ক্লাসরুম থেকে কলসিন্দুর—শিক্ষার অন্য এক পথ দেখিয়েছিলেন যিনি

অধ্যাপক ড. সাখাওয়াত আলী খান।ছবি: প্রথম আলো

তাঁকে প্রথমবার দেখেছিলাম আমাদের ওরিয়েন্টেশন ক্লাসের দিন। সময়টা ছিল ২০১৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ১০৮৮ নম্বর ক্লাসরুম। আমরা ছিলাম ৬৫ জন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন, তাই মনটা কাদামাটির মতো নরম। ডায়াসে দাঁড়িয়ে দক্ষ মৃৎশিল্পীর মতো আমাদের এই নরম মনকে আকার দেওয়ার চেষ্টা করলেন অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান।

চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, চুলে ব্যাকব্রাশ, ফ্রেঞ্চকাট দাঁড়ি, সাদা শার্টের ওপর স্যুট-টাই আর দরাজ কণ্ঠ। কে দেখে বলবে তাঁর বয়স তখন ৭৩ বছর! জানালেন, তিনি তিনটি দেশের নাগরিক ছিলেন। আমরা অবাক হলাম। পরে হেসে হেসে বললেন, ১৯৪১ সালে জন্ম হওয়ায় প্রথমে ব্রিটেন, পরে পাকিস্তান, এরপর বাংলাদেশের নাগরিক হয়েছেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত অধ্যাপনা থেকে তিনি ২০০৮ সালেই অবসর নেন। কিন্তু অসামান্য মেধার এই মানুষটিকে বিভাগ সব সময় নিজের পাশে চেয়েছে। নবীনবরণের দিন আমরা যখন সাখাওয়াত স্যারের কথা শুনছিলাম, তখন তিনি বিভাগের ‘অনারারি প্রফেসর’। এই বিভাগে পড়ালেখা করলে আমাদের ভবিষ্যৎ গতি কী হবে, তা নিয়ে পথ বাতলে দিচ্ছিলেন। এখান থেকে পাওয়া জ্ঞান আর দক্ষতা যে সাংবাদিকতা ও যোগাযোগের বাইরে অন্য পেশাতেও লাগানো যাবে উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন তিনি। বললেন, তাঁর বহু ছাত্র এই বিভাগে পড়ে বিচিত্র সব পেশায় কাজ করেছে। একজন মাছের ব্যবসা করে সফল হয়েছে। কারণ, এখান থেকে শেখা যোগাযোগের দক্ষতাকে ওই ছাত্র সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগাতে পেরেছিল।

আরও পড়ুন

স্নাতকে আমাদের দুটি কোর্স নিতেন সাখাওয়াত আলী খান স্যার। তৃতীয় বর্ষে নিউজ গ্যাদারিং অ্যান্ড রাইটিং এবং চতুর্থ বর্ষে ফিচার অ্যান্ড এডিটরিয়াল রাইটিং কোর্স। গল্পে গল্পে ক্লাস নিতেন তিনি। অন্যান্য কোর্সে অ্যাসাইনমেন্টের নাম শুনলে আমরা যে খুশি হতাম তা কিন্তু না। তবে সাখাওয়াত স্যারের বেলায় ছিলাম ব্যতিক্রম। এত উপভোগ্য অ্যাসাইনমেন্ট আমরা শিক্ষাজীবনে আর পাইনি। তৃতীয় বর্ষে তিনি আমাদের পুরো ব্যাচকে পাঠালেন ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর গ্রামে। বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলে তখন ওই গ্রামের আটজন মেয়ে খেলত। আমাদের অ্যাসাইনমেন্ট হলো এই গ্রামে গিয়ে নারী ফুটবলারদের পরিবার, তাঁদের বিদ্যালয়ের শিক্ষক, সেখানকার খুদে ফুটবলার ও গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলে ও বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিবেদন লেখা।

২০১৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতক প্রথম বর্ষের ওরিয়েন্টেশন ক্লাসে অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান
ছবি: ওয়াহিদা জামান সিথি

বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বাস নিয়ে হই হই করে ২০১৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে আমরা রওনা দিলাম কলসিন্দুর গ্রামের উদ্দেশে। পরদিন সারা দিন ওই গ্রাম আর কৃতী মেয়েদের বিদ্যালয়টি চষে বেড়িয়েছি আমরা। জীবনে প্রথমবারের মতো সংবাদ সংগ্রহের অভিজ্ঞতা হলো আমাদের অনেকের। এরপর আমরা গেলাম বিজয়পুর চীনামাটির পাহাড় দেখতে। পুরো ক্লাসের বন্ধুরা মিলে আনন্দময় আর অপূর্ব এক অভিজ্ঞতা পেলাম। পুরোটাই ছিল সাখাওয়াত স্যারের অবদান।

পরের বছর চতুর্থ বর্ষে আমাদের ব্যাচের কোর্স আলাদা হয়ে যায়। আমরা ১৫ জনের মতো সাখাওয়াত স্যারের ফিচার অ্যান্ড এডিটরিয়াল রাইটিং কোর্সের ছাত্র হই। আগের নিয়মেই স্যার আমাদের সরাসরি অভিজ্ঞতাসহকারে ফিচার লিখতে ঢাকার বাইরে পাঠাবেন। এবার পাঠানো হবে ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি উপজেলার ভাসমান নৌকার হাটে। এখানে সন্ধ্যা নামে একটি নদী আছে। এর পাড়ে সপ্তাহের এক দিন বসে ভাসমান নৌকার হাট। ২০১৭ সালের ৫ অক্টোবর ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চে আমরা বন্ধুরা রওনা দিলাম। বরিশাল নেমে কিছুটা সড়কপথে যাওয়ার পর যাত্রা শুরু হয় আঁকাবাঁকা খালের মধ্য দিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে। বরিশালের বাইরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আমাদের যাঁদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা; তাঁদের জন্য এটি ছিল এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।

সাখাওয়াত স্যার ছিলেন হাসিখুশি মানুষ। আমাদের সঙ্গে করতেন মজার মজার এক্সপেরিমেন্ট। একদিন ক্লাসে এসে বললেন, ‘আজ আমরা সবাই ইংরেজিতে কথা বলব।’ এরপর যা হবার তা–ই। ক্লাসজুড়ে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে স্যারের সঙ্গে কথা বলেছি আমরা।  

স্যারের ছিল অভিজ্ঞতার প্রাচুর্য। তা থেকে আমাদের গল্প শোনাতেন তিনি। একদিন বললেন, ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সাংবাদিকতা বিভাগের প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে একটি ঘড়ি কেনা হয়। এটি ছিল চাবিওয়ালা ঘড়ি। প্রতিদিন সময়ে সময়ে চাবি দিয়ে এটিকে সচল রাখতে হতো। এ কাজের জন্য একজন কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়। ঘড়িটি স্থাপন করা হয় চেয়ারপারসন যেখানে বসেন ঠিক তার ওপরে দেয়ালে। এমনও হয়েছে, চেয়ারপারসন তাঁর চেয়ারে বসে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন, তখন ‘চাবি ম্যান’ এসে বললেন, ‘আপনাকে সরতে হবে, ঘড়িতে চাবি দেব এখন।’ অগত্যা অধ্যাপক মশাইকে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়াতে হতো। সাখাওয়াত স্যারের এমন গল্প শুনে আমরা হাসতাম। আশির দশকে অন্যান্য অ্যানালগ ঘড়ি যখন বাজারে আসতে শুরু করে, তখন ওই চাবিওয়ালা ঘড়ি সরিয়ে সেখানে নতুন ঘড়ি আনা হয়। ফুরিয়ে যায় চাবি ম্যানের প্রয়োজনীয়তা। তবু এরপর দীর্ঘদিন ওই পদটি গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে থেকে যায়।

সাখাওয়াত আলী খান স্যার গতকাল রোববার রাতে ঢাকার একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার একজন মহান শিক্ষকের বিদায় হলো। দীর্ঘ এক বর্ণাঢ্য জীবনের পরতে পরতে তিনি জ্বালিয়ে গেছেন জ্ঞানের আলো। তিনি থাকবেন আমাদের পরম শ্রদ্ধায়।