প্রতিবন্ধীদের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে: ইফতেখারুজ্জামান

‘ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক  ইফতেখারুজ্জামানছবি: টিআইবির সৌজন্যে

নির্বাচনে সুষ্ঠু ও সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নিশ্চিত করতে হলে প্রতিবন্ধী মানুষের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘নির্বাচনে সুষ্ঠু ও সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নিশ্চিত করতে হলে প্রতিবন্ধী মানুষের ভোটের অধিকার সুগম করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনের পর যাঁরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাবেন, তাঁদের প্রতি আহ্বান থাকবে যাতে এই দাবি ও সুপারিশগুলোকে বিশেষ প্রাধান্য দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এ খাতটিকে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ ও দায়িত্ব থাকলেও কিছু কারণে তা পুরোপুরি সম্ভব হয়নি।’

আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রধান কার্যালয়ে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন ইফতেখারুজ্জামান।

এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে প্রতিবন্ধীদের ডিজঅ্যাবিলিটি রাইটস ওয়াচ ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ব্রেইল বিষয়টিকে বাংলাদেশে আরও ব্যাপকভাবে বিকশিত করার সুযোগ রয়েছে। পৃথিবীর অনেক দেশেই ইতিমধ্যে ব্রেইল পেপার পদ্ধতি চালু হয়েছে এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। কিছু দেশে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বা মনোভাবপ্রতিবন্ধীদের জন্য ভোটিংয়ের ক্ষেত্রে মিশ্র পদ্ধতি রয়েছে, যার মধ্যে ব্রেইল ব্যালট, টেলিফোনে ভোট সংগ্রহ এবং সহযোগীর সহায়তায় ভোট দেওয়ার পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে আদর্শগতভাবে ব্রেইল পদ্ধতি সবার জন্য করতে পারা ভালো হলেও, সেই পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে বিকল্প বা মিশ্র পদ্ধতি বিবেচনা করে বিষয়টি ম্যানেজ করার চেষ্টা করা উচিত।

প্রতিবন্ধীর ভোট দানে বর্তমানে যে ভিত্তিটুকু আছে, তার ওপর দাঁড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন সরকারের কাছে বিশেষ প্রত্যাশা থাকবে বলে জানান টিআইবি পরিচালক। তিনি বলেন, ‘সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক শক্তি, বেসরকারি সংস্থা এবং গণমাধ্যমের ভূমিকা আরও জোরালো হতে হবে।’

প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকারের আন্দোলনকে বাংলাদেশের মূলধারার আন্দোলনের অন্তর্ভুক্ত করতে পারলে তবেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলেও মন্তব্য করেন ইফতেখারুজ্জামান।

ডিজঅ্যাবিলিটি রাইটস ওয়াচের সভাপতি মনসুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, সারা দেশে বর্তমানে প্রতিবন্ধী পরিচয়পত্রধারী প্রায় ৩৭ লাখ ভোটার রয়েছেন। নির্বাচন কমিশন তাঁদের ভোটদানের বিষয়ে বারবার আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর গেজেট প্রকাশ বা বেতার-টেলিভিশনে বিশেষ ঘোষণা প্রচার করা হয়নি।

মনসুর আহমেদ চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা অতীতে কথা বলেছি, তাঁরা আশ্বাস দিয়েছেন; কিন্তু এখন পর্যন্ত কেন কোনো প্রেস রিলিজ বা নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে গেল না?’

এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে তাঁদের পক্ষে ‘অ্যাডভোকেট’ হিসেবে ভূমিকা রাখার অনুরোধ জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে মনসুর আহমেদ চৌধুরী উল্লেখ করেন, বিশ্বব্যাংক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধিতার শিকার। জন্মগত কারণ ছাড়াও অসুখ ও দুর্ঘটনার কারণে এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে মনসুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘ইশতেহারে যদি প্রতিবন্ধীদের জন্য সুনির্দিষ্ট সেবামূলক সিদ্ধান্ত থাকে, তবেই এই বিশাল জনগোষ্ঠী ও তাঁদের পরিবারের আস্থা অর্জন সম্ভব হবে। এটি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য কৌশলগতভাবেও লাভজনক।’

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যোগ্যতার চিত্র তুলে ধরে ডিজঅ্যাবিলিটি রাইটস ওয়াচের সভাপতি বলেন, বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে ৪৭ জন প্রতিবন্ধী আইনজীবী কাজ করছেন, অনেকে শিক্ষকতাও করছেন। তাঁরা সমাজের নিয়মিত করদাতা হওয়া সত্ত্বেও উচ্চশিক্ষিত বহু প্রতিবন্ধী যুবক বেকার বসে আছেন। তাঁদের জন্য কর্মসংস্থান ও উপযুক্ত সামাজিক সম্মানের দাবি জানান তিনি। পরিশেষে আগামী নির্বাচনের আগেই যেন এই জনগোষ্ঠীর দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়, সেই অনুরোধ জানান এই অধিকারকর্মী।

সংবাদ সম্মেলনে দুই সংগঠনের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বেশ কয়েকটি দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে আছে ২০১৩ সালের প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন করা এবং প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে আলাদা বাজেট বরাদ্দ দেওয়া, সরকারি চাকরিতে প্রতিবন্ধীদের জন্য সুনির্দিষ্টভাবে ২ শতাংশ কোটা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলো শুধু সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওপর না রেখে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে দায়িত্ব নেওয়া। এ ছাড়া  জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী অধিকার সনদ (সিআরপিডি) অনুযায়ী করণীয়গুলো দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি করা হয়। দেশের প্রতিটি জাতীয় জরিপে প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন ডিজঅ্যাবিলিটি রাইটস ওয়াচের সদস্যসচিব খন্দকার জহুরুল আলম, ডিজঅ্যাবিলিটি ইনক্লুশন এক্সপার্ট ও আইজেনহাওয়ার ফেলো নাফিসুর রহমান, সাইটসেভার্স বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃতা রেজিনা রোজারিও, একসেস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন মহুয়া পাল, ডিজঅ্যাবিলিটি রাইটস ওয়াচের সদস্য মো. জাহাঙ্গীর আলম, ইয়ুথ অ্যাকটিভিস্ট (বাক্‌ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি) মো. আবদুল্লাহ প্রমুখ।