বিজয়ের পথ—১৬
বিজয়ে অর্জিত হলো স্বাধীন বাংলাদেশ
মুক্তিযুদ্ধে বিজয় এসেছিল কঠিন পথে; অসংখ্য মানুষের ত্যাগে ও সংগ্রামে, নানা রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক উদ্যোগে। গুরুত্বপূর্ণ সেসব ঘটনা নিয়ে এ আয়োজন।
পাকিস্তানের অনিবার্য পরাজয়ের লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল একাত্তরের নভেম্বর থেকেই। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল বিক্রমে পাকিস্তানি হানাদার সেনারা রণাঙ্গনের বিভিন্ন স্থানে ক্রমেই পিছু হটতে থাকে। মনোবল তলানিতে নেমে গিয়েছিল তাদের। লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি হতোদ্যম সৈনিকদের চাঙা করতে গালগল্পের টনিক সরবরাহ করে যাচ্ছিলেন—অচিরেই চীনা সহায়তা আসছে, বঙ্গোপসাগরে আসছে মার্কিন সপ্তম নৌবহর ইত্যাদি। এটা ছিল পাকিস্তানের মিটমিট করে জ্বলতে থাকা আশার শেষ কুহেলিকা। তবে কোনো ফল হয়নি।
পাকিস্তানিরা একাত্তরের ৩ ডিসেম্বর ভারতে বিমান হামলা চালায়। প্রকৃতপক্ষে তখনই তাদের আশার শেষ প্রদীপটিও নিভে যায়। চীন যুদ্ধে অংশ নেয়নি, মার্কিন সপ্তম নৌবহরও বঙ্গোপসাগরের দিকে আর এগোয়নি।
পাকিস্তান ভারতে হামলা করার পরপরই ভারত অবিলম্বে আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ বাহিনী গঠন করে। যশোর, খুলনা, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন অঞ্চল দ্রুত যৌথ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে। পাকিস্তানি হানাদারদের প্রতিরোধক্ষমতা ধসে পড়ে। শেষ দিকে তারা মরিয়া চেষ্টা করেছিল যুদ্ধবিরতির জন্য। এ জন্য ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মাধ্যমে ভারতের কাছে একটি প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছিল। সে উদ্যোগও সফল হয়নি। যৌথ বাহিনীর ৩ ডিসেম্বর যুদ্ধ শুরুর মাত্র ১৩ দিনের মাথায় পাকিস্তানি বাহিনীর সম্পূর্ণ পরাজয় ঘটে।
ঢাকায় তখন পাকিস্তানি সেনাকর্তারা ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেছে। তাদের মধ্যে বিরাজ করছিল গভীর উদ্বেগ আর সমন্বয়হীনতা। চূড়ান্ত পরিণতির জন্য ক্ষণগণনা করছিল তারা। সেই সময়টি চলে আসে দ্রুতই। যৌথ বাহিনী ১৪ ডিসেম্বর ঢাকার উপকণ্ঠে পৌঁছে যায়। ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে ১৬ ডিসেম্বর সকালে বৈঠক করছিলেন জেনারেল নিয়াজি। এ সময় তাঁর হাতে একটি চিঠি এসে পৌঁছায়। ভারতীয় বাহিনীর মেজর জেনারেল গন্ধর্ব সিং নাগরা নিয়াজিকে সেই চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে তিনি জানিয়ে দেন, মিরপুর সেতুর কাছে তিনি অপেক্ষা করছেন। নিয়াজি যেন তাঁকে অভ্যর্থনা করতে তাঁর প্রতিনিধি পাঠান।
নিয়াজির সঙ্গে সেই বৈঠকে ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে বেসামরিক প্রশাসনের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী, মেজর জেনারেল জামশেদ, রিয়ার অ্যাডমিরাল শরিফ, ব্রিগেডিয়ার বকর সিদ্দিকী, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিক প্রমুখ। তাঁরা ভেবে পাচ্ছিলেন না এত সকালে মেজর জেনারেল নাগরা কেমন করে ঢাকার এত কাছে এলেন! নাগরাকে নিয়ে তাঁর সামরিক গাড়িটি সকাল আটটা নাগাদই মিরপুরে চলে আসে।
বিস্মিত রাও ফরমান আলী নিয়াজির কাছে জানতে চেয়েছিলেন চিঠিতে কি যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব এসেছে? নিয়াজি শুধু নেতিবাচকভাবে মাথা ঝাঁকালেন। নিয়াজি তখন ঢাকা রক্ষার দায়িত্বে থাকা জেনারেল জামশেদের দিকে তাকালেন। জামশেদও নেতিবাচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালেন।
রাও ফরমান আলী ও অ্যাডমিরাল শরিফ একসঙ্গে বলেন, ‘তাহলে জেনারেল নাগরা যা বলেছেন সেটাই করুন।’ নিয়াজির হুকুম পেয়ে জামশেদ ছুটলেন নাগরাকে অভ্যর্থনা জানাতে। সিদ্দিক সালিক লিখেছেন, ‘ভারতীয় জেনারেল হাতে গোনা সৈন্য এবং অনেক গর্ব নিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করলেন। তখনই কার্যত ঢাকার পতন হয়ে গেল।’
এরপর বাকি ছিল শুধু আনুষ্ঠানিকতা। দুপুরের মধ্যেই ভারতীয় বাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব আত্মসমর্পণের চুক্তিপত্র সঙ্গে করে ঢাকায় চলে এসেছিলেন। রাও ফরমান আলী ও অ্যাডমিরাল শরিফের ইচ্ছা ছিল না প্রকাশ্যে আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠান হোক। তাঁরা নিয়াজিকে পরামর্শও দিয়েছিলেন প্রকাশ্য কোনো অনুষ্ঠানে না যেতে। তবে নিয়াজি তাতে কর্ণপাত করেননি। দুপুরের পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা সস্ত্রীক বিমানবন্দরে এসে অবতরণ করেন। নিয়াজি বিমানবন্দরে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান।
ওদিকে মুক্তিবাহিনী ও স্বাধীনতাকামী বীর বাঙালিরা ততক্ষণে জেনে গিয়েছিলেন বিজয় চূড়ান্ত। হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্য দেখার জন্য তাঁরা প্রবল আগ্রহ নিয়ে সমবেত হয়েছিলেন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)। পড়ন্ত বেলায় অনুষ্ঠিত হলো সেই কাঙ্ক্ষিত দৃশ্য। নতমস্তকে এলেন একদার উদ্ধত জেনারেল নিয়াজি। দলিল স্বাক্ষরের জন্য খুবই সাধারণ একটি টেবিল আনা হয়েছিল পার্শ্ববর্তী ঢাকা ক্লাব থেকে। সেই সাধারণ টেবিলেই স্বাক্ষরিত হলো অনন্যসাধারণ ওই চুক্তি। নিয়াজি স্বাক্ষর করে তাঁর পিস্তল তুলে দিলেন জেনারেল অরোরার হাতে। র্যাঙ্ক ব্যাজ খুলে ফেললেন কাঁধ থেকে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করেন বাংলাদেশ বাহিনীর উপপ্রধান গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার।
সেদিনের ঢাকার পরিবেশ কেমন ছিল, তার স্মৃতিচারণা করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি এবং বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক মফিদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, তিনি তখন ঢাকাতেই ছিলেন। বললেন, বিজয় যে নিশ্চিত হতে চলেছে, তা গত কয়েক দিন থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। তবু ওই চূড়ান্ত ক্ষণটির আগে পর্যন্ত মানুষের মনে কিছুটা দোলাচল ছিল। মনে হচ্ছিল, পাকিস্তানিরা সহজে হার মানবে না। হয়তো ঢাকায় ভয়ংকর একটা শেষ চূড়ান্ত যুদ্ধ হবে। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর সকালেও ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে কামানের গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। পাকিস্তানি জেনারেলরা হম্বিতম্বি করেই যাচ্ছিলেন। এই অবস্থায় সকালের কিছু পর থেকেই ভারতীয় বিমান থেকে পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণ করার জন্য লিফলেট ফেলা শুরু হয়ে যায়। তখন মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল যুদ্ধ শেষ হতে চলেছে। তবে শহরের বিভিন্ন এলাকায় গোলাগুলি ও হত্যার ঘটনা সেদিনও ঘটেছিল।
মিত্রবাহিনীর সামরিক গাড়িগুলো বেলা দেড়টার দিক থেকে ঢাকায় প্রবেশ করতে থাকে বলে জানান মফিদুল হক। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে অনেক মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। তাঁরা মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সৈনিকদের শুভেচ্ছা জানিয়ে তাঁদের সঙ্গে হাত ও বুকে বুক মেলাতে থাকেন। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছিল। তবে তখন সাংবাদিকদের উপস্থিতি খুব বেশি ছিল না। শহরেও যে লোকজন খুব বেশি ছিল, তা নয়। গোলাগুলির শব্দের কারণে মানুষের মধ্যে ভয় পুরোপুরি কাটছিল না। বিকেলের দিকে পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের বিষয়টি নিশ্চিত হলে মানুষের মন থেকে উদ্বেগ–আতঙ্ক কমে যায়। অনেক মানুষ এসেছিলেন রেসকোর্সে আত্মসমর্পণ দেখতে। আর অনেকেই তাঁদের আত্মীয়স্বজনদের খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। এভাবেই সে দিনে বেলা গড়িয়ে নেমে এসেছিল শীতের সন্ধ্যা।
দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের শেষে অনেক রক্ত, অগণিত আত্মদানের বিপুল মূল্যে অর্জিত হলো বিজয়। জন্ম নিল বাংলাদেশ নামে নতুন এক স্বাধীন রাষ্ট্র।
তথ্যসূত্র
১. রেহমান সোবহান, দ্য ডেইলি স্টার আয়োজিত ‘ইতিহাস আড্ডা’র বক্তব্য, ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫
২. বিবিসি বাংলা, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭