চ্যাম্পিয়ন দলটির অন্যতম সদস্য ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া আইমান মুর্শীদ। আইমান যখন ছোট ছিল, কারণে-অকারণে তার কান্না থামাতে গিয়ে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা মুশকিলে পড়ে যেতেন। তেমনই একদিন, আইমানের কান্না কিছুতেই থামানো যাচ্ছে না। এটা-সেটা হাতে দেওয়া হলো। নাহ্! কাজ হলো না। হঠাৎ কে যেন দাবার ঘুঁটিগুলো ছড়িয়ে দিল তার সামনে। ব্যস্! সাদাকালো ঘুঁটির দিকে তাকিয়ে কেন যেন কান্না ভুলে গেল ছোট্ট আইমান। আর হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন বড়রা।

তার পর থেকে অন্য কোনো খেলার উপকরণই আইমানকে সন্তুষ্ট করতে পারত না, দাবার বোর্ড আর ঘুঁটি ছাড়া। সেই থেকে শুরু। সারাক্ষণ দাবাতেই মজে থাকা হতো আইমান মুর্শীদের। দাবার প্রতি প্রবল আগ্রহ ও গভীর ভালোবাসার ফলও পেয়েছে সে চ্যাম্পিয়ন দলের একজন হয়ে।

দাবা আর পড়াশোনা, সমান তালেই চলে কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের নবম শ্রেণির জাওয়াদ আনানের। প্রতিযোগিতায় নাম নিবন্ধন করেই সেরা হওয়ার জন্য অনুশীলন শুরু করে জাওয়াদরা। অনুশীলনের কারণে স্কুলে কিছুটা অনিয়মিত হয়। এতে মা–বাবা ও শিক্ষকদের মনে চিন্তার ছাপ পড়ে জাওয়াদকে নিয়ে। প্রথমে তার দাবা খেলার বিষয়টা শিক্ষক ও অভিভাবকেরা সহজভাবে না নিলেও জেলার মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় পাল্টে যায় দৃষ্টিভঙ্গি। এরপর খুলনা বিভাগের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হয়ে স্কুল ও মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করে তারা; যে দলের নেতৃত্বে ছিল জাওয়াদ আনান।

যুবায়ের ইসলামের গল্পটা অবশ্য ভিন্ন। তার বেড়ে ওঠা দাবার সঙ্গেই। দাবার ঘুঁটির সঙ্গে হাঁটি হাঁটি পা-পা করে শৈশব কেটেছে তার। দাবার ঘুঁটি যেমন এক ঘর এক ঘর করে আগায়, তেমনি যুবায়ের ঘুঁটিকে ধরে হাঁটতে শিখেছে! কুষ্টিয়া শহরের ‘দাবার পরিবার’ হিসেবে সুনাম রয়েছে যুবায়েরদের পরিবারের। পারিবারিক আবহেই দাবা খেলার প্রতি আগ্রহ জন্মেছিল কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া যুবায়ের ইসলামের। বাবা কুষ্টিয়া দাবা ক্লাবের সভাপতি।

নানুও ভালো দাবা খেলেন। যুবায়ের ইসলামের গৃহিণী মা জেসমিন আক্তার বলেন, ‘আমাদের পরিবারের সবাই সময় পেলেই দাবা খেলি। দাবাই আমাদের অবসরের একমাত্র সঙ্গী। আমরা যখন দাবা খেলতাম, ছোট্ট যুবায়ের মনোযোগ দিয়ে খেলা দেখত। দাবার প্রতি তার আগ্রহ ও ভালোবাসা সেই ছোট্টবেলা থেকেই। আমরাও চাই, দাবা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাক যুবায়ের।’

দাবা খেলার জন্য আজমাইন জাওয়াদকে মোটামুটি ভালোই ‘সংগ্রাম’ করতে হয়েছে। সময়-অসময়ে দাবার বোর্ড নিয়ে পড়ে থাকার জন্য বকাও খেতে হয়েছে। কিন্তু দাবা খেলা ছাড়েনি আজমাইন। লুকিয়ে অনুশীলন চালিয়ে গেছে। দাবার প্রতি তীব্র ভালোবাসা দেখে মাঝেমধ্যে মা–বাবাও দাবা খেলতে দিতেন। এই ভালোবাসা ও নিষ্ঠার ফল পেয়েছে সে। দলীয়ভাবে বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হয়ে মুখে হাসি ফুটেছে তার।

খুলনা বিভাগের চ্যাম্পিয়ন এই দলের অন্য দুজন সদস্য সৈকত দাস ও শামীম রহমান। সারা দিনের পড়াশোনা শেষ করে যখন একটু সময় পেত, দুজনই মেতে উঠত দাবা খেলায়। দুজনেরই প্রায় একই কথা, ‘দাবা খেললে আমাদের মন ভালো থাকে। তাই আমরা অবসর সময়টা কাটাই দাবার বোর্ড আর সাদাকালো ঘুঁটির সঙ্গে।’

বিভাগীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়া জাওয়াদ, আইমানদের স্বপ্নটা আরও বড়—সারা দেশের ৬৪টি জেলার স্কুলের মধ্যে সেরা হওয়া। ঢাকায় জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে নিজ স্কুলকে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিতে চান ‘লালনের দেশে’র খুদে দাবাড়ুরা। সে লক্ষ্যেই চলছে তাদের কঠোর অনুশীলন। চলছে স্বপ্নটা সত্যি করার চেষ্টা।