এ গবেষণার আওতায় ফোয়োর সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশের ওপর ‘জেন্ডার ইকুয়ালিটি অ্যান্ড মিডিয়া রেগুলেশন স্টাডি, বাংলাদেশ’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি তৈরি করে ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই)।

বাংলাদেশের প্রতিবেদনটি তৈরিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন সাংবাদিক ও গবেষক কুর্‌রাতুল-আইন-তাহ্‌মিনা। তিনি প্রতিবেদন উপস্থাপনার সময় বলেন, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এবং সংবাদের বিষয়বস্তুতে লিঙ্গসমতা উপেক্ষা করে ভালো সাংবাদিকতা সম্ভব নয়। এ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে মালিক-সম্পাদক থেকে শুরু করে সাংবাদিকদের নিয়ে গণমাধ্যমগুলোকে নিয়মিত নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে লিঙ্গসমতা ইস্যুতে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার আয়োজন করা উচিত।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমে লিঙ্গসমতা ও সংবেদনশীলতার বিষয়ে জানতে ৪৩টি আইন, প্রবিধান ও ১২টি জাতীয় নীতি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের ১৮টি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে জরিপ চালিয়ে গণমাধ্যমে নারীর কম উপস্থিতি থাকার বিষয়টিও উঠে এসেছে।

১৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪টি প্রতিষ্ঠান কোনো তথ্য দেয়নি। বাকি ১৪টি প্রতিষ্ঠানে মোট কর্মী ৫ হাজার ৯৫০ জন। এর মধ্যে নার‍ী মাত্র ৬১২ জন বা ১০ শতাংশ।

প্রতিষ্ঠানগুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে ৩০২ জন রয়েছেন। এর মধ্যে নারী মাত্র ৪১ জন, অর্থাৎ প্রায় ১৪ শতাংশ।

প্রতিষ্ঠানগুলোয় ৯০৯ জন প্রতিবেদকের মধ্যে নারী ৫২ জন, যা প্রায় ৬ শতাংশ। সারা দেশে নারী সাংবাদিকের সংখ্যা এক হাজারের মতো হতে পারে। পুরুষ সাংবাদিকের সংখ্যা জানা না থাকায় কত শতাংশ নারী সাংবাদিক সারা দেশে রয়েছেন, সে হিসাবও বের করা যায়নি।

সাংবাদিকদের সংগঠনগুলোর মধ্যে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) ৭ শতাংশ এবং ঢাকাভিত্তিক সাব এডিটর কাউন্সিলে ১৩ শতাংশ নারী সদস্য রয়েছেন।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, মাতৃত্বকালীন ছুটি, নারীদের জন্য আলাদা শৌচাগার, রাতের পালায় কাজ করার পর বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে নিরাপত্তার বিষয়টি প্রধান উদ্বেগের জায়গায় রয়েছে। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ বা শনাক্ত হচ্ছে না। এ বিষয়ে ২০০৯ সালে হাইকোর্টের নির্দেশ যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না।

প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় গ্লোবাল মিডিয়া মনিটরিং প্রজেক্টের ২০২০ সালের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, ২০০৫ সালের তুলনায় ২০২০ সালে নারী ইস্যুতে সংবাদ প্রকাশ কমেছে। ২০০৫ সালে এ হার ছিল ২৬ শতাংশ। ২০২০ সালে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ১৬ শতাংশে। নারী ইস্যুতে সংবাদ প্রকাশ কেন এতটা কমে গেছে, তা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয় অনুষ্ঠানে।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ফোয়ো-এমআরডিআইয়ের গবেষণাটিতে বলা হয়, ১৮টি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের তথ্য পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, মাত্র পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকতা-সম্পর্কিত লিখিত নীতিমালা আছে। আরও পাঁচটি প্রতিষ্ঠানে মৌখিক নীতিমালা আছে। এগুলোর সব নীতিমালায় জেন্ডার-সম্পর্কিত প্রসঙ্গ নেই। সংবাদের নীতিমালায় যৌন অপরাধের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। জেন্ডার ভারসাম্যের বিষয়ে সবচেয়ে কম মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। এ ব্যাপারে বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণব্যবস্থাও দুর্বল।

গবেষক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোতে জেন্ডার বিষয়ে নিজস্ব নীতিমালার ক্ষেত্রে আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের পাশাপাশি এখন তৃতীয় লিঙ্গের বিষয়টিও শনাক্ত করা উচিত বলে মত দেন।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ফোয়ো মিডিয়া ইনস্টিটিউটের জেন্ডার-বিষয়ক উপদেষ্টা সারাহ মাচারিয়া। তিনি বলেন, আইন মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও লিঙ্গসমতার কথা বলে। তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব এই অধিকারগুলো চর্চার ক্ষেত্রে বাধা না দেওয়া। শুধু আইনি কাঠামো নয়, পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতি নারীর মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে ব্যাহত করছে।

সোমালিয়ার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেন সাহরা আহমেদ কোশিন। সুইডেনের মারিয়া এডস্ট্রম, জিম্বাবুয়ের ভার্জিনিয়া মুওয়ানিগওয়া ও রুয়ান্ডার ম্যারি অ্যানি দুসিমিমানা নিজ নিজ দেশের প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।

সুইডেন ছাড়া বাকি দেশগুলো জানিয়েছে, সেখানে গণমাধ্যমের জন্য লিঙ্গসমতার নীতি ও তা বাস্তবায়নের ঘাটতি রয়েছে। সুইডেন বলছে, দেশটিতে গণমাধ্যম আইন আলাদাভাবে লিঙ্গসমতার বিষয়টি উল্লেখ করে না। সেখানে সামগ্রিকভাবে সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও লিঙ্গসমতার শর্ত থেকে গণমাধ্যম আলাদা নয়।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন