রামেন্দু কাকা, শুভ জন্মদিন!

নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার গতকাল ৮৫ বছর পূর্ণ করেছেন। ঢাকার বেঙ্গল শিল্পালয়ে তাঁকে ঘিরে এক অনুষ্ঠানে কুর্‌রাতুল-আইন-তাহ্‌মিনা বলেছেন ঘরোয়া মানুষটির কথা।

নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার গতকাল জন্মদিনের আয়োজনে বক্তব্য দেন। বেঙ্গল শিল্পালয়, ঢাকা, ৯ আগস্ট ২০২৬ছবি: খালেদ সরকার

রামেন্দু কাকা আমার খালু হন। কিন্তু ডাকি কাকা। কেন?
আমার খালার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিল ১৯৭০ সালে। কিন্তু তিনি তার আগে থেকেই আমার নানুবাসা সেন্ট্রাল রোডের দারুল আফিয়ায় আসতেন। তখন তো আর আমরা তাঁকে খালু ডাকতে পারতাম না, তাই তিনি আজীবন কাকা।

আমার বাবা ও মা উভয়ের দিক থেকে এমন ‘কাকা’ আরও কয়েকজন ছিলেন। আমাদের হাতিরপুল পুকুরপাড়ের বাসাতেও তাঁদের সবার অবাধ আনাগোনা ছিল।
তো ’৬৯-৭০ সালের কোনো একদিনে আমরা তিন-চারজন কাজিন নানুবাসার দোতলায় বাইরের দিকের ছোট ছাদে প্রেম বিষয়ে আলাপ করছিলাম। কার প্রেমের ধরন কী ইত্যাদি। ছয়-সাত-আট বছর বয়সীদের অকালপক্ব আলাপ।

কাজিনরা বলে থাকে, আমি নাকি দুই-তিনটা নজির তুলনা করতে করতে বলেছিলাম, ফেরদৌসী খালা আর রামেন্দু কাকার প্রেম এমন—‘ফেরদৌসী, দেখো, আজ কী সুন্দর চাঁদ উঠেছে!’

ফেরদৌসী খালা—তাঁকেও আমি অন্য একটা নামে ডাকি—পিচ্চি। আমার বয়সের কাজিনরা কেউ ডাকে পিচ্চি আম্মা, পিচ্চি খালা। আমি ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় পিচ্চি আমাকে বাংলা আর ইসলামিয়াত পড়াতেন।

তাঁরা তখন ইন্দিরা রোডে একতলা একটা বাসায় থাকতেন। স্কুল বন্ধ থাকলে আমার বাবা সকালে আমাকে সেখানে নামিয়ে দিতেন। সারা দিন পড়া, সুখাদ্য খাওয়া, পেয়ারা পাড়া হতো। বাসাটায় অনেক পেয়ারাগাছ ছিল। আর প্রায়ই কালো কালো বিছা মারার অভিযান চালাতে হতো।

বাবা অফিস থেকে ফেরার সময় আমাকে নিয়ে যেতেন। কোনো দিন তাঁর সন্ধ্যা পেরিয়ে যেত। মনে আছে, সন্ধ্যায় খাবার টেবিলে রামেন্দু কাকা আর পিচ্চি নাটকের সংলাপ চর্চা করতেন। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতাম। তখন বোধ হয় থিয়েটার দল মাত্র হয়েছে বা প্রস্তুতি চলছে।

রামেন্দু কাকার সঙ্গে স্মৃতিগুলো বেশির ভাগই নীরব! তিনি কথা কম বলেন। কিন্তু আমরা ছোটরা তাঁর স্নেহ টের পেতাম। নীরব একটা ভরসার মতো। ছোটদের তিনি পাত্তা দিতেন নীরবে।

সেদিন আমার কাজিন লালী মনে করিয়ে দিয়েছে ঈদ আর ঈদির কথা। ছোটবেলায় ঈদের দুপুরটা কাটত নানুবাসায়—সবাই একসঙ্গে। সেই আমলে আমাদের পরিবারে ঈদি দেওয়ার চল ছিল না। কিন্তু রামেন্দু কাকা এসেই আমাদের এক-দুই শ টাকা দিতেন। আমার ছোট খালু শওকত কাকাও দিতেন। আইসক্রিম খাওয়ার টাকা, তখন সেটা দারুণ একটা প্রাপ্তি।

রামেন্দু মজুমদারের (বাঁ থেকে ষষ্ঠ) বহুমাত্রিক কর্মময় জীবন নিয়ে বই ‘রামেন্দু মজুমদার: স্টেজিং আ লাইফটাইম, আ পিকটোরিয়াল ক্রনিকল’ হাতে বিশিষ্টজনেরা। গতকাল সন্ধ্যায় ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে
ছবি: খালেদ সরকার

রামেন্দু কাকা স্নেহশীল এটা বরাবর মনে থাকে। যত্ন আর দেখভাল করার একটা ব্যাপার তাঁর মধ্যে আছে। মা-খালাদের মুখে শুনেছি, পিচ্চি টাকাপয়সার হিসাব রাখতে বিরক্ত হতো। রামেন্দু কাকা মাসের শুরুতে খাত ধরে খামে টাকা ভাগ করে দিতেন।
আমার বড় হওয়ার কালে ৩৫ তোপখানা রোডে বিটপী বিজ্ঞাপনী সংস্থার অফিসটা আমাদের কাছে পরিবারের মতোই ছিল। আমার বাবা আবদুল মুক্তাদিরের ঘাঁটি ছিল একতলার ‘ক্রিয়েটিভ’ বিভাগটি। দোতলায় উঠলেই রামেন্দু কাকার ঘর, মানুষে সরগরম। আরও কতজনের নাম আর চেহারা যে মনে আসছে!

বড় হতে হতে, রামেন্দু কাকার রসবোধ—হিউমারের টুকটাক পরিচয় পেয়েছি। তাঁর রসবোধ একটা অন্য রকম মজা। একটা চুপচাপ, ইংরেজিতে যাকে বলে ড্রাই হিউমার। মন্তব্যগুলো ছোট কিন্তু মোক্ষম হয়, মোলায়েম মসৃণ একটা ধারও হয়তো থাকে।
এমএ পরীক্ষায় কীভাবে যেন আমি ভালো ফল করে ফেললাম। রামেন্দু কাকা খুব খুশি হয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সেই সময়’ বইটা নিয়ে বাসায় এলেন। একটা খণ্ডে লেখা: ‘মিতি/কী আশ্চর্য!’ আরেকটায় লেখা ‘কী দরকার ছিল এত ভালো ফল করার!’
আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দিলে অত্যন্ত খুশি হয়েছিলেন। আবার শিক্ষকতা ছেড়ে দিলে খুবই দুঃখ পেয়েছিলেন। এই আনন্দ এবং দুঃখ অবশ্য ত্রপাও তাঁকে দিয়েছে!

আমাদের খালাতো বোন লালী, আয়েশা বানু, শিক্ষকতা ধরে রেখেছে। রামেন্দু কাকা তাকে স্নেহ আর গর্ব মিশিয়ে ডাকেন ‘প্রফেসর’ বলে, সে অধ্যাপক হওয়ারও অনেক আগে থেকে।

পরিবারের কথা যদি বলি, আমার বাবা-মায়েরা ছিলেন মোট ২৬ জন ভাইবোন। আমার মা দিলারা বেগমের জীবন ছিল ডালপালা ছড়ানো এই পরিবারকে ঘিরে। তিনি ছিলেন রামেন্দু কাকার ‘দিলাপা’।

আমার জন্যও রামেন্দু কাকার একটা নাম আছে। ‘মিতি আপু’। আমরা যখন বড় হয়ে গেছি, তখনো আমাদের বাসায় বেড়াতে এলে বিদায় নেওয়ার সময় সিঁড়িতে দুই হাত ঘুরিয়ে একটু নেচে নিতেন। এটা অবশ্য শুধু আমাদের অর্থাৎ ছোটদের সামনে করতেন।

বড় হতে হতে আমরা তো এখন বুড়ো হয়ে গেছি। অনেক দিন সেই নাচটা আর দেখি না। এবার যদি একবার দেখতে পাই! শুধু আমি, ত্রপা আর অন্য কোনো ভাইবোনদের সামনে—রামেন্দু কাকা, একবার দেখিও প্লিজ, কোনো একদিন, কোনো একটা সিঁড়িতে…
অনেক অনেক অনেক শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা। তুমি অনেক ভালো থেকো।

* কুর্‌রাতুল-আইন-তাহ্‌মিনা, সাংবাদিক