মিটার–বাণিজ্যে আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত হেক্সিং এখন আবার তৎপর

বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর কাছে এই প্রিপেইড মিটার বিক্রি করেছিল হেক্সিংছবি: হেক্সিং বাংলাদেশের ফেসবুক পেজ

বিদ্যুৎ খাতে মিটার সরবরাহ নিয়ে একটি চক্র তৈরি হয়েছিল গত সরকারের সময়। ওই চক্রে ঢুকে শত শত কোটি টাকার ব্যবসা করেছে চীনের কোম্পানি হেক্সিং। সরকারের সঙ্গে যৌথ কোম্পানি খুলে দরপত্র ছাড়াই সরাসরি মিটার বিক্রি করে। অর্থ পাচারের অভিযোগে মামলাও হয়েছিল, তবে ওই চক্রের দাপটে তা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় আওয়ামী লীগ সরকার আমলে। এখন আবার মিটার–বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিতে তৎপর হয়ে উঠেছে কোম্পানিটি।

দেশে বিদ্যুৎ খাতের ছয়টি বিতরণ সংস্থাকে সতর্ক করে গত ১৯ অক্টোবর একটি চিঠি দেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। তাতে বলা হয়, ‘প্রিপেইড মিটার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হেক্সিং ভারত, নেপাল, কেনিয়াসহ অনেক দেশে কালোতালিকাভুক্ত হওয়ায় এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে হেক্সিংয়ের সঙ্গে কোনো প্রকার লেনদেন ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপনে সতর্ক থাকতে হবে।’

হেক্সিংয়ের বিষয়ে সতর্ক করে গত ১৯ অক্টোবর ছয়টি বিতরণ সংস্থাকে চিঠি দেয় বিদ্যুৎ বিভাগ। তবে মিটার কিনতে ডাকা একাধিক দরপত্রে অংশ নিচ্ছে চীনা কোম্পানিটি।

ওই চিঠিতে আরও বলা হয়েছিল, ভুয়া বিলের মাধ্যমে অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে হেক্সিংকে অব্যাহতির সুপারিশ প্রদান করা এবং ইতিমধ্যে ওজোপাডিকোর সব মামলা তুলে নেওয়া এবং দুদকের অভিযোগ প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া স্থগিত করতে হবে।

২০২৪ সালের ১২ নভেম্বর ‘মিটার–বাণিজ্যে সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের ভাই-বন্ধু চক্র’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রথম আলো। এরপর প্রিপেইড মিটার কেনা–সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্তে গত বছরের মার্চে একটি কমিটি করে অন্তর্বর্তী সরকার। হেক্সিংয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পায় কমিটি। এর ভিত্তিতে তারা তদন্ত প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে। এতে হেক্সিংয়ের সঙ্গে ব্যবসা করার বিষয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। তবে মিটার কিনতে ডাকা একাধিক দরপত্রে অংশ নিচ্ছে হেক্সিং।

সম্প্রতি ১ লাখ ৩৮ হাজার মিটার কিনতে জমা নেওয়া দরপত্রের কারিগরি মূল্যায়ন শেষ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা ওজোপাডিকো। এতে ছয়টি কোম্পানি অংশ নিয়েছে, যার মধ্যে হেক্সিংও আছে। দ্বিতীয় দফায় আরও ৫১ হাজার মিটারের দরপত্র জমা শেষে মূল্যায়ন চলছে। এতেও অংশ নিয়েছে হেক্সিং। দুই দরপত্রের কারিগরি মূল্যায়ন চূড়ান্ত হওয়ার পথে এখন।

যতক্ষণ পর্যন্ত আইনি প্রক্রিয়ায় হেক্সিং অব্যাহতি না পায়, ততক্ষণ তারা অপরাধী। তাদের ব্যবসা করার সুযোগ রাখা জনস্বার্থবিরোধী।
এম শামসুল আলম, জ্বালানি উপদেষ্টা, ক্যাব

বিতর্কিত একটি কোম্পানিকে দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম।

বিদ্যুৎ বিভাগের সতর্কতামূলক চিঠির প্রসঙ্গ ধরে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সতর্ক করার কী আছে, এটা দায় এড়ানো। যতক্ষণ পর্যন্ত আইনি প্রক্রিয়ায় হেক্সিং অব্যাহতি না পায়, ততক্ষণ তারা অপরাধী। তাদের ব্যবসা করার সুযোগ রাখা জনস্বার্থবিরোধী।

আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তাদের কালোতালিকাভুক্ত করতে মন্ত্রণালয়ের কাছে জোর দাবি জানান তিনি।

বিষয়টি নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান প্রথম আলোকে বলেন, গত সরকারের সময় চক্র গড়ে মিটার–বাণিজ‍্য করেছে। তদন্তে সব বিস্তারিত উঠে এসেছে।

তদন্তের ভিত্তিতে বিতরণ সংস্থাকে সতর্ক করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এর ব‍্যত‍্যয় হলে ব‍্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিদ্যুৎ খাতে মিটার–বাণিজ্য নিয়ে ২০২৪ সালের ১২ নভেম্বর প্রথম আলোয় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল
ছবি: প্রথম আলোর প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট

দরপত্রে কীভাবে অংশ নিচ্ছে হেক্সিং

হেক্সিংয়ের দরপত্র জমা নেওয়ার বিষয়ে ওজোপাডিকোর দায়িত্বশীল দুই কর্মকর্তা বলেন, বিদ্যুৎ বিভাগ সতর্ক করলেও কোম্পানিটিকে কালোতালিকাভুক্ত করেনি। এটা তাই তাদের অংশগ্রহণে সরাসরি বাধা নেই। অন্য বিতরণ কোম্পানিতেও তারা অংশ নিচ্ছে। এটা নিয়ে কোম্পানিগুলোও বিভ্রান্তিতে আছে।

তবে গত ২৩ নভেম্বর বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে একটি চিঠি পাঠায় হেক্সিং। তাতে তারা দাবি করে, ভারত, নেপাল ও কেনিয়ায় তারা কালোতালিকাভুক্ত নয়। ভূরাজনৈতিক কারণে চীনের কোম্পানি ভারতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ ও মামলাও প্রত্যাহার করে নিয়েছে ওজোপাডিকো।

গত সরকারের সময় ওজোপাডিকোর বোর্ড সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তের অনুলিপি তুলে ধরা হয় হেক্সিংয়ের চিঠির সঙ্গে। এর ভিত্তিতে তাদের সঙ্গে ব্যবসা করার বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের জারি করা নির্দেশনা প্রত্যাহারের অনুরোধ করা হয়।

ওজোপাডিকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ জাকিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, আন্তর্জাতিক দরপত্রে অংশ নিতে তো বাধা নেই। তবে দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভাগের নির্দেশনা বিবেচনায় নেওয়া হবে। আর হেক্সিংয়ের টাকা পাচারের মামলা গত সরকারের সময় প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে দুদকে তদন্ত চলমান আছে। এটি শেষ হলে আদালতের রায় অনুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হেক্সিংয়ের স্থানীয় প্রতিনিধি ছিলেন নসরুল হামিদের বন্ধু, রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামীন ওরফে কাজল। আরেক কোম্পানি সেনজেন স্টারের স্থানীয় প্রতিনিধি ছিলেন নসরুল হামিদের স্ত্রীর বড় ভাই প্রয়াত মোহাম্মদ সুজাত ইসলাম।

কী ছিল তদন্ত প্রতিবেদনে

অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, জন্মলগ্ন থেকে ওজোপাডিকোতে শুধু হেক্সিং (বেসিকোসহ) ও ইনহে ব্র্যান্ডের মিটার স্থাপিত হয়েছে। দরপত্রের দলিল পর্যালোচনায় পাওয়া গেছে অসংগতি। দুরভিসন্ধিমূলক শর্ত দিয়ে তাদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হেক্সিংয়ের বিরুদ্ধে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা বা কোম্পানিগুলোতে দরপত্র দলিল প্রস্তুতিতে হস্তক্ষেপ, মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটানোসহ নানা আর্থিক কেলেঙ্কারির কথা সর্বজনবিদিত। জালালাবাদ গ্যাস কোম্পানিতে গ্যাস মিটার প্রকল্পের কাজ বাগিয়ে নেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি বিতর্কিত। টাকা পাচারের মামলা হয়েছিল সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে। পরবর্তী সময়ে ওজোপাডিকোর চেয়ারম্যানকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটি অযৌক্তিকভাবে হেক্সিংকে অব্যাহতির সুপারিশ করে। এরপর ওজোপাডিকো সব মামলা তুলে নেয়। দুদকের অভিযোগ প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া নেওয়া হয়। দুর্নীতির মাধ্যমে যে টাকা পাচার হচ্ছিল, তা বাংলাদেশ ব্যাংকে জব্দ করা আছে। এটি যাতে কোনোভাবেই হেক্সিং না নিতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

অর্থ পাচার ও চক্রের দাপট

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দুটি নতুন সরকারি কোম্পানি তৈরি করা হয় তৎকালীন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের নির্দেশে। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন প্রতিমন্ত্রীর বন্ধু–স্বজনদের সুবিধা পাইয়ে দিতে কোম্পানি দুটি গঠন করা হয়েছিল।

এর মধ্যে একটি হচ্ছে বাংলাদেশ স্মার্ট ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (বেসিকো)। বিতরণ খাতের ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) ৫১ শতাংশ এবং চীনের হেক্সিং ইলেকট্রিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড ৪৯ শতাংশ শেয়ার নিয়ে বেসিকো নিবন্ধন নেয় ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে।

বাংলাদেশ পাওয়ার ইকুইপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড (বিপিইএমসি) নামে আরও একটি কোম্পানি তৈরি করা হয় স্মার্ট প্রিপেইড মিটার তৈরির জন্য। সরকারি রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (আরপিসিএল) ৫১ শতাংশ শেয়ার ও চীনের সেনজেন স্টার ইনস্ট্রুমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড ৪৯ শতাংশ শেয়ার নিয়ে এটি নিবন্ধিত হয়।

হেক্সিংয়ের স্থানীয় প্রতিনিধি ছিলেন নসরুল হামিদের বন্ধু, রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামীন ওরফে কাজল। সেনজেন স্টারের স্থানীয় প্রতিনিধি ছিলেন নসরুল হামিদের স্ত্রীর বড় ভাই প্রয়াত মোহাম্মদ সুজাত ইসলাম। কোভিড মহামারির সময় তাঁর মৃত্যুর পর এ দায়িত্ব নেন তাঁর নিকট আত্মীয় মাহবুব রহমান তরুণ।

আওয়ামী লীগ আমলে পিডিবির একটি দরপত্রে অন্য কোম্পানি সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল হেক্সিং। দরপত্র বাতিল করে সরাসরি মিটার কিনতে সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর পিএস (ব্যক্তিগত সচিব) ডেসকোকে চাপ প্রয়োগ করেছিলেন। পরে দরপত্র বাতিল করে সরাসরি মিটার কেনা হয়।

বেসিকোর মিটার সরবরাহ কার্যক্রম নিয়ে ২০২১ সালে একটি নিরীক্ষা কার্যক্রম চালায় ওজোপাডিকো। এতে দেখা যায়, নিজেরা তৈরির কথা থাকলেও আমদানি করে মিটার সরবরাহ করেছে তারা। আমদানি–বাণিজ্যের আড়ালে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়তি দেখিয়ে ৩৬ কোটি টাকা পাচার করেছে বেসিকো। পাচারের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে ২০২২ সালের জুলাইয়ে একটি চিঠি দেয় ওজোপাডিকো। একই সময়ে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হেক্সিংয়ের বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়। এরপর ওই বছরের সেপ্টেম্বরে মামলা তুলে নিতে ও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অভিযোগ প্রত্যাহার করে নিতে নির্দেশনা দেয় ওজোপাডিকোর বোর্ড। ওই বছরের অক্টোবরে আবেদনের পর নভেম্বরে মামলাটি প্রত্যাহার হয়ে যায়।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন বলছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সরকারি মালিকানা দাবি করে দরপত্র ছাড়া সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে বিভিন্ন সংস্থায় মিটার সরবরাহ করেছে বেসিকো। অধিক মুনাফা হাতিয়ে নিতে সোচ্চার ছিল চক্রটি। ভাই-বন্ধু চক্রের বাইরে নতুন কোনো মিটার কোম্পানি কারিগরি বা আর্থিক মূল্যায়নে যোগ্য বিবেচিত হলেও ওই দরপত্র বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করা হতো। পিডিবির একটি দরপত্রে অন্য কোম্পানি সর্বনিম্ন দরদাতা হলেও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল হেক্সিং। দরপত্র বাতিল করে সরাসরি মিটার কিনতে সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর পিএস (ব্যক্তিগত সচিব) ডেসকো প্রশাসনকে চাপ প্রয়োগ করেছিল। পরে দরপত্র বাতিল করে সরাসরি মিটার কেনা হয়।

গণ-অভ্যুত্থানে সরকার পরিবর্তনের পর স্থানীয় প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় হেক্সিংয়ের। গত বছরের মার্চ থেকে বেসিকোর কার্যক্রমও বন্ধ রেখেছে সরকার। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে প্রভাবশালী একটি রাজনৈতিক দলের কয়েকজন নেতার সঙ্গে ইতিমধ্যে যোগাযোগ করেছে হেক্সিং। নতুন করে চক্র তৈরিতে তৎপর তারা।

আরও পড়ুন