জুলাইয়ের তরজমা
কলমে বা কি-বোর্ড দিয়ে যতবার লিখি জুলাই, ঝিলিক দেয় স্মৃতি। যে জলদ-জালাল জনতার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জুলাইয়ের আবির্ভাব ঘটেছিল, সেই মুহূর্ত আজ শহীদের কবরে আর জীবিত জনগণের অপূর্ণ স্বপ্নে নিহিত। বাছা বাছা বুলিতে সেই স্মৃতি পুনঃসৃজন করার চেষ্টাগুলো এখন বড় খণ্ডিত শোনায়। জুলাইয়ের ওয়ারিশির নানা বিক্ষেপ ও বাঁটোয়ারা ঘটে গেছে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর উদগ্র প্রতিযোগিতায়। কেউ তুলছে গাদ্দারির অভিযোগ, কেউ প্রতিবিপ্লবের কালক্রম হিসাব করছে, কেউ জুলাই নিয়ে ব্যবসার খতিয়ানের ময়নাতদন্ত করছে। জুলাই এক, আর তার আখের আরেক। জুলাইয়ের উত্তরস্মৃতিতে অপ্রাপ্তি ও খণ্ডিত ইয়াদগারি ছাপিয়ে তবু যা রয়ে যায়, তা হলো জনগণের রাজনৈতিক বাসনার রেশ।
গণ-অভ্যুত্থান আকস্মিক ঘটনা নয়। ঘটনাকে ফেটিশ না বানিয়ে তাকে তার তফসিরে বোঝা জরুরি। মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশ বিগত দুই-তিন দশকে আখেরি পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে সস্তা ও বদলিযোগ্য শ্রমের ঠিকাদার-জোগানদার হয়ে ওঠায় সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য তীব্রতর হচ্ছিল। গত দেড় দশকের চাকরিহীন প্রবৃদ্ধির বাস্তবতা লাখ লাখ বেকার ও বিপন্ন তরুণের অর্থনৈতিক জীবনকে তামা তামা করে ফেলছিল। প্রেমময় সংসার রচনার সোনালি স্বপ্ন ফিকে হয়ে আসছিল অর্থনৈতিক বিপন্নতা ও বঞ্চনায়। ক্রমপুঞ্জিত বৈষম্য ও বঞ্চনার এই বাস্তবতায় কায়েমি বন্দোবস্তের কাছে বড় ঝুঁকি ছিল জনগণের রাজনৈতিক কর্তাগিরি। সেই কর্তাগিরিকে দমন করতে ক্রমেই একচ্ছত্র নির্বাহীগিরি ক্ষমতার প্রধান প্রকরণ হয়ে ওঠে। নির্বাচনী প্রতিনিধিত্ব ও আইনি বিচার পাওয়ার অধিকার তখন পড়ে ধামাচাপা।
তবে একরোখা ক্ষমতাও এক রেখায় নিজের বিস্তার ঘটাতে পারে না, বরং বাড় বাড়তে বাড়তে সে নিজেই নিজের নিরাকরণের শর্তও রচনা করে। ২০১৩-এর শাহবাগ-হেফাজত পর্বের পরে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, শ্রমিকদের মজুরির আন্দোলন, ধর্মবাদী গোষ্ঠীর আকিদাকেন্দ্রিক বিক্ষোভ, নারীবাদীদের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন কিংবা তরুণদের জীবিকার আন্দোলন—সংগঠিত ও অসংগঠিত নানা বর্গের এসব আন্দোলন রাস্তা ও ডিজিটাল পরিসরে পাকাচ্ছিল মুহুর্মুহু। ক্ষমতার প্রযোজিত জবানি জনমনে ক্রমেই ফাঁপা-ফোপরা হয়ে উঠছিল। ক্ষমতার তামাশাশালায় জমা হচ্ছিল বিচিত্র সব প্রতীক: সাদিক অ্যাগ্রোর মহাছাগল কিংবা ক্ষমতাবানদের ফোনালাপে উদগ্র ধর্ষকামের বরাত মানুষের কাছে ক্ষমতার রগরগে মজাগিরিকে উদোম করে দিয়েছিল। বিচারহীন সমাজে বিক্ষোভের স্খালন হয় বলি ও বিসর্জনে। জুলাইয়ের আগে আগে একের পর এক বয়কট-নিষিদ্ধ-উন্মোচন-কেলেঙ্কারি ত্বরিত বেগে ঢেউয়ের মতো আসতে থাকে। সমাজের শিরায় শিরায় দানা বাঁধা গায়েবি অসন্তোষ নানা উপসর্গ হয়ে মাথাচাড়া দিচ্ছিল। স্তূপীকৃত বারুদ কখন কীভাবে দাউ দাউ জ্বলে উঠবে, সেই আন্দাজ কারও ছিল না। সলতে ছড়ানো ছিল সর্বত্র।
অনুভূমিক ও বহুবর্গীয় জুলাইয়ে শরিক নানা পক্ষ রাজনৈতিক বাসনার ভিন্ন ভিন্ন ব্যঞ্জনা নিয়ে সমবেত হয়েছিল। জাস্টিস বা ইনসাফ, সংস্কার ইত্যাদি বহুব্যঞ্জক পদের টানে সমবেত হয়েছিল নানা পদের জনতা।
১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের পাশাপাশি ছাত্রীদের ওপরও আঘাতের ফলে সেই আগ্নেয় সংযোগ ঘটে যায়। আবু সাঈদের দুই হাত ছড়ানো আত্মদানের পর কারবালার স্মৃতি জাগ্রত করল মুগ্ধের ‘পানি লাগবে’, আর ডিজিটাল স্ক্রিনে ফাইয়াজের অপাপবিদ্ধ মুখ মানুষের হৃদয়কে ফালা ফালা করে দিল। রাজনীতিবিযুক্ত ছাত্রছাত্রী-তরুণ-তরুণীরা আর বসে থাকতে পারল না। বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বহু ঘটনা যত সহজে ঘটেছে, এবার সেই জল্লাদগিরি অরাজনৈতিক মধ্যবিত্তের সন্তানকেও একছের নিধনযোগ্য বলে শনাক্ত করল। এত দিন উন্নয়ন ও নিরাপত্তার নিরাপদ তন্দ্রায় একচ্ছত্র নির্বাহী কর্তৃত্ববাদের বন্দোবস্তের প্রতি নগরবাসী ভদ্রলোকের যতটুকু সম্মতি ও আনুগত্য ছিল, সেটা এর ফলে খানখান হয়ে টুটে গেল। ‘বুকের ভেতর দারুণ ঝড়,/ বুক পেতেছি গুলি কর’ স্লোগান রাষ্ট্রক্ষমতা ও হিংসার প্রশ্নকে একেবারে চোখের সামনে এনে দিল।
জুলাই যে আকার নিল, তার বনিয়াদ অনেকটা নিহিত ছিল বিদ্যমানের গর্ভে। কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার শাসনের মধ্যে সংগঠিত রাজনৈতিক আঙ্গিক সম্ভব ছিল না। জুলাইয়ে রাজনৈতিক দলগুলো সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে পারেনি, কোনো সর্বদলীয় সমন্বয় পরিষদও হয়নি। বৈষম্যবিরোধী সমন্বয়কেরা ছিলেন সামনে, কিন্তু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী, মাদ্রাসার তালেবে এলেম, শহরের শ্রমিক ও বেকার কিংবা চাকরিজীবী-সুশীল ছা-পোষা মধ্যবিত্ত যে রাস্তায় নেমে এল, তা কোনো নেতার হুকুমে নয়, আন্দোলনটি বরং সম্প্রসারিত হয় মাথাহীন অনুভূমিক-আড়াআড়িভাবে। তাই সুনির্দিষ্ট কোনো নেতৃত্বের দাবিনামার চেয়েও জুলাইয়ের রাজনৈতিক বাসনাকে খুঁজতে হবে নানা আলাপে, দেয়ালচিত্রে, স্লোগানে—‘লাখো শহীদের রক্তে কেনা, দেশটা কারও বাপের না।’ মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকারকে ধারণ করে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর পিতৃতান্ত্রিক মৌরসিপাট্টার দাবিকে নাকচ করে এ স্লোগান শুধু পরিবারতন্ত্র নয়, গোষ্ঠীতন্ত্র ও পিতৃতন্ত্রকেও ফেলে প্রশ্নের মুখে। দেশটা কারও বাপেরই না, বরং আপামর নাগরিকের মৈত্রীর ভিত্তিতে রচিত।
অনুভূমিক আন্দোলন বলেই জুলাইয়ে সবাই অভিন্ন বোঝাপড়া নিয়ে শরিক হয়নি। ‘তুমি কে? আমি কে?/ রাজাকার রাজাকার’ স্লোগান দিয়েই জুলাইয়ে শরিক নানা পক্ষের মতভেদ প্রথম তীব্র হয়ে ধরা পড়ে। এই স্লোগান ব্যবহারের প্রথম ধরনটি ছিল কূটাভাস-পরিহাসের; একাত্তরের নানা চিহ্নকে ক্ষমতাসীনেরা যেভাবে আত্মস্বার্থে তকমা আকারে ব্যবহার করেছিল, সেই স্বার্থবাদী তকমাবাজিকে অচল করে জনযুদ্ধের গণতান্ত্রিক শাঁসকে পুনর্বহাল করাটাই ছিল গরজ। কিন্তু উল্টো দিকে একাত্তরবিরোধী একটা গোষ্ঠী এই স্লোগানকে কামিং-আউট টাইপের আত্মশনাক্তি হিসেবেও আমল করেছে—তারা রাজাকার-সত্তার ঐতিহাসিক গ্লানিকে গোসল করিয়ে রিক্লেইম করতে চেয়েছে, চব্বিশকে একাত্তর প্যারাডাইমের প্রতিস্থাপন আকারে জারি করতে চেয়েছে। সে চেষ্টা অবশ্য অন্তিমে সফল হয়নি—ছাত্রছাত্রীরা আয়রনিকতা স্পষ্ট করতে যোগ করে, ‘কে বলেছে? কে বলেছে?/ স্বৈরাচার স্বৈরাচার।’ গণরাজনীতিতে ভাষা সব সময়ই একটা লড়াইয়ের ক্ষেত্র। তকমা মাত্রই শাসনের অনুষঙ্গ, তকমা ছাড়া ভাষা নাই, ক্ষমতাও নাই। তাই ক্ষমতার পুনর্গঠন মানে ভাষা ও তকমারও পুনর্বিন্যাস।
অনুভূমিক ও বহুবর্গীয় জুলাইয়ে শরিক নানা পক্ষ রাজনৈতিক বাসনার ভিন্ন ভিন্ন ব্যঞ্জনা নিয়ে সমবেত হয়েছিল। জাস্টিস বা ইনসাফ, সংস্কার ইত্যাদি বহুব্যঞ্জক পদের টানে সমবেত হয়েছিল নানা পদের জনতা। জনগণের এই যে গঠন ও কিউরেশন, তা অনিবার্যভাবেই একটি গাঠনিক বর্জনের মধ্য দিয়ে রচিত হয়। জুলাই জনগণের ঐক্যও ৫ আগস্ট একটি বিসর্জনের (স্পারাগমোস) মধ্য দিয়ে পরিণতি পায়। বহু পদের জনতার এক সমতলে সমবেত হওয়ার কারণে উত্তর-ভাবাদর্শবাদী ঘটনা আকারে জুলাইয়ের চরিত্র শনাক্ত করার চেষ্টা হলেও সেই সাময়িক ঐক্য কোনো গাঠনিক রাজনৈতিক প্রকল্প তৈরি করতে পারেনি।
ফলে দুটি বিতর্ক দাঁড়ায়। প্রথমত, নমুনা (প্যারাডাইম) নিয়ে—এটি বিপ্লব নাকি গণ-অভ্যুত্থান? বিপ্লবের শর্তই হলো সমাজে শ্রেণিসম্পর্ক ও কায়েমি বন্দোবস্তের আমূল পরিবর্তন, যা জুলাইয়ে ঘটেনি—বৈশ্বিক অর্থনীতির গাঁটছড়ায় বাংলাদেশের সংলগ্নতায় পালাবদল আনাও সম্ভব হয়নি; কেবল জনগণের গণতান্ত্রিক বাসনার একটা দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, সমবায়ের (syntagm) সীমা নিয়ে ‘গাছের পাতা ছেঁড়া নিষেধ’ ছিল জুলাইয়ের তরুণদের বহুত্ববাদী সমবায়ী ভবিষ্যতের স্বপ্নের নমুনা। অথচ পরক্ষণেই জুলাইয়ের অন্তর্ভুক্তির পরিসীমা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। যে বহুবর্গীয় জনতা এক সমতলে শরিক হয়েছিল, তাদের মধ্য থেকেই পাতা ছেঁড়া শুরু হলো—নারী, তরিকতপন্থী, বাউল, জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু, শাহবাগি—এ রকম নানা নাম ও চিহ্নের উসিলায় মানুষকে নিশানা করা শুরু হলো। জুলাইয়ের শরিকদেরও খারিজ করা শুরু হলো, বলা হলো অনেকে এতে অনিচ্ছুকভাবে অংশ নিয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, জুলাই বেগবান ও বিজয়ী হওয়ার পরে যারা এর বড় হিস্যা দাবি করেছে, তাদের অনেকেই আন্দোলনটির ব্যাপারে গোড়াতে নেতিবাচক ছিল।
এভাবে জুলাইয়ের হিস্যাকে কেন্দ্রীভূত এ একচেটিয়া করার চেষ্টা শুরু হয়। আমজনতা তবু জুলাইয়ের দাবি ছাড়েনি। জুলাইয়ের ঘনীভূত সর্বজনীন শক্তির তেজে নিজ নিজ দাবিতে মুখর হন সমাজের নানা বর্গের মানুষ—আদিবাসী, শ্রমিক, লিঙ্গীয় সংখ্যালঘু ও নানা প্রান্তিক বর্গ গণ-অভ্যুত্থানে শরিকানার গৌরবে আরও দৃঢ়তার সঙ্গে নিজেদের হিস্যা দাবি করতে চায়। বিপরীতে জুলাইয়ের হিস্যাকে সীমিত করে সমাজে আরও নিবিড় দমনবাদ জারি করার চেষ্টা দেখা যায়। নারী, পাহাড়ি ছাত্রছাত্রীরা মারধরের শিকার হন। সবচেয়ে সুসংগঠিতভাবে আক্রমণ করা হয় দেশের আনাচকানাচে ছড়িয়ে থাকা মাজারগুলোতে—মাকাম সংস্থার জরিপে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ৯৭টি মাজারে হামলার প্রমাণ পাওয়া যায়। একের পর এক ইস্যু তৈরি ও মেরুকরণ চলতে থাকে। একধরনের সিরিয়াল বলিতন্ত্রে আরিফুজ্জামান রূপম, হৃদয় রবি দাস, তৌহিদুল ইসলাম, পীর শামীম রেজার মতো মানুষ নিহত হন। সমাজের সংকটের দায় ব্যক্তি বা বর্গের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে পরিশোধনের রিচ্যুয়াল চালু করা হয়, যাকে বলে বলিতন্ত্র বা স্কেপগোটিং।
বিচ্ছিন্ন নানা গোষ্ঠী মিলে আস্ত একটা জনগণ হয়, কিন্তু আলাদাভাবে কোনো গোষ্ঠী জনগণের ইচ্ছার সাকার নয়। গোষ্ঠী যখন নিজের হাতে বলপ্রয়োগের নির্বাহী কর্তৃত্ব তুলে নেয়, তখন তাকে গোষ্ঠীতন্ত্র বলে। জুলাইয়ে জনগণের কর্তাসত্তার প্রশ্ন স্পষ্ট হওয়ার পরপরই তা গোষ্ঠীবাদী মবগিরির দাপটে আচ্ছন্ন হয়ে যায়। ‘মব’ শব্দটি একখানা বাহাসি (পলেমিকাল) বর্গ-কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতা সংঘবদ্ধ জনতার সব কর্তাগিরিকেই মব নাম দিয়ে খারিজ ও দমন করার চেষ্টা করে। কিন্তু বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে যা দেখা গেছে তা নিছক ‘মব’ নয়, সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী একের পর এক দেশজুড়ে মাজারসহ নানা বর্গকে নিশানা করে জুলুম চালিয়েছে, আর গোষ্ঠীর এই বেআইনি নির্বাহীগিরিতে কর্তৃপক্ষ পর্যাপ্ত নৈতিক ও আইনি বাধা দেয়নি। এই পরিস্থিতিকেই মবতন্ত্র বলা যেতে পারে।
জুলাইয়ের ঐকমত্যের জায়গা ছিল ‘নতুন বন্দোবস্ত’—‘বহুত দিন হাইয়ো, আর ন হাইয়ো’ স্লোগান এই বাসনারই অভিব্যক্তি। কিন্তু বন্দোবস্তের বদলের মানে কি সাংস্কৃতিক কিছু চিহ্নের বদল, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের সংবিধানে অদলবদল, নাকি একই সঙ্গে বস্তুগত সম্পর্কেরও বদল—এই প্রশ্নটির সমবেত মীমাংসা করতে পারেনি জুলাই-উত্তর রাজনৈতিক শক্তিগুলো। আমজনতার প্রত্যাশা ছিল জান-জীবিকা-জবানের অধিকার প্রতিষ্ঠা। সমাজে বিচার বা ইনসাফ যথেষ্ট নয়, বরং আদল ও ইহসানও প্রয়োজন হয়। হকার, পরিবহনশ্রমিক, পোশাকশ্রমিক, জলবায়ু-পর্যুদস্ত উপকূলবাসী, প্ল্যাটফর্ম ক্যাপিটালিজমের ছুটা কর্মী, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার গরিব ছাত্র, নিম্নবর্ণ ও নিম্নবর্গের মানুষ—তাদের জন্য কী প্রতিaৃশ্রুতি আনল জুলাই-উত্তর সময়? এ প্রশ্ন তো গৌণ নয়!
যেকোনো বিপ্লবের গর্ভেই বেহাত হওয়ার সম্ভাবনা সুপ্ত থাকে। একদিকে যেমন কায়েমি শক্তি জুলাইয়ের একটা অংশকে অনেকখানি কবজা করে ফেলে, পাশাপাশি জনপরিসরে গোষ্ঠীতান্ত্রিক জবরদস্তির চোটে সমাজের বড় একটা অংশই রক্ষণাত্মক অবস্থানে চলে যায়। ফলে সংস্কার বা সংবিধানসহ নানা প্রশ্নে ভবিষ্যৎ–মুখী গণ-ঐক্য রচনার সম্ভাবনা দুর্বল হয়ে পড়ে। নির্বাচনের কিছুদিন আগে তরুণ রাজনৈতিক কর্মী ওসমান হাদিকে হত্যা করা হলে সব পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ ও বিচার দাবি করা হলেও এর পরপরই দেশের কিছু গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলার মধ্য দিয়ে একধরনের সাংস্কৃতিক নির্মূলবাদী তৎপরতার চূড়ান্ত নমুনা দেখা যায়। জুলাইয়ের সম্ভাবনার বড় অংশ এভাবে হাতছাড়া হয়ে যায়।
তাহলে জুলাইয়ের স্মৃতিকে জারি রাখার আদব কী? রাজনৈতিক মহাঘটনা সাবলাইম বা জালালি ভাব নিয়ে আমাদের জীবনে হাজির হয়। কিন্তু জনগণ নিজেই সশরীর ঘটনার ওই জালালি ভাবের শরিক। ফলে জনগণের পক্ষ থেকে ঘটনার ফেটিশিকরণের বদলে মামুলিকরণ করাই জরুরি কাজ। উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অল্পদিন পরেই ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়’ স্লোগান উঠেছিল। মুক্তিযুদ্ধের পর রফিক আজাদের ‘ভাত দে হারামজাদা’ কিংবা আবু সালেহর ‘ধরা যাবে না ছোঁয়া যাবে না বলা যাবে না কথা/ রক্ত দিয়ে পেলাম শালার এমন স্বাধীনতা’ ইত্যাদি উচ্চারণে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাহাসি গণমুখরতার কিছু আন্দাজ পাওয়া যায়। জনগণের বাইরে মহাঘটনাকে বিচ্ছিন্ন চেতনার চিহ্নতন্ত্র আকারে জালালি বানিয়ে রাখা যায় না। ঘটনার অনন্ত প্রলম্বন বা মেকি পুনরাভিনয়ও সফল হয় না, বরং জনগণের ব্যবহারিক জীবনের আটপৌরে গরজে নিত্যতরজমার দ্বারাই ঘটনার তাৎপর্য জ্যান্ত থাকতে পারে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ভবিষ্যৎ নিহিত আছে এই আটপৌরে তরজমায়। জুলাই ছিল চলমান বিশ্ব-ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার একটা গুরুত্বপূর্ণ আলামত। আখেরি পুঁজিবাদী দুনিয়ার প্রান্তদেশে, বিপন্ন-বঞ্চিত-বিক্ষিপ্ত প্রিক্যারিয়াস তরুণদের নতুন ধরনের সক্রিয়তার ডাক দিয়ে গিয়েছিল জুলাই।
তাহমিদাল জামি: গবেষক ও সাংবাদিক