হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীরা
ফাইল ছবি প্রথম আলো

এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুতে সারা দেশে এ পর্যন্ত প্রায় সাত শ জন মারা গেছেন। জনস্বাস্থ্যবিদ ও কীটতত্ত্ববিদদের আশঙ্কা, এ মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। তবে তাঁদের কথা, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তিনটি তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগের একটিও এখন পর্যন্ত নেওয়া হয়নি। রোগের প্রাদুর্ভাব কমাতে সেগুলোর দরকার ছিল। এখনো যদি উদ্যোগগুলো নেওয়া যায়, তাহলে এ রোগের রাশ টানা ও প্রাণহানি রোধ সম্ভব হবে, এমন মত জনস্বাস্থ্যবিদদের।

যে তিনটি উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো হলো রোগীর ওপর নজরদারি, মশার ওপর নজরদারি এবং মশা কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠছে কি না, সে বিষয়ে নজরদারি। এই তিন কাজ বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। প্রতিষ্ঠানটি সাধারণত সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশক্রমেই এসব কাজ করে থাকে। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এ বিষয়ে কোনো তাগাদা নেই। আবার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আইইডিসিআরও কিছু করছে না।

প্রাপ্তবয়স্ক মশার নজরদারি এ জন্যই দরকার, কারণ এরাই তো কামড়ে জীবাণু ছড়ায়। আর লার্ভার নজরদারি আমাদের বলে দেয়, ভবিষ্যতে মশার বিস্তার কতটা হতে পারে। নজরদারি চলা উচিত বছরজুড়ে।
কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবীরুল বাশার

রোগীর ওপর নজরদারি

দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ইতিমধ্যে ১ লাখ ৪০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক মো. নাজমুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের এখানে শুধু হাসপাতালে আসা রোগীর সংখ্যা হিসাব করা হয়। বাস্তবে রোগীর সংখ্যা চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি হবে।’

হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া বা বাইরে থাকা রোগী কোন সময়, কোথায় আক্রান্ত হচ্ছে—সে বিষয়টিই উঠে আসে নজরদারিতে। এ ক্ষেত্রে শুধু রোগী নয়, জনগোষ্ঠীর মধ্যে যাঁরা আক্রান্ত হননি, দৈবচয়নের মাধ্যমে তাঁদের নমুনাও পরীক্ষা করা হয়। ডেঙ্গুর চারটি ধরন রয়েছে। এর মধ্যে কোনটির মাধ্যমে রোগী আক্রান্ত হলেন, সেটা এই নজরদারিতে উঠে আসে।

আমরা ১৫টি রোগ নিয়ে নজরদারি করি। ডেঙ্গু নিয়ে নজরদারির প্রক্রিয়া ঠিকের কাজ চলছে।
তাহমিনা শিরীন, পরিচালক, আইইডিসিআর

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘রোগীর নজরদারিতে রোগী শনাক্ত ও তাদের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকে। এটা করবে আইইডিসিআর। কিন্তু সরকারের তরফ থেকে এটা করতে তাদের বলা হয়নি। কিছু কিছু জরিপ হচ্ছে। কিন্তু জরিপ ও নজরদারি তো এক জিনিস না। এটা সার্বক্ষণিকভাবে চলবে। আর এখানে পাওয়া উপাত্ত মাঠপর্যায়ের কর্মী থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারকেরাও ব্যবহার করবেন। তা মোটেও হচ্ছে না।

মশার ওপর নজরদারির হালহকিকত

এডিস মশা
ফাইল ছবি

মশার নজরদারি তিনটি ক্ষেত্রে হতে পারে। এক. প্রাপ্তবয়স্ক মশার নজরদারি, লার্ভা বা শূককীটের নজরদারি এবং মশার গতিপ্রকৃতি।

কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবীরুল বাশার বলেন, ‘প্রাপ্তবয়স্ক মশার নজরদারি এ জন্যই দরকার, কারণ এরাই তো কামড়ে জীবাণু ছড়ায়। আর লার্ভার নজরদারি আমাদের বলে দেয়, ভবিষ্যতে মশার বিস্তার কতটা হতে পারে। নজরদারি চলা উচিত বছরজুড়ে। তৃতীয় বিষয়টি হলো এর গতিপ্রকৃতি বোঝা। এর মাধ্যমে মশার আচরণ, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে মশার পরিবর্তন, রোগ ছড়ানোর ক্ষমতা দেখা হয়। তিন নজরদারির কোনোটিই আমাদের নেই।’

আইইডিসিআরের পরিচালক তাহমিনা শিরীন রোগীর নজরদারির বিষয়ে বললেন, ‘আমরা ১৫টি রোগ নিয়ে নজরদারি করি। ডেঙ্গু অপেক্ষাকৃত নতুন রোগ। ডেঙ্গু নিয়ে নজরদারির প্রক্রিয়া ঠিক করার কাজ চলছে।’ তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তিনবার জরিপ করে। আসলে মশার নজরদারি খুব বড় একটি বিষয়। এটা আমাদের দেশে হয়ইনি।’

নজরদারির বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো তাগাদা ছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তাহমিনা শিরীন বলেন, ‘আমি বিজ্ঞানের বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে পারব। এটা নিয়ে কিছু বলতে চাই না।’

আরও পড়ুন

ডেঙ্গু রোধে মশা ও ওষুধ নিয়ে গবেষণা বাড়াতে হবে

মশা কীটনাশক প্রতিরোধী হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে কাজ নেই

রাজধানীতে এক গবেষণায় দেখা গেছে, এডিস মশা কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। কিন্তু তা নিয়ে আইইডিসিআরের সাম্প্রতিক কোনো পর্যবেক্ষণ নেই।

জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বলেন, এখন সংক্রমণ যখন চরমে, তখন মশার কীটনাশক প্রতিরোধী হয়ে ওঠার বিষয়টি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে মানুষ সাবধান হবে। কিন্তু তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। এটা দুর্ভাগ্যজনক।

আরও পড়ুন

'আব্বু ঢাকায় থাকবো না, ঢাকায় মশা'

‘ডেঙ্গুর নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ প্রমাণভিত্তিক নয়’

এখন যেভাবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের কাজ চলছে, তা প্রমাণভিত্তিক নয় বলে মনে করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক বে-নজির আহমেদ। তিনি বলেন, ‘সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, এখন যে যেভাবে পারছে, তা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।’

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ প্রমাণভিত্তিক হচ্ছে না—তা মানতে নারাজ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক মো. নাজমুল ইসলাম। তিন ধরনের নজরদারির বিষয়ে কোনো উদ্যোগ না থাকার বিষয়ে নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘এটা ঠিক, এসব করা গেলে ভালো হতো। এগুলো কিছু কিছু করাও হচ্ছে। কিন্তু কাঠামোবদ্ধভাবে এসব করার জন্য প্রস্তুতি লাগবে। আমরা এসব বিষয় নিয়ে কাজ শুরু করব।’

নজরদারিগুলো ধারাবাহিকভাবে ঠিকমতো হলে এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতি এতটা নাজুক হতো না বলে মনে করেন বে-নজির আহমদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, রোগীর অবস্থা কী, কারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাঁদের শ্রেণি–পেশা কী—এসব বিষয় জানা গেলে রোগ নিয়ন্ত্রণ অনেক সহজ হতো।

আরও পড়ুন

ঢাকার বাইরে এত ডেঙ্গু রোগী কেন, জানে না কেউ