল ত্রুটিহীন, অতি বিশেষ। তাঁকে ছাড়া বাকি সবাইকে ভুলে ভরা মানুষ ভাবি। মানুষ এখন অন্যকে দোষারোপ করে আনন্দ পায়, অপরকে ছোট করে, অপমান–অমর্যাদা করে জীবন সার্থক হলো বিবেচনা করে। অতি সহজে অনেক বেশি ক্রুদ্ধ হয়ে যাই এবং সবচেয়ে ভয়ানকভাবে রাগের প্রকাশ ঘটাতে চাই।
আমাদের মধ্যে সমীহের পরিমাণ কমে গেছে। মোটেও যুক্তির ধার ধারি না। আমাদের ভুল হয়, হতে পারে, তা স্বীকার করি না। আমরা বেশ প্রতিহিংসাপরায়ণ এবং স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমাহীন। চুয়ান্ন বছর ধরে অন্যের বলা গল্পে মাথা দোলাতে দোলাতে মানুষ ও মানুষের মগজ ভীষণ রকমের ক্লান্ত।
মানে দাঁড়াল, এ দেশের বেচারা সাধারণের মনে আশা থাকে, সুখ–শান্তি ও স্বস্তি প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা থাকে, থাকে বলে তারা দুর্ভোগ সয়, বহু ত্যাগ স্বীকার করে, স্বার্থ ত্যাগেও দ্বিধা করে না। এত কিছুর পর তাদের কপালে জোটে অশ্বডিম্ব। সাধারণ চুয়ান্ন বছর ধরে বানরের পিঠা ভাগ দেখে আসছে। বলা যায় চুয়ান্ন বছর ধরে অধিকাংশ সাধারণ আশা করে আর নিরাশ হয়।
নতুন একটা বছর এসে দাঁড়িয়েছে জীবনের দরজায়। আশাকে অনেকবার হারিয়েছি। হারিয়েছি অন্যের কথা ও কাজে বিভ্রান্ত হয়ে। হারিয়েছি নিজেকে অন্যের ভাবনাচিন্তার দাস বানিয়ে। হারিয়েছি নিজেকে হারিয়ে ফেলে। একবার একটু নিজের দিকে তাকাই। প্রশ্ন করি, অসংখ্যবার অসংখ্য মানুষ এই দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে, আমরা কি তাদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে দেশের প্রতি সামান্য দায়িত্বশীল হতে পারব না!
ভাবি, বলি এবং বিশ্বাস করি, আমাদের মন কোথাও কারও কাছে বন্ধক দেওয়া নেই। আমাদের মনে কৃতজ্ঞতা রয়েছে, সমস্ত ভালোর প্রতি আমরা শ্রদ্ধাশীল। আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা এই দেশের প্রতি। মানুষকে মানুষ ভাবি। আমাদের ভাব ও ভাষায় দেশ, মানুষের এবং দেশের যেন সামান্যও ক্ষতি না হয়।
আমরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, ঘৃণা, বিভেদে যে অর্জন, তা গৌরবের নয়। গৌরবজনক অর্জন হয় নিষ্ঠায়, প্রেমে, বিশ্বাসে। সকলের জন্য শুভ হোক ২০২৬।