স্থপতি এফ আর খানের উদ্ভাবন আজও প্রাসঙ্গিক

স্মরণ অনুষ্ঠানে দীর্ঘ বক্তব্যে এফ আর খানের জীবন ও কর্ম তুলে ধরেন অধ্যাপক এম শামীম জেড বসুনিয়া। ৪ এপ্রিলছবিধ প্রথম আলো

বিশ্বখ্যাত স্থপতি এফ আর খানের (ফজলুর রহমান) উদ্ভাবন, চিন্তা ও কর্মদর্শন আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষাবিদ ও কাঠামো প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামীম জেড বসুনিয়া।

বিশ্বখ্যাত স্থপতি এফ আর খানের (ফজলুর রহমান খান) ৯৭তম জন্মদিন ছিল গত শুক্রবার। ‘স্থাপত্যশিল্পের আইনস্টাইনখ্যাত’ এই ব্যক্তিত্বের অবদান তুলে ধরতে স্মরণ ও আলোচনা সভার আয়োজন করে দেশের শীর্ষস্থানীয় আবাসন কোম্পানি বিল্ডিং টেকনোলজি অ্যান্ড আইডিয়াস লিমিটেড (বিটিআই)। শনিবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘দ্য লাইফ অ্যান্ড লিগ্যাসি অব ফজলুর রহমান খান: আইনস্টাইন অব স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

স্মরণ অনুষ্ঠানে দীর্ঘ বক্তব্যে এফ আর খানের জীবন ও কর্ম তুলে ধরেন অধ্যাপক এম শামীম জেড বসুনিয়া। তিনি বলেন, এফ আর খান শুধু একজন প্রকৌশলী নন, বরং বিশ্বনন্দিত এক মেধাবী চিন্তক; যিনি আধুনিক নগর স্থাপত্যের ধারা বদলে দিয়েছেন। তাঁর কাজের প্রভাব আজও বিশ্বের বিভিন্ন শহরের ‘স্কাইলাইনে’ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ
ছবি: প্রথম আলো

সমস্যার গভীরে গিয়ে সমাধান খোঁজার প্রবণতা এফ আর খানের কাজের মূল শক্তি ছিল বলে মন্তব্য করেন এই শিক্ষক। শামীম জেড বসুনিয়া বলেন, এফ আর খান বিশ্বাস করতেন, প্রতিকূলতার মধ্যেই সুযোগ লুকিয়ে থাকে। এই দৃষ্টিভঙ্গি স্থাপত্য ও প্রকৌশলের জটিল সমস্যাগুলো সমাধানে তাঁকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়।

অধ্যাপক এম শামীম জেড বসুনিয়া বলেন, ‘এফ আর খানের উদ্ভাবিত নকশা ও কাঠামোগত ধারণা আধুনিক উচ্চ ভবন নির্মাণে নতুন দিক উন্মোচন করেছে। তাঁর চিন্তা আমাদের অনেক দূর নিয়ে গেছে। ঢাকার পরিবর্তিত নগরচিত্রেও তাঁর চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায়।’

আধুনিক আকাশচুম্বী ভবনের নকশায় বিপ্লব ঘটানো প্রখ্যাত প্রকৌশলী ফজলুর রহমান খানের অবদান বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত হলেও বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁকে যথাযথ সম্মান জানাতে পারেনি।
রফিক আজম, স্থপতি

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। স্থপতি এফ আর খানের অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এফ আর খানসহ দেশের কৃতী সন্তানদের মূল্যায়নে একটি সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, যেখানে অল্প কিছু ব্যক্তিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে সব অবদানকারীকে যথাযথ সম্মান জানানোর আহ্বান জানান তিনি।

স্থপতি এফ আর খানকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানান আরেক স্থপতি রফিক আজম। তিনি বলেন, আধুনিক আকাশচুম্বী ভবনের নকশায় বিপ্লব ঘটানো প্রখ্যাত প্রকৌশলী ফজলুর রহমান খানের অবদান বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত হলেও বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁকে যথাযথ সম্মান জানাতে পারেনি।

রফিক আজম বলেন, ফজলুর রহমান খানের উদ্ভাবিত ‘টিউবুলার স্ট্রাকচারাল সিস্টেম’ ছাড়া আজকের দিনের সুউচ্চ ভবন নির্মাণ প্রায় অসম্ভব হতো।

অনুষ্ঠানে চাচা এফ আর খানকে নিয়ে স্মৃতি তুলে ধরেন বিটিআইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফায়জুর রহমান খান। বক্তব্যে তিনি তাঁর চাচার জীবন, কাজ ও দর্শন তুলে ধরে নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করার আহ্বান জানান।

বিটিআইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, তাঁর চাচা শুধু একজন প্রকৌশলী নন, বরং আত্মবিশ্বাস ও সৃজনশীলতার এক প্রতীক। তিনি বলেন, ‘চাচা কখনো ব্যর্থতাকে ভয় পাননি। শূন্য পাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও তিনি চেষ্টা চালিয়ে যেতেন। এই মানসিকতাই একজন মানুষকে বড় করে।’ পাশাপাশি এফ আর খানের জীবন ও কর্ম পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান তিনি।

স্থপতি এফ আর খানের জন্ম বাংলাদেশের মাদারীপুরের শিবচরে, ১৯২৯ সালের ৩ এপ্রিল। ১৯৫২ সালে বৃত্তির সুবাদে তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানকার ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় থেকে এফ আর খান দুটি বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি ও একটি বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন মাত্র তিন বছরে।

এরপর দেশে ফিরে কিছুদিন অধ্যাপনাও করেন এফ আর খান। এরপর তিনি যোগ দিয়েছিলেন করাচি ডেভেলপমেন্ট অথরিটিতে। পরবর্তী সময়ে আবার পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৬০ সালে মার্কিন স্থাপত্য সংস্থা স্কিডমুর-ওয়িংস-মেরিলে যোগ দেন আবার। তাঁর পছন্দের বিষয় ছিল স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং। এফ আর খান ১৯৮২ সালে মাত্র ৫২ বছর বয়সে মারা যান।

এফ আর খানের নকশা করা যুক্তরাষ্ট্রের সিয়ারস টাওয়ারই ছিল একসময় বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন। ১১০তলা, ১ হাজার ৪৫৪ ফুট উঁচু এই ভবনই বিশ্বখ্যাতি এনে দেয় স্থপতি এফ আর খানকে।

স্থপতি জান্নাত জুঁইয়ের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিটিআইয়ের চিফ স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার ইশতিয়াক হোসেন। এফ আর খান রবীন্দ্রসংগীত পছন্দ করতেন, তাঁর পছন্দের রবীন্দ্রসংগীতের মধ্য দিয়েই শেষ হয় স্মরণ অনুষ্ঠানের।