আশা ও আশঙ্কার দোলাচল

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কপ্রবাসী ভাষাবিদ ও ভাষাশিক্ষক আহমেদ শামীম
প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন

গত দুই দশকে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গণতন্ত্রের এমন অবনতি ঘটেছে যে রাষ্ট্রগুলো ‘হাইব্রিড রেজিম’, ‘ডেভেলপমেন্টাল ডিক্টেটরশিপ, ‘ইলেকটোরাল অটোক্রেসি’ ইত্যাদি তকমা পেয়েছে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ভিন্ন কিছু নয়। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন যেভাবে ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রূপ নিয়েছে এবং সরকার পতনে ভূমিকা পালন করেছে, তাতে নিঃসন্দেহে বলা যায় এই অভ্যুত্থানের সামাজিক ও রাজনৈতিক শর্ত হাজির ছিল।

এই অভ্যুত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা সব সময় প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয় না। কখনো কখনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অনাস্থা নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্ম দেয়। সেই নতুন শক্তির উত্থানে উৎসাহিত গণ-অভ্যুত্থান নতুন রাজনীতির সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়। কিন্তু সেই সম্ভাবনার বাস্তবায়ন বহু দেশে সম্ভব হয়নি, বাংলাদেশও তেমন একটি ঝুঁকির মধ্য দিয়ে পার হচ্ছে। কেননা গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক রাজনীতি গড়ে তোলা এক বিষয় নয়। আন্দোলনের সময় অভিন্ন দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া সম্ভব হলেও রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনৈতিক নীতি, ধর্মনিরপেক্ষতা, বহুত্ববাদ, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্নে সেই ঐক্য ধরে রাখা অনেক কঠিন। বাংলাদেশে সেই ঐক্য ভেঙে গেছে বলা যায়। দুটি বিরোধী জোটের রাজনীতি আবার ফিরে আসার উপক্রম হয়েছে।

রাজনৈতিক সমঝোতা বা জোট গঠন গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ। তাই আপস নতুন রাজনীতির ব্যর্থতা প্রমাণ করে না। তবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সেই আপসের নৈতিক ভিত্তি কী, সিদ্ধান্ত গ্রহণ কতটা স্বচ্ছ এবং নেতৃত্ব নিজের ঘোষিত আদর্শের বিষয়ে কতটা জবাবদিহি করে। সেই বাবদে এনসিপির জামায়াতের সঙ্গে জোট গঠন কিংবা গণ অধিকার পরিষদ ও গণসংহতির নেতাদের বিএনপি সরকারে অংশগ্রহণ—সবই বিচার্য হবে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৈষম্যহীন ও সর্বজনীন করতে তারা কী ভূমিকা রাখল, তার পরিপ্রেক্ষিতে। যেসব রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি নতুন রাজনীতির পোস্টার বহনকারী, তারা পুরোনো রাজনীতির খাট বহনকারী দুটি বড় দলের পাখার তলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। তা ছাড়া অভ্যুত্থান-পরবর্তী অভিজ্ঞতা একটি মৌলিক প্রশ্ন এবং কিছু আশঙ্কাও সামনে এনেছে: নতুন রাজনীতি বলতে কি কেবল নতুন নেতৃত্ব বোঝায়, নাকি নতুন রাজনৈতিক মূল্যবোধ, সাংগঠনিক সংস্কৃতি ও ক্ষমতাচর্চার পদ্ধতিও বোঝায়? নতুন নেতৃত্ব যদি পুরোনো রাজনৈতিক কৌশল, সুবিধাবাদী জোট, ব্যক্তিকেন্দ্রিক আনুগত্য ও ক্ষমতা অর্জনের প্রচলিত প্রতিযোগিতায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখে, তাহলে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ঘটবে না।

যেসব রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি নতুন রাজনীতির পোস্টার বহনকারী, তারা পুরোনো রাজনীতির খাট বহনকারী দুটি বড় দলের পাখার তলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
তরুণদের মধ্যে শ্রেণি, লিঙ্গ, অঞ্চল, ধর্মীয় পরিচয়, শিক্ষাগত সুযোগ ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে
ছবি: দীপু মালাকার

জুলাই অভ্যুত্থানে তরুণদের পরিবর্তন ঘটানোর ক্ষমতা দৃশ্যমান হয়েছে। সেই ক্ষমতা একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণ করতে পারবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। মনে রাখা উচিত, তারুণ্য কোনো রাজনৈতিক আদর্শ নয়। এক তরুণ কর্তৃত্ববাদী হতে পারে, অন্যজন হতে পারে গণতন্ত্রী; কেউ ধর্মীয় কিংবা নৃগোষ্ঠীগত জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী হতে পারে, কেউ ধর্মনিরপেক্ষতায়; কেউ হতে পারে অর্থনৈতিক সমতার পক্ষে, কেউ বাজারকেন্দ্রিক নীতির সমর্থক। তরুণদের মধ্যে শ্রেণি, লিঙ্গ, অঞ্চল, ধর্মীয় পরিচয়, শিক্ষাগত সুযোগ ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। নতুন রাজনীতির সম্ভাবনা বিচার করতে হবে এসব ভিন্নতার মধ্যে গণতান্ত্রিক সহাবস্থান তৈরির সক্ষমতা দিয়ে।

এ দেশের রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণ নতুন ঘটনা নয়। বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাঁদের মধ্য থেকে যাঁরা পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে এসেছেন, তাঁরা বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোগুলোতে যোগ দিয়েছেন। এর ফলে সেই দলগুলোর কী ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে এবং দীর্ঘ মেয়াদে সেসব পরিবর্তন জনকল্যাণের পক্ষে কতটুক কাজে এসেছে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। বেশির ভাগ তরুণ নেতাই পরে দলের স্বার্থের কাছে বলি হয়েছেন, গোষ্ঠীস্বার্থের বাহক হয়েছেন। বর্তমান তরুণ নেতাদের ক্ষেত্রে বিপরীত ফল হবে, এমন প্রত্যাশার ঐতিহাসিক ভিত্তি দুর্বল।

বর্তমানের তরুণ নেতৃত্বকে মাথায় রাখতে হবে যে গণ-অভ্যুত্থান কয়েক বছর পরপর ঘটার বিষয় নয়। তাই পরিবর্তন সাধন করতে হবে গণতান্ত্রিক উপায়েই। সজাগ থাকতে হবে, যাতে এখানেই পথ আবার পিচ্ছিল ও সংকীর্ণ হয়ে না যায়

তাই আবারও নির্ভর করতে হচ্ছে তরুণ প্রজন্মের সেই অংশের ওপর, যারা কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থ বাস্তবায়নকারী কর্মী নয়, বরং জনস্বার্থের পক্ষে সংগ্রামরত শক্তি। নির্ভর করতে হচ্ছে সেই ছাত্র-জনতার সংহতির ওপর, যারা চব্বিশের অভ্যুত্থানকে সফল করেছিল। কিন্তু এ রকম সংহতি সব সময় থাকে না, তা সৃষ্টি হয় অভ্যুত্থানের প্রাক্কালে।

২০২৫ সালে সানেম ও একশনএইড বাংলাদেশ পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, এ দেশের ৮৩ শতাংশ তরুণ-তরুণী রাজনীতিবিমুখ। বর্তমান প্রজন্মের বৈশিষ্ট্যের বিশেষত্ব তৈরি হয়েছে দুটি প্রভাব বিস্তারকারী পরিবেশে: একদিকে তারা ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার মধ্যে বেড়ে উঠেছে, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থার সংকট প্রত্যক্ষ করেছে। তাদের সামনে বৈশ্বিক তথ্যপ্রবাহের সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনই অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক মেরুকরণের চ্যালেঞ্জও রয়েছে। নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক আচরণের বড় বৈশিষ্ট্য হলো ডিজিটাল পরিসরে তাদের সক্রিয়তা। এর ফলে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রবেশদ্বার কিছুটা প্রসারিত হয়েছে। যেমন কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য না হয়েও একজন তরুণ বা তরুণী জনমত গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ডিজিটাল সক্রিয়তাকে নতুন রাজনীতির সমার্থক মনে করা ভুল হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন প্রতিবাদের নতুন সুযোগ নিয়ে আসে; তেমনই গুজব, অপতথ্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও মতাদর্শিক মেরুকরণের ক্ষেত্র তৈরি করে। অনলাইনে জনপ্রিয়তা সব সময় সাংগঠনিক দক্ষতা বা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিচায়ক নয়। বেশির ভাগ সময় তা মব তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়।

এই চক্র থেকে বের হওয়া প্রয়োজন। বন্যা পলি বয়ে এনে জমি উর্বর করে বটে, কিন্তু ভূমির মালিকানার সংস্কার না হলে, বাজারব্যবস্থার সংস্কার না হলে কৃষকের জন্য হতাশাই অপেক্ষা করে।
তরুণদের ক্ষমতা একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি নির্মাণ করতে পারবে কি? ডাকসু নির্বাচনে তরুণ শিক্ষার্থীরা
ছবি: সাজিদ হোসেন

তাই বলে সবই বিফলে যাওয়ার নয়। বর্তমানের তরুণ নেতৃত্বকে মাথায় রাখতে হবে যে গণ-অভ্যুত্থান কয়েক বছর পরপর ঘটার বিষয় নয়। তাই পরিবর্তন সাধন করতে হবে গণতান্ত্রিক উপায়েই। সজাগ থাকতে হবে, যাতে এখানেই পথ আবার পিচ্ছিল ও সংকীর্ণ হয়ে না যায়। পুরোনো রাজনীতির দলবাজি, ঠিকাদারি, সিন্ডিকেটবাজি, তথাকথিত বিদেশি উন্নয়ন-অংশীদারদের সঙ্গে দর-কষাকষিতে অদক্ষতা, যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকার লোভ এসে নতুন রাজনীতিকে গিলে খায়।

মনে রাখতে হবে, কেন গণ-অভ্যুত্থান ঘটেছিল। মনে রাখতে হবে, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের দাবি রাজনৈতিক দাবি। অভ্যুত্থানের পরও বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ বেকারত্ব, দক্ষতার সঙ্গে কর্মসংস্থানের অসামঞ্জস্য, জীবনযাত্রার ব্যয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। এসব সমস্যা ব্যক্তিগত জীবনে অনুভূত হলেও এগুলোর সমাধান অনেকাংশে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। অতএব যে তরুণ বা তরুণী চাকরির নিশ্চয়তা চায়, নিয়োগে স্বচ্ছতা দাবি করে, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রত্যাশা করে, সে আসলে রাজনৈতিক দাবিই উত্থাপন করে। তার প্রত্যাশার কেন্দ্রে রয়েছে রাষ্ট্র ও সমাজের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক পুনর্নির্ধারণের আকাঙ্ক্ষা।

সেই প্রত্যাশা ঘন ঘন অভ্যুত্থানের জন্ম দেবে না; বরং বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থায়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সেই প্রত্যাশা বারবার পদদলিত হবে। কার্যকর অর্থে নতুন রাজনীতি হবে সেই রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো এবং জনকল্যাণমূলক করা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন প্রতিবাদের নতুন সুযোগ নিয়ে আসে; তেমনই গুজব, অপতথ্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও মতাদর্শিক মেরুকরণের ক্ষেত্র তৈরি করে।

বাংলাদেশকে টেকসই জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র করে তোলার কোনো লক্ষ্যমুখী পরিকল্পনা কি আমরা দেখতে পাচ্ছি? রাষ্ট্রকে দলীয় সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার প্রথায় কি কোনো পরিবর্তন এসেছে, যা সরকারকে স্বেচ্ছাচারী হতে বাধা দেবে? নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত না হলে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার জন্য লেজুড়বৃত্তি কীভাবে দূর করা যাবে? বিদ্যমান প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় চাকরিপ্রার্থী, উদ্যোক্তা, কৃষিপণ্য উৎপাদক—কারও জন্য কোনো ইতিবাচক ভবিষ্যতের দিশা নেই। এই ব্যবস্থায় কিছু লোকের সাফল্য প্রচার করে ঢেকে দেওয়া হয় সমাজের বড় অংশের মানবেতর জীবন; তাদের ফেলে দেওয়া হয় খরচের খাতায়। এই ব্যবস্থা পাল্টানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসে গণ-অভ্যুত্থান।

এই চক্র থেকে বের হওয়া প্রয়োজন। বন্যা পলি বয়ে এনে জমি উর্বর করে বটে, কিন্তু ভূমির মালিকানার সংস্কার না হলে, বাজারব্যবস্থার সংস্কার না হলে কৃষকের জন্য হতাশাই অপেক্ষা করে। l