‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি-সংকট: উৎস, উত্তরণ ও উন্নয়ন প্রশ্ন’ শিরোনামে আয়োজিত এক সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা। আজ শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোজাফ্‌ফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে এটির আয়োজন করে ত্রৈমাসিক পত্রিকা সর্বজন কথা। এতে তিনটি অধিবেশনে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে নিবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশেষজ্ঞ বক্তারা।

সেমিনারে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের যে নীতি, সেটা অনিচ্ছাকৃত ভুল নয়, বরং প্রথম থেকেই পরিকল্পনা করে এই পথে হাঁটা হয়েছে, যাতে সরকারের পছন্দের বড় ব্যবসায়ীরা এখানে ব্যবসা করতে পারেন, বিদেশি কোম্পানির স্থানীয় প্রতিনিধিরা প্রচুর মুনাফা করতে পারেন।

সর্বজন কথার সম্পাদক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, সংবিধান রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের হাতে ন্যস্ত করেছে। জনগণের সম্মতি না নিয়ে, জনগণের সঙ্গে পরামর্শ না করে এবং জনগণের কোনো অংশগ্রহণ ছাড়াই বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে উল্টো বল প্রয়োগ করে মানুষকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। উন্নয়নের প্রকল্প হলে জনগণের সম্পৃক্ততায় ভয় কেন? সবাইকে সতর্ক করে তিনি আরও বলেন, সংকটের কথা বলে কয়লা সিন্ডিকেট আবার তৎপরতা চালাচ্ছে। তারা কয়লা তোলার কথা বলছে বারবার।

দেশে অনুসন্ধান না করে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে গ্যাস না থাকার কথা বলা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন ভূতত্ত্ববিদ বদরূল ইমাম। ‘গ্যাস আছে, গ্যাস নাই’ শিরোনামে নিজের নিবন্ধে তিনি বলেন, রপ্তানির জন্যই ২০০১ সালে দেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে বলে গুজব ছড়ানো হয়। আর এখন এলএনজি আমদানির জন্য বলা হচ্ছে, দেশে গ্যাস নেই। এতে যাঁরা আমদানির সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের পকেট দ্রুত ভরে যায়।

একাধিক গবেষণায় দেশে গ্যাসের ব্যাপক সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে জানিয়ে বদরূল ইমাম বলেন, দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় অনুসন্ধান করেই ২৮টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। আর বাকি দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা ও সমুদ্র পড়ে আছে।

‘৫০ বছরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির পরিকল্পনা, বর্তমান সংকট ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা’ শীর্ষক নিবন্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা বলেন, ১৯৯৮ সালে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। এখন ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেসরকারি খাতের হাতে। এতে বিপুল পরিমাণ কেন্দ্রভাড়া (ক্যাপাসিটি পেমেন্ট) দিতে হচ্ছে, যা বিদ্যুৎ খাতের জন্য বোঝা হয়ে গেছে।

ভুল নীতি, নাকি ইচ্ছাকৃত

‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান দুর্গতি: সরকারের ভুল নীতি, নাকি ইচ্ছাকৃত?’ শিরোনামে নিবন্ধ উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক মাহা মির্জা। এতে তিনি বলেন, দেশীয় গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো বিকল্প উপায় ছিল। কিন্তু আমদানিনির্ভর হয়েছে সরকার। সরকার এখানে ভুল করেনি, বরং ইচ্ছেকৃতভাবে জনগণের করের টাকা লুটপাট করার উদ্দেশ্য ছিল বলেই আজকের সংকট তৈরি হয়েছে।

মাহা মির্জা আরও বলেন, পেট্রোবাংলার হিসাবে, চলতি অর্থবছরে ৭৩ শতাংশ গ্যাস আসবে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে। এর জন্য খরচ হবে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। আর এলএনজি আমদানি করে মেটানো হবে ২৭ শতাংশ চাহিদা, যার জন্য ব্যয় হবে ৪৪ হাজার কোটি টাকা।

বায়ু ও সৌরবিদ্যুতে কমিশন নেই

বিনিয়োগকারী ধনী দেশগুলোর জ্বালানি সনদ চুক্তিতে বাংলাদেশের সই ঠেকানোর আহ্বান জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তানজীম উদ্দিন খান বলেন, শুধু বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে জ্বালানি সনদ চুক্তি তৈরি করা হয়েছে। জনস্বার্থবিরোধী এমন চুক্তিতে বাংলাদেশের সই করা ঠিক হবে না।

কমিশনের সুযোগ না থাকায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে সরকারের আগ্রহ নেই বলে অভিযোগ করেন বিদ্যুৎ খাতের নীতি-গবেষণা সংস্থা পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক বিডি রহমতউল্লাহ। তিনি বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরিতে প্রতি মেগাওয়াট ক্ষমতার জন্য বিশ্বে গড়ে ব্যয় হচ্ছে ২৫ কোটি টাকা, বাংলাদেশ করছে ৪৯ কোটি টাকা। বায়ু ও সৌরবিদ্যুতে দুর্নীতির সুযোগ নেই।

সেমিনারে প্রকৌশলী কল্লোল মোস্তফা, জুরাইনের জন সংগঠক মিজানুর রহমান প্রমুখ বক্তব্য দেন। এতে অংশগ্রহণকারীরা মতামত ও প্রশ্ন করার সুযোগ পান।