ন্যায়বিচারের অসমাপ্ত পথ

পুলিশের গুলিতে স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রী ফারহানা ইসলামের কান্না। ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গ, ১৯ জুলাই ২০২৪ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

জুলাইয়ের ন্যায়বিচার মানে শুধু মামলা পরিচালনা নয়। এর জন্য দরকার কার্যকর তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার আর—সবচেয়ে বেশি—দায়ীদের জবাবদিহি; পাশাপাশি দরকার ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ, সত্যনিষ্ঠ প্রকাশ্য স্বীকৃতি, ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণ এবং ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থবহ সংস্কার

জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে আজ কঠিন কিন্তু জরুরি প্রশ্নটি হলো: ন্যায়বিচারের জন্য আসলে কী প্রয়োজন? গুরুতর অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার মানুষ, বেঁচে ফেরা ব্যক্তি এবং তাঁদের পরিবারসহ ক্ষতিগ্রস্ত সবারই এ প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার।

২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে একটি গোটা প্রজন্ম এমন নৃশংসতার সাক্ষী হয়েছিল, যা শুধু মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির সঙ্গেই তুলনীয়। ওই অভ্যুত্থান আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতা আমূল বদলে দেয়। শত শত মানুষ প্রাণ হারান, হাজারো আহত হন—অনেকেই দৃষ্টিশক্তি হারান বা স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। শিশুসহ অসংখ্য মানুষ নির্বিচার গ্রেপ্তার ও বন্দী হন। ৪ ও ৫ আগস্ট এই সহিংসতা চরম আকার ধারণ করে।

সেই দিনগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসকে মৌলিকভাবে বদলে দেওয়ার পাশাপাশি একটি প্রত্যাশার জন্ম দিয়েছিল যে শেষ পর্যন্ত দোষীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। দুই বছর পর সেই প্রতিশ্রুতি আংশিক পূরণ হলেও তা এখনো ভুক্তভোগীদের প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।

সেই দিনগুলোর একটি অভিজ্ঞতা থেকেই আমরা বুঝতে পারি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কত গভীরভাবে সংকটে জড়িয়ে পড়েছিল। ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে আটকে রাখার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচার গুলি বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে করা জনস্বার্থ রিট হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ সাহস করে শুনানি করার পর খারিজ করে দেয়। ভীতিকর পরিবেশে শুনানি চলছিল। তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল কয়েকজন সাবেক মন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। আর অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের আইনজীবীরা আদালতকক্ষে ভিড় করে ডেস্ক চাপড়ে ‘রিজেক্ট! রিজেক্ট!’ বলে চিৎকার করছিলেন।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী সারা হোসেন

একপর্যায়ে সরকার–সমর্থক এক আইনজীবী রিটকারীদের আইনজীবীদের সমালোচনা করে বলেন, তাঁরা নাকি একটি ‘পাকিস্তানি রায়’–এর ওপর নির্ভর করছেন। কথাটি অবশ্য সত্য ছিল। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে আদালতের ভূমিকা নিয়ে স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী এক মামলায় বিচারপতি মুর্শেদের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ আমরা উদ্ধৃত করেছিলাম। কিন্তু তাঁদের আপত্তিটি কোনো আইনি নীতির প্রশ্নে ছিল না; বরং আন্দোলনকারী ও তাঁদের আইনি সুরক্ষায় এগিয়ে আসা আইনজীবীদের ‘সন্ত্রাসী’, ‘দেশবিরোধী’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ হিসেবে চিত্রিত করার বৃহত্তর প্রচেষ্টারই অংশ ছিল।

আদালতকক্ষের সেই দৃশ্য হতাশাজনক হলেও বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না। বছরের পর বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকার শান্তিপূর্ণভাবে ভিন্নমত প্রকাশ, রাজনৈতিক বিরোধিতা এবং রাষ্ট্রের প্রতি হুমকির পার্থক্য অস্পষ্ট করে দিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্মৃতিকে সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছিল; গণমাধ্যমের একাংশ, পেশাজীবী সংগঠন ও নাগরিক সমাজের মাধ্যমে সেই বয়ান আরও দৃঢ় হয়। আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর সময়ও টেলিভিশনের আলোচনায় বলা হচ্ছিল, বিক্ষোভগুলো ন্যায়বিচারের দাবি নয়, রাষ্ট্র ধ্বংসের ষড়যন্ত্র।

জুলাইয়ের ন্যায়বিচার মানে শুধু মামলা পরিচালনা নয়। এর জন্য দরকার কার্যকর তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার আর—সবচেয়ে বেশি—দায়ীদের জবাবদিহি; পাশাপাশি দরকার ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ, সত্যনিষ্ঠ প্রকাশ্য স্বীকৃতি, ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণ এবং ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থবহ সংস্কার।

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার তাগিদেই এমন সহিংসতা কীভাবে ঘটতে পারল, তার একটি নির্মোহ পর্যালোচনার জন্য এসব কথা মনে রাখা প্রয়োজন। এটি কেবল কয়েকজন ব্যক্তির সিদ্ধান্তের ফল নয়; বরং সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ধীরে ধীরে ভেঙে পড়া এবং নিপীড়নকে বৈধতা দেওয়া বয়ানের স্বাভাবিকীকরণের ফল।

আজ তাই প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি সেই প্রক্রিয়াটি সত্যিই উল্টে দেওয়ার পথে হাঁটছে?

নিঃসন্দেহে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হাজার হাজার মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে। সহিংসতার গুরুতর অভিযোগগুলোর বিচার শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। যদিও ট্রাইব্যুনালের ন্যায্যতা ও সততা নিয়ে সমালোচনাও কেউ কেউ তুলছেন। অবশ্য সমালোচকদের মধ্যে এমন অনেকে রয়েছেন, যাঁরা আগে আওয়ামী লীগ আমলে একই ধরনের সমালোচনাকে অগ্রাহ্য করেছিলেন।

কিছু আইনগত সংস্কারও তাৎপর্যপূর্ণ। গুরুতর অপরাধের শিকার ভুক্তভোগী ও অভিযুক্ত—উভয়ের সুরক্ষা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নারী নির্যাতন দমন আইনে ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা এবং ২০২৬ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধনীতে গ্রেপ্তার, আটক, নির্যাতন প্রতিরোধ ও সুষ্ঠু বিচারের মানদণ্ড শক্তিশালী করার ব্যবস্থা রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির ১২ ঘণ্টার মধ্যে আইনজীবীর সঙ্গে সাক্ষাতের অধিকার গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, যদিও বাস্তবে এখনো কার্যকর হয়নি। নির্মম সত্য হলো অধিকাংশ ভুক্তভোগীর কাছে ন্যায়বিচার এখনো অধরা।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কয়েকটি রায় বাদে জুলাইয়ের অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের করা মামলাগুলোয় সাধারণ ফৌজদারি আদালত কোনো রায় দিতে পারেনি। বেআইনি গুলিবর্ষণ ও নির্বিচার আটকের শিকার হয়ে বেঁচে ফেরা মানুষগুলো শুধু শাস্তি নয়, আসলে কী ঘটেছিল এবং দায়ী ব্যক্তিরা কখনো বিচারের মুখোমুখি হবে কি না—এই মৌলিক প্রশ্নের উত্তরও খুঁজছেন।

সবচেয়ে বেশি দায়বদ্ধতার অভিযোগ যাঁদের বিরুদ্ধে—শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা, নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং সহিংসতা পরিচালনা বা সহায়তার অভিযুক্তরা—তাঁদের অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। ভারত, কানাডা, যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত অনেকে জুলাই-আগস্টের নৃশংসতা অস্বীকার করে নিজেদেরই ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বক্তৃতা ও বিবৃতিতে তাঁদের কেউ কেউ বিষাক্ত প্রচারণা চালিয়ে সেই রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও বিচারিক হয়রানির পদ্ধতিগত চিত্রও অস্বীকার করছেন, যার ফলে এসব নির্যাতন সম্ভব হয়েছিল। ভুক্তভোগীরা তাই আজও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়।

নির্বিচার গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মামলা প্রত্যাহার করা হলেও যাঁরা বেআইনি গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছিলেন, আইনজীবী ও পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে দেননি, শিশুসহ বন্দীদের নির্যাতন করেছিলেন অথবা নিয়মিত জামিন নামঞ্জুর করেছিলেন, তাঁদের খুব কমই জবাবদিহি করতে হয়েছে। এসব অপব্যবহারের জন্য দায়ী পুলিশ বা ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তাতে স্বচ্ছতার চরম অভাব ছিল।

সবচেয়ে বেশি দায়বদ্ধতার অভিযোগ যাঁদের বিরুদ্ধে—শীর্ষ রাজনৈতিক নেতা, নিরাপত্তা কর্মকর্তা এবং সহিংসতা পরিচালনা বা সহায়তার অভিযুক্তরা—তাঁদের অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন।

একই সময়ে উদ্বেগ বাড়ছে যে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার কিছু অংশ এখনো পুরোনো পদ্ধতিতে চলছে। তদন্তের ধীরগতিকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে অভ্যুত্থানের পরে গ্রেপ্তার হওয়া অনেককে জামিন দেওয়া হচ্ছে না; সহিংস অপরাধের অভিযোগ থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তদন্ত চলমান; প্রমাণ আজও উপস্থাপন করা হয়নি। আইনজীবীরা জামিন শুনানি ও আদেশ কার্যকরে দীর্ঘসূত্রতার কথা জানিয়েছেন। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো ‘শোন অ্যারেস্ট’ বা অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর প্রথা। এর সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্ন হাইকোর্টে এখন শুনানির অপেক্ষায়।

রাজনৈতিক পরিচয়–নির্বিশেষে এসব বিষয়ে সবারই উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। রাজনৈতিক মামলা, নিবর্তনমূলক আটক এবং আইনের অসম প্রয়োগ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে বহুদিন ধরেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নতুন রাজনৈতিক সময়েও যদি একই চর্চা চলতে থাকে, তবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ঐতিহাসিক সুযোগ নষ্ট হবে। ফৌজদারি দায়, প্রাতিষ্ঠানিক যোগসাজশ এবং নৈতিক ব্যর্থতার পার্থক্য স্পষ্ট করাও জরুরি।

বেআইনি হত্যা বা গুরুতর অপরাধের নির্দেশদাতা ও বাস্তবায়নকারীদের অবশ্যই বিচার হওয়া উচিত। তবে আরও অনেকে আছেন, যাঁদের দায় অন্য ধরনের। কেউ প্রকাশ্য বক্তব্য বা গণমাধ্যমের ভাষ্যে নিপীড়নকে বৈধতা দিয়েছেন, কেউ গুমের মতো অপরাধ অস্বীকার করেছেন, কেউ প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ভিন্নমতের সহকর্মীদের কোণঠাসা করেছেন। অনেকেই আবার ‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা’ বা ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে’ মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন উপেক্ষা করেছিলেন।

নতুন রাজনৈতিক সময়েও যদি একই চর্চা চলতে থাকে, তবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ঐতিহাসিক সুযোগ নষ্ট হবে। ফৌজদারি দায়, প্রাতিষ্ঠানিক যোগসাজশ এবং নৈতিক ব্যর্থতার পার্থক্য স্পষ্ট করাও জরুরি।

এই ব্যর্থতাগুলোর প্রকাশ্যে চুলচেরা বিশ্লেষণ হওয়া প্রয়োজন। এসবের স্বীকৃতি, সমালোচনা এবং ক্ষেত্রবিশেষে পেশাগত শাস্তিও বাঞ্ছনীয়। তবে এসব কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই হত্যা বা হত্যার প্ররোচনার সমতুল্য হয়ে যায় না। ফৌজদারি দায়বদ্ধতা অবশ্যই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বা ঢালাও দোষারোপের পরিবর্তে অপরাধমূলক আচরণের উপযুক্ত প্রমাণের ওপর ভিত্তি করেই হতে হবে।

বাংলাদেশ এর আগেও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার চক্র দেখেছে। আওয়ামী লীগ সরকার নিয়মিতভাবেই বিরোধীদের ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ বা ‘রাজাকার’ আখ্যা দিত। আজ বিপরীত দিক থেকেও ঢালাও তকমা লাগানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের নৃশংসতা নিয়ে জনক্ষোভ স্বাভাবিক; কিন্তু সেই ক্ষোভ যদি নির্বিচার মামলা বা যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া দীর্ঘ আটকাদেশে পরিণত হয়, তবে দেশটি সেই অবিচারেরই পুনরাবৃত্তি করবে, যা থেকে মুক্তির জন্য এত সংগ্রাম হলো। এ কারণেই বাংলাদেশের উচিত ক্রান্তিকালীন ন্যায়বিচারের নীতিগুলোর সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়া।

স্বৈরতান্ত্রিক শাসন থেকে বেরিয়ে আসা দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলে, ফৌজদারি বিচার জরুরি হলেও জবাবদিহির একমাত্র উপায় নয়। ক্রান্তিকালীন ন্যায়বিচার মানে সত্য প্রকাশ, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ, স্মৃতি সংরক্ষণ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ ও অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি রোধের নিশ্চয়তা। সমাজ শুধু অপরাধীর শাস্তিতে সুস্থ হয় না; ভুক্তভোগীর স্বীকৃতি, অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি হওয়া এবং অধিকার রক্ষায় সক্ষম প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মাধ্যমেও ঘুরে দাঁড়ায়।

জুলাইয়ের ন্যায়বিচার মানে শুধু মামলা পরিচালনা নয়। এর জন্য দরকার কার্যকর তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার আর—সবচেয়ে বেশি—দায়ীদের জবাবদিহি; পাশাপাশি দরকার ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ, সত্যনিষ্ঠ প্রকাশ্য স্বীকৃতি, ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণ এবং ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থবহ সংস্কার।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়েছে। আইনি সংস্কারের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং নির্বিচার গ্রেপ্তার-আটকের বিরুদ্ধে সুরক্ষাকবচ জোরদার হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার প্রস্তাবও বিবেচনায় আছে। এসব উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে।

তবে শুধু আইন দিয়ে বিচারব্যবস্থা পাল্টানো যায় না। বড় চ্যালেঞ্জটি সাংস্কৃতিক: দায়মুক্তি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং ক্ষমতাসীনদের প্রতি প্রাতিষ্ঠানিক আনুগত্যের অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসা। একই সঙ্গে দরকার আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি—যেখানে প্রতিটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন শুধু ভুক্তভোগী হওয়ার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ না থেকে বিশ্লেষণ করবে, কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বারবার নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়।

তাই জুলাইয়ের ন্যায়বিচার মানে শুধু মামলা পরিচালনা নয়। এর জন্য দরকার কার্যকর তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার আর—সবচেয়ে বেশি—দায়ীদের জবাবদিহি; পাশাপাশি দরকার ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ, সত্যনিষ্ঠ প্রকাশ্য স্বীকৃতি, ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণ এবং ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থবহ সংস্কার। বাংলাদেশের বাইরে অবস্থানরত গুরুতর অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারীদের এবং দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে জবাবদিহির মুখোমুখি করতে এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন ও শক্তিশালী অধিকারভিত্তিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সারা দেশে যে স্বস্তির অনুভূতি হয়েছিল, তা শুধু একটি সরকারের পতনের প্রতিক্রিয়া ছিল না। এটি সেই আশার প্রতিফলন ছিল যে বাংলাদেশ অবশেষে এমন সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারবে, যা ভয়ভীতির পরিবর্তে আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে; দায়মুক্তির বদলে সেখানে থাকবে জবাবদিহি, প্রতিশোধের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হবে ন্যায়বিচার।

আজ দুই বছর পরও সেই আকাঙ্ক্ষা অপূর্ণ রয়ে গেছে। জুলাই অভ্যুত্থান সত্যিকারের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের মাইলফলক হবে কি না, তা শুধু কতজন অপরাধী বিচারের মুখোমুখি হলো তার ওপর নির্ভর করবে না। বরং নির্ভর করবে বাংলাদেশ প্রতিশোধের চক্র ভেঙে, ২০২৪ সালের আত্মত্যাগের মর্যাদা রেখে, অধিকারনিষ্ঠ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারল কি না তার ওপর।

* সারা হোসেন: জ্যেষ্ঠ আইনজীবী; মানবাধিকারকর্মী