মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর

সমতল থেকে পাহাড়ে সমান অধিকারের দাবিতে গ্রাফিতিছবি: প্রথম আলো। বান্দরবান। ১৪ আগস্ট ২০২৫

গত বছরের (২০২৪) ১৮ সেপ্টেম্বর মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে এক বাঙালি যুবক গণপিটুনিতে নিহত হন। পরদিন জেলার দীঘিনালায় পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে সহিংসতায় গণপিটুনিতে মারা যান এক পাহাড়ি ব্যক্তি। রাতে জেলা সদরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর গুলিতে দুই পাহাড়ি যুবক নিহত হন। এ ঘটনার জেরে ২০ সেপ্টেম্বর রাঙামাটি শহরে অনিক কুমার চাকমা নামের এক যুবককে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

পাহাড়ে সহিংসতা নতুন কিছু নয়। কিন্তু গত বছর অনেক দিন পর পাহাড়ে এত বড় সহিংসতা ঘটল।

সংখ্যা বা ধরন যেদিক থেকেই বিচার করুন, আদিবাসীদের ওপর নিপীড়ন মোটেও কমেনি। বিশেষ করে পাহাড়ে সহিংসতার এমন ধরন আগে দেখা যায়নি।
কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা

নৃগোষ্ঠীর মানুষের ওপর নিপীড়নের সংখ্যা কমেনি গত এক বছরে। উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়নে। যে সংস্কারপ্রক্রিয়া চলছে, সেসবে নৃগোষ্ঠীর দাবির প্রতিফলন নেই। পাহাড়ে ভূমি কমিশনের কাজ বন্ধ।

এমন অবস্থায় আজ ৯ আগস্ট পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘আদিবাসী মানুষের অধিকার রক্ষা ও ভবিষ্যৎ গড়ার লড়াইয়ে আধুনিক প্রযুক্তির ভূমিকা’।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে পাহাড়িদের ওপর সহিংস হামলায় নিহত হন চারজন। এরপর চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে হামলা, জমি দখল, হয়রানি ও নিপীড়নের ঘটনা কমেনি।

মানবাধিকার লঙ্ঘন চলছেই

ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অধিকার নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান কাপেং ফাউন্ডেশন গতকাল শুক্রবার চলতি বছরের ৩১ জুলাই পর্যন্ত মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরে। সেখানে দেখা গেছে, এ সময়ে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নারীদের ওপর ২৪টি নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২১টি ঘটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে, তিনটি সমতলে। ছয়জন নারী ধর্ষণ ও দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। দুজন নিহত হয়েছেন।

পাহাড় ও সমতল মিলিয়ে গ্রেপ্তারের পর মৃত্যু, বিনা বিচারে আটক, মারধর, হেনস্তা এবং জোর করে ধর্মান্তরিত করার মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ৩৪টি ঘটনা ঘটেছে।

কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, ‘সংখ্যা বা ধরন যেদিক থেকেই বিচার করুন, আদিবাসীদের ওপর নিপীড়ন মোটেও কমেনি। বিশেষ করে পাহাড়ে সহিংসতার এমন ধরন আগে দেখা যায়নি।’

খাগড়াছড়ি শহরের দুই পাহাড়ি যুবক নিহত হওয়ার ঘটনায় মামলা নিয়ে সদর থানার ওসি আবদুল বাতেন মৃধা বলেন, মামলাটি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।

রাঙামাটিতে প্রকাশ্যে পিটিয়ে নিহত অনিক চাকমার মামলার বিষয়ে কোতোয়ালি থানার ওসি সাহেব উদ্দিন বলেন, এ ঘটনায় ৬ জন গ্রেপ্তার আছে। মামলার তদন্ত চলছে।

রাজধানীর বুকে এমন হামলা হবে তা কোনো দিন ভাবিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আশা ছিল, আমাদের ওপর সহিংসতা কমবে; কিন্তু আচরণে হতাশ হয়েছি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা

‘সংস্কারে জায়গা হয়নি’

এ পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত সংস্কার কমিশনগুলোর একটিতে চাকমা সার্কেল প্রধান ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়কে একটি কমিশনে থাকার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। গত বছরের অক্টোবরে এ বিষয়ে দেবাশীষ রায় প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ‘সংস্কার কমিশন গঠন প্রক্রিয়ায় যাঁরা ছিলেন, তাঁরা আমাকে ওই কমিশনে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এরপর কীভাবে সেই নিয়োগ প্রস্তাব বাতিল হয়ে গেল, সেটা আমি বলতে পারব না।’

নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনে যথাক্রমে নিরূপা দেওয়ান ও ইলিরা দেওয়ানকে রাখা হয়। কিন্তু সংস্কার কমিশনের সুপারিশে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি মোটেও সুবিচার করা হয়নি বলে মনে করেন নিরূপা দেওয়ান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সংবিধান সংস্কার কমিশনে ‘আদিবাসী’ শব্দটিই নেই। অথচ প্রধান উপদেষ্টা গত বছরের আগস্ট মাসে দেশে এসে এ শব্দটি নিজেই উচ্চারণ করেছিলেন। সংবিধান সংস্কার কমিশনে সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টি একেবারে উপেক্ষা করা হয়েছে।

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বসেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে পুরোনো দল জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। এ দলটির সঙ্গেই সরকার ১৯৯৭ সালে ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি করে। কিন্তু এ দলটির সঙ্গে কমিশন কোনো আলোচনা করেনি। জেএসএসের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য দীপায়ন খীসা বলেন, ‘ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে একটি বৈঠকের জন্য বারবার অনুরোধ করলেও তারা সাড়া দেননি।’

জেএসএসের সঙ্গে বৈঠক না করলেও পার্বত্য চুক্তিবিরোধী ইউপিডিএফের সঙ্গে একটি সংলাপ করে ঐকমত্য কমিশন। কিন্তু পরে এ নিয়ে সমালোচনা হলে দ্বিতীয়বার আর ইউপিডিএফের সঙ্গে আলোচনা করেনি।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই সরকার গঠিত হয়েছিল বৈষম্যের নিরসনে; কিন্তু সরকারের বৈষম্য বিলোপের চেষ্টা দেখিনি। সংস্কারের প্রক্রিয়ায় আমাদের ঠাঁই হয়নি। বরং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বেড়েছে।’

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে একটি জাতীয় পর্যায়ে পরিবীক্ষণ কমিটি আছে। অন্তর্বর্তী সরকার এটি পুনর্গঠন করে। গত ১৯ জুলাই এ কমিটির প্রথম ও একমাত্র বৈঠক হয়। চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ বলতে এই একটি বৈঠক।

‘সরকারের আচরণে হতাশ হয়েছি’

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঁচ পাতাসহ একটি গাছের গ্রাফিতি পরিচিত হয়ে ওঠে। সেই পাঁচ পাতার নাম ছিল, হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-আদিবাসী।’ এতে লেখা ছিল ‘পাতা ছেঁড়া নিষেধ’।

চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে নবম ও দশম শ্রেণির বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও নির্মিতি বইয়ের পেছনের প্রচ্ছদে এই গ্রাফিতি যুক্ত করা হয়েছিল। এর প্রতিবাদ জানিয়ে তা সরিয়ে দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে ‘স্টুডেন্ট ফর সভারেন্টি’ নামে বাঙালিদের (মূলত পাহাড়ের অভিবাসিত) একটি সংগঠন। একপর্যায়ে সেটি সরিয়েও নেয় এনসিটিবি।

এর প্রতিবাদে ঢাকায় থাকা ক্ষুদ্র জাতিসত্তার শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। ১৫ জানুয়ারি মতিঝিলের এনসিটিবি ভবনের দিকে মিছিল নিয়ে গেলে স্টুডেন্ট ফর সভারেন্টির কর্মীরা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেন। এতে অন্তত ১৫ জন আহত হন। তাঁদের একজন রুপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষার্থী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। পরে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়কও হন। রুপাইয়া বলছিলেন, ‘রাজধানীর বুকে এমন হামলা হবে তা কোনো দিন ভাবিনি। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আশা ছিল, আমাদের ওপর সহিংসতা কমবে; কিন্তু আচরণে হতাশ হয়েছি।’