সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনা বলছে, দেশে খানার আকৃতি বা পরিবার ছোট হয়ে আসছে। পরিবার ছোট হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। বার্ধক্যের কারণে উপার্জন কমে যায়, অধিকাংশ উপার্জনহীন হয়ে পড়েন। অর্থনৈতিকভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে হয়। তাঁদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসার ব্যবস্থা দেশে এখনো চালুই হয়নি। তাঁরা ঠিক সময়ে চিকিৎসা পান না। এমন মানুষের সংখ্যা দেশে বাড়ছে।

default-image

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ এস এম আতিকুর রহমান দুই দশকের বেশি সময় ধরে প্রবীণ জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বার্ধক্য মোকাবিলায় আমাদের কোনো প্রস্তুতি নেই। প্রবীণেরা দীর্ঘমেয়াদি বার্ধক্যজনিত রোগে ভোগেন। তাদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা ও সেবা দরকার। দেশে তা নেই।’

দরকার বিশেষায়িত সেবা

দেশের প্রবীণদের একটি অংশ বয়স্ক ভাতা পান। সমাজসেবা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১–২২ অর্থবছর ৫৭ লাখ মানুষকে মাসে ৫০০ টাকা করে বয়স্ক ভাতা দেওয়া হয়েছে। দেশের সব মানুষের আবাসনের ব্যবস্থা করছে সরকার। দেশের সব মানুষ সরকারি হাসপাতালে প্রায় বিনা মূল্যে চিকিৎসা নিতে পারে। এ ছাড়া সরকারি–বেসরকারি ১৪–১৫টি ‘প্রবীণ নিবাসে’ প্রায় দুই হাজার মানুষের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। তবে প্রবীণদের স্বাস্থ্য সমস্যার তুলনায় এসব উদ্যোগ অপ্রতুল।

‘প্রবীণদের ভুলে যাওয়ার একটা রোগ আছে, নাম ডিমেনসিয়া। প্রবীণদের পড়ে যাওয়ার একটা প্রবণতা থাকে। এ ধরনের সমস্যা অন্য বয়সীদের হয় না। প্রবীণদের পেশি, কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রবীণেরা একই সঙ্গে অনেকগুলো দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভোগে। এসবের চিকিৎসাই জেরিয়াট্রিক মেডিসিন।’
সোহেল মাহমুদ আরাফাত, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান

গতকাল শুক্রবার রাজধানীর শাহবাগ এলাকার এক বাসিন্দা এই প্রতিবেদককে বলেন, তাঁর মায়ের বয়স ৯১ বছর। একাধিক রোগে ভুগছেন। সকাল, দুপুর, রাতে নিয়ম করে আটটি ওষুধ খেতে হয়। মা নিজে ওষুধ খেতে পারেন না, তাঁকে খাইয়ে দিতে হয়। শাহবাগের ওই বাসিন্দা বলেন, ‘আমি মায়ের সঙ্গে থাকি, তাই মা ওষুধ পান। সব মায়ের সঙ্গে তাঁর সন্তানেরা থাকে না।’

চিকিৎসাবিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের যেমন আলাদা শাখা আছে, ঠিক তেমনই বয়স্ক মানুষের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের পৃথক শাখার নাম ‘জেরিয়াট্রিক মেডিসিন’। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান সোহেল মাহমুদ আরাফাত প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রবীণদের ভুলে যাওয়ার একটা রোগ আছে, নাম ডিমেনসিয়া। প্রবীণদের পড়ে যাওয়ার একটা প্রবণতা থাকে। এ ধরনের সমস্যা অন্য বয়সীদের হয় না। প্রবীণদের পেশি, কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রবীণেরা একই সঙ্গে অনেকগুলো দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভোগে। এসবের চিকিৎসাই জেরিয়াট্রিক মেডিসিন।’

সর্বশেষ জনশুমারির তথ্য বলছে, দেশে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষ ৯৭ লাখ ২৭ হাজারের কিছু বেশি। তাঁরা মোট জনসংখ্যার ৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ

দেশে এই বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা সরকারি ও বেসরকারি কোনো হাসপাতালে পৃথকভাবে এখনো চালু হয়নি। বিএসএমএমইউর মেডিসিন বিভাগে শুধু এই নামে দুটি শয্যা আছে। তবে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি পৃথক বিভাগ চালু করার প্রক্রিয়া শেষের পথে।

জনশুমারি বলছে, দেশে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেশি। অন্য হিসাব বলছে, দেশে পুরুষের গড় আয়ুর চেয়ে নারীর গড় আয়ু প্রায় দুই বছর বেশি। সবচেয়ে কষ্টে থাকেন বয়স্ক বিধবারা। তাঁরা প্রায় কেউ প্রয়োজনীয় সেবা পান না।

‘আশা করছি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে গবেষণার প্রথম খসড়া (ফার্স্ট ড্রাফট) আমরা হাতে পাব।’
ডা. আখতারুজ্জামান, গবেষণার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক

প্রতিশ্রুতি নিয়ে গবেষণা

২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ইশতেহারে এক বছরের কম বয়সী সব শিশু এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী সব প্রবীণকে বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। নির্বাচনের পর চারটি বাজেট জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় কোনো বরাদ্দের কথা শোনা যায়নি।

সর্বশেষ জনশুমারির তথ্য বলছে, দেশে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষ ৯৭ লাখ ২৭ হাজারের কিছু বেশি। তাঁরা মোট জনসংখ্যার ৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

স্বাস্থ্য খাতে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পালনে করণীয় নির্ধারণে গবেষণার উদ্যোগ নিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। গবেষণার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সরকারের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটকে। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট কাজটি করতে দিয়েছে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে।

গবেষণার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ডা. আখতারুজ্জামান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আশা করছি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে গবেষণার প্রথম খসড়া (ফার্স্ট ড্রাফট) আমরা হাতে পাব।’

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন