সারা দেশ থেকেই নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় এমন তাৎক্ষণিক সাহায্য চাওয়া ও অভিযোগ করার ঘটনা ঘটছে। গত পাঁচ বছরে ৯৯৯-এ এমন কল এসেছে প্রায় ৪২ হাজার। এর মধ্যে ঢাকা থেকে অভিযোগ এসেছে সবচেয়ে বেশি। ১২ ধরনের নির্যাতনের ঘটনায় গত পাঁচ বছরে ঢাকা জেলা থেকে তাৎক্ষণিক সাহায্য চেয়ে ও অভিযোগ জানিয়ে কল এসেছে ১০ হাজারের বেশি, যা সারা দেশ থেকে ৯৯৯-এ আসা মোট কলের ২৪ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ কলই ঢাকা মহানগরের। পাঁচ বছরে তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান থেকে কল এসেছে সবচেয়ে কম, মাত্র ১৭০টি।

২০১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর চালু হওয়ার পর থেকে এ বছরের অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ বছরে ৬৪টি জেলা, ৮টি মহানগরসহ মোট ৭২টি এলাকা থেকে আসা অভিযোগ লিপিবদ্ধ করেছে ‘৯৯৯’। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে হত্যা, নির্যাতন, স্বামীর নির্যাতন, মা-বাবার নির্যাতন, যৌতুকের কারণে নির্যাতন, উত্ত্যক্ত ও যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, যৌন নির্যাতন এবং অ্যাসিড সহিংসতা। এই অভিযোগগুলোর মধ্যে অনেকগুলো তাৎক্ষণিক সাহায্য প্রার্থনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, মামলা পর্যন্ত গড়ায় না। অভিযোগগুলোর মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রী নির্যাতন প্রায় সাড়ে ১০ হাজার, উত্ত্যক্ত ও যৌন হয়রানি ৫ হাজার, ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে প্রায় ৩ হাজার।

জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সম্পাদক নাছিমা আক্তারের (জলি) মতে, নারীর প্রতি প্রকৃত নির্যাতনের ঘটনা এর চেয়েও বেশি। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ঢাকাসহ শহর এলাকায় নির্যাতনের শিকার হলে অভিযোগ জানানোর বিষয়ে যতটা সচেতনতা এসেছে, গ্রামাঞ্চলে তা হয়নি। অনেক নির্যাতনের ঘটনা সালিসেই শেষ হয়ে যায়।

নারী নির্যাতনের এই চিত্রের মধ্যে ‘সবাই মিলে ঐক্য গড়ি, নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধ করি’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আজ ২৫ নভেম্বর শুরু হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ। ১০ ডিসেম্বর বিশ্ব মানবাধিকার দিবস পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশে এই পক্ষ পালনে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মুহিবুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অপরাধও বাড়ছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারের যেসব উদ্যোগ রয়েছে, সেসব কোভিডে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। এখন সেগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানো হয়েছে। শহরের মতো গ্রামেও সহায়তা চাওয়ার জন্য হটলাইন নম্বরগুলো ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতা আরও বাড়ানো হচ্ছে।

বিচার নিয়ে ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ

গত বছরের জানুয়ারিতে মেয়েকে ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে মেয়ের বন্ধুকে আসামি করে মামলা করেন ঢাকার বাসিন্দা এক বাবা। কিশোরী মেয়েটির মা আক্ষেপ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাত্র দুজনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এ মামলা কবে শেষ হবে! মনে অনেক কষ্ট নিয়ে চলি।’ আসামি এখন কারাগারে আছেন বলে জানান তিনি।

রাজধানীর আরেক নারী ২০০৯ সালে স্বামীর বিরুদ্ধে ভরণপোষণ ও দেনমোহরের মামলা করেছিলেন। এখনো কোনো রায় পাননি। প্রথম আলোকে ওই নারী বলেন, ছেলে এখন কিশোর বয়স পার করছে। বিচার আর পাব কি না কে জানে!’ এ দুটি মামলায় আইনি সহায়তা দিচ্ছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।

উচ্চ আদালতের তথ্য অনুসারে, এ বছরের ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ১ লাখ ৭৮ হাজার ২৩১। সবচেয়ে বেশি বিচারাধীন মামলা রয়েছে ঢাকার ৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনালে, এ সংখ্যা ১৮ হাজার ২৫। এদিকে সারা দেশে বিচারাধীন মামলার ২৪ শতাংশের বিচার চলছে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুসারে, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে এ বছরের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের বিভিন্ন ধারায় নারী ভুক্তভোগীর ক্ষেত্রে মামলা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার। ৬৫ শতাংশের বেশি মামলা যৌতুক ও ধর্ষণের অভিযোগে। এই আইনে শিশু ভুক্তভোগী এমন মামলা হয়েছে ১ হাজার ৮৮৮টি।

বিকল্প পুলিশি ব্যবস্থা প্রয়োজন

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক প্রথম আলোকে বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের ৬০ শতাংশ ঘটছে শহরাঞ্চলে। তবে যত অপরাধ হচ্ছে তার ২৫ শতাংশের ক্ষেত্রেও অভিযোগ হচ্ছে না। কারণ, বিচারপ্রক্রিয়া জনবান্ধব নয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে উন্নত দেশের আদলে একটি বিকল্প পুলিশি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে পুলিশ, স্থানীয় জনগণ, ভুক্তভোগীর পাশাপাশি অপরাধীদেরও যুক্ত করতে হবে। অপরাধীদের বিচ্ছিন্ন রেখে অপরাধ নির্মূল করা যাবে না।