নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিতে চালু হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড, কোথায় কোথায় পাইলটিং প্রকল্প
পর্যায়ক্রমে সব পরিবারের নারীরা কার্ড পাবেন।
মা অথবা নারীপ্রধানের নামে কার্ড ইস্যু হবে।
পাইলটিং এলাকা ১৪টি।
বিএনপি সরকার নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করতে যাচ্ছে। ১০ মার্চ থেকে পরীক্ষামূলক এই কার্ড দেওয়া হবে। একে একে দেশের সব পরিবারকে এই কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ডের ব্যাপারে মানুষের মধ্যে বেশ আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। কারণ, দেশের মানুষ লম্বা সময় ধরে আর্থিক দুরবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বড় ধাক্কা এসেছিল করোনা মহামারির সময়। মানুষ কাজ হারায়, দারিদ্র্য বাড়ে। মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতিতে। নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের দাম বেড়ে যেতে দেখা যায়। অন্যদিকে দেশে চলমান প্রায় ১০০ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দরিদ্র সব মানুষকে সুরক্ষা দিতে পারেনি। এসব কর্মসূচিতে দ্বৈততা আছে, কাজের পুনরাবৃত্তি (ওভারল্যাপিং) আছে, সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অনিয়ম–দুর্নীতির অভিযোগ আছে। এ রকম একটি প্রেক্ষাপটে ফ্যামিলি কার্ড বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার শুরু হওয়ার আগে থেকেই বিএনপি ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর কথা বলে আসছিল। নির্বাচনী ইশতেহারে প্রধান প্রতিশ্রুতির শুরুতে ফ্যামিলি কার্ডের কথা আছে। এতে বলা হয়েছে, প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ফ্যামিলি কার্ড চালু করে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। অর্থসেবার এই পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে।
ইতিমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির পরীক্ষামূলক কাজের অংশ হিসেবে পাইলটিং বা দিশারী প্রকল্প শুরু হয়েছে। ১৪টি স্থানে প্রকল্পের কাজ হবে। এলাকাগুলো হচ্ছে রাজধানীর কড়াইল বস্তি, ভাষানটেক বাগানবাড়ি বস্তি, রাজবাড়ীর পাংশা, চট্টগ্রামের পটিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর, বান্দরবানের লামা, খুলনার খালিশপুর, ভোলার চরফ্যাশন, সুনামগঞ্জের দিরাই, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, বগুড়া সদর, নাটোরের লালপুর, ঠাকুরগাঁও সদর এবং দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ।
প্রাথমিকভাবে নেওয়া প্রকল্পের আওতায় দিরাইয়ের কুলঞ্জ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড রয়েছে।
সুনামগঞ্জ জেলার সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক সুচিত্রা রায় প্রথম আলোকে বলেন, এখানে চার সদস্যের ওয়ার্ড কমিটি ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে কাজ শুরু করেছে। জরিপের কাজ শেষ। ডেটা এন্ট্রির কাজও প্রায় শেষ। আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাজ শেষে ১০ মার্চ সুনামগঞ্জে এ কর্মসূচি শুরু করতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদী।
বান্দরবান জেলার লামা উপজেলায় এ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা আছে। জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মিল্টন মুহুরি প্রথম আলোকে বলেন, এখানে মাঠপর্যায়ের কাজ শেষ। ১০ মার্চ কার্ড বিতরণের জন্য তাঁরা প্রস্তুত।
বিভিন্ন জেলা ও সমাজসেবা অধিদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জরিপ ও তথ্য অন্তর্ভুক্তির (ডেটা এন্ট্রি) কাজ শেষ হয়েছে। ৯ মার্চের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড মুদ্রণ শেষ হবে। ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে ফ্যামিলি কার্ডের উদ্বোধন করবেন। ওই দিনই সুবিধাভোগীদের কাছে মুঠোফোনে প্রথম মাসের নগদ সহায়তা পৌঁছে যাবে।
উপকারভোগী নির্বাচনে ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে পাঁচ স্তরবিশিষ্ট কমিটি কাজ করবে। এর মধ্যে রয়েছে উপজেলা কমিটি (শহরে শহর কমিটি), ইউনিয়ন কমিটি, পৌর কমিটি (শহরে), ওয়ার্ড কমিটি। সব কমিটির ওপরে থাকবে মন্ত্রিসভা কমিটি। অর্থমন্ত্রী এ কমিটির সভাপতি। আর কমিটির সদস্যসচিব সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব। এরপর জাতীয় কারিগরি ও তথ্য ব্যবস্থাপনা (ডেটা ম্যানেজমেন্ট) কমিটি। এ কমিটির প্রধান সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।
কী এই কার্ড, কে পাবেন
এ কর্মসূচির সরকারি নীতিপত্রে বলা হয়েছে, ফ্যামিলি কার্ড মূলত একীভূত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। ব্রাজিলে এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের ফলে দারিদ্র্য কমেছে। ভারত ও ইন্দোনেশিয়াতেও এ ধরনের পরিবারকেন্দ্রিক সহায়তা কর্মসূচি আছে, যাতে সফলতাও দেখা যাচ্ছে।
গত সপ্তাহে সচিবালয়ে সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে মূল দায়িত্বে থাকবে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। তবে নারী ও শিশু, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, অর্থ, পরিকল্পনাসহ মোট ১৪টি মন্ত্রণালয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরাসরি যুক্ত থাকবে। তিনি বলেন, ‘আমরা পাইলটিং শুরু করছি। একপর্যায়ে দেশের সব পরিবার এই কার্ড পাবে। তবে এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে প্রান্তিক ও দরিদ্র পরিবার।’
পরিবারে থাকা মা অথবা নারীপ্রধানের নামে এই কার্ড ইস্যু করবে সরকার। কার্ডের মালিকের বয়স ১৮ বছরের বেশি হতে হবে। কার্ডে নাগরিকের সব ধরনের তথ্য থাকবে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই কার্ডকে ‘সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ড’–এ রূপান্তর করার কথা বলা হচ্ছে।
কাগজপত্রে বলা হয়েছে, পরিবার নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবারের শ্রেণি (উচ্চ বা নিম্নবিত্ত) নির্ধারণ করা হবে। ভূমিহীন ও গৃহহীন, প্রতিবন্ধী সদস্যসংবলিত পরিবার, নারীপ্রধান পরিবার এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠী (হিজড়া, বেদে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী) আর্থিক বা খাদ্যপণ্য সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে।
আর্থিক চ্যালেঞ্জ
অর্থ মন্ত্রণালয় নতুন সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকা ছয়টি কর্মসূচির কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে। এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড আছে। প্রাথমিকভাবে নেওয়া চার মাসের প্রকল্পের সময় ৪০ হাজার পরিবারকে কার্ড দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই চার মাসের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা।
প্রকল্প শেষে দেশব্যাপী ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে অর্থ বিভাগ সে অনুযায়ী বাজেট বরাদ্দ ও অর্থছাড় বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এ ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও বলেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। যেমন নগদ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অর্থনীতিতে সরবরাহ বৃদ্ধির প্রয়োজন হবে। প্রাথমিকভাবে নেওয়া প্রকল্প শেষ হওয়ার পর এ বিষয়ে ছোট পরিসরে গবেষণার কথাও বলা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় মনে করে, ফ্যামিলি কার্ডে অতিরিক্ত আর্থিক সংশ্লেষ থাকার কারণে তা বাজেটঘাটতি বৃদ্ধি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমন কর–জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো; ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাজেটঘাটতি সহনীয় পর্যায়ে রাখা; অন্যান্য কর্মসূচির সঙ্গে দ্বৈততা এড়িয়ে ব্যয় কমানো এবং আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সমন্বয় করা।
সহায়তার একক ধারা
দেশে প্রায় ১০০ সামাজিক সুরক্ষা ও সহায়তা কর্মসূচি আছে। ফ্যামিলি কার্ড চালু হওয়ার পর সব নগদ ভাতা ও টিসিবি সহায়তা একক কার্ডের অধীনে আনা হবে বলে জানা গেছে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জিয়াউদ্দিন হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, চলমান সহায়তা কর্মসূচিতে বেশ কিছু ত্রুটি আছে। উপকারভোগী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব দেখা গেছে। যাঁর সহায়তা পাওয়ার কথা, তিনি তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি একাধিক সহায়তা পেয়ে চলেছেন। ফ্যামিলি কার্ড চালুর মাধ্যমে সহায়তা কর্মসূচিকে এক ধারায় আনা হবে। ঠিক মানুষ সহায়তা পাবে। আবার সম্পদের অপচয় রোধ হবে।
নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, টাকা বা খাদ্যপণ্য যা–ই হোক না কেন, তা যাবে নারীর হাতে। এখান থেকেই নারী সঞ্চয় করবেন। সহায়তা ও সঞ্চয় নারীর ক্ষমতায়ন ঘটাবে।
এ উদ্যোগ সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান প্রথম আলোকে বলেন, এটি ভালো উদ্যোগ নিঃসন্দেহে। মনে রাখতে হবে, দেশে ১০০টির মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আছে, যেগুলো ২৫টির মতো মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করে। এতে দ্বৈততা, পুনরাবৃত্তি আছে। আছে দুর্নীতির অভিযোগ। ফ্যামিলি কার্ড চালুর মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোকে একই ধারায় করা যেতে পারে।
সেলিম রায়হান বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা লাগতে পারে। এর সঙ্গে আছে প্রশাসনিক ব্যয়। সে ক্ষেত্রে অর্থায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।