জবি উপাচার্যের পদত্যাগ চায় ইউট্যাব, পুরো প্রশাসনের চায় ছাত্রদল-ছাত্রশক্তি

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ছবি: প্রথম আলো

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) ভিন্ন ভিন্ন অভিযোগে উপাচার্য ও প্রশাসনের পদত্যাগের জোরালো দাবি উঠেছে। উপাচার্য অধ্যাপক রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে ব্যর্থতা ও বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যের অভিযোগ তুলে তাঁর পদত্যাগ চেয়েছে বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব)। অন্যদিকে সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারীদের বিচার ও শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণে চরম ব্যর্থতার অভিযোগ এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো প্রশাসনের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে ছাত্রদল ও জাতীয় ছাত্রশক্তি।

রোববার ইউট্যাব জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে উপাচার্যের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করে তাঁর পদত্যাগের এই দাবি জানানো হয়।

বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব উপাচার্যকে কেন্দ্র করে অনেক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হলেও তার কিছুই তিনি বাস্তবায়ন করতে পারেননি। এর কারণ হিসেবে আমরা জানতে পেরেছি যে তিনি বিশেষ একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের কাছে কতিপয় বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে উক্ত পদে নিয়োগ পেয়েছেন। এমনকি তিনি নিজেও একাধিকবার স্বীকার করেছেন যে তাঁর নিয়োগ কর্তৃপক্ষ হলো জামায়াত-শিবির। ফলে তিনি নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের পরিবর্তে উক্ত বিশেষ দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আন্দোলনের মাধ্যমে ৫৬ কোটি টাকার আবাসন বৃত্তি, বেদখল হওয়া হল উদ্ধার এবং কেরানীগঞ্জে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস দ্রুত বাস্তবায়নসহ সরকারের কাছ থেকে নানা প্রতিশ্রুতি আদায় করা হয়। কিন্তু আন্দোলনের এসব অর্জন বাস্তবায়নে বর্তমান উপাচার্য সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছেন।

বিবৃতিতে উপাচার্যের বিরুদ্ধে নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে সাংবাদিকদের ব্যবহারের অভিযোগ তুলে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে কাজ না করে তিনি নিজের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে সাংবাদিকদের ব্যবহার করছেন। ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনি পরিকল্পিতভাবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির ১৮ বছর ধরে চর্চিত গঠনতন্ত্র থেকে উপদেষ্টার পদ থেকে শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে বাদ দিয়েছেন এবং সমিতির ওপর একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন।

এ অবস্থায় সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে নবগঠিত সরকারকে সমালোচিত করার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি হওয়ার আগেই উপাচার্যকে সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছে ইউট্যাব। অন্যথায় ইউট্যাবের কার্যকরী পরিষদের প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত সবাই তাঁকে সর্বাত্মক অসহযোগিতা করবেন বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

পুরো প্রশাসনের পদত্যাগ চায় ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তি

এদিকে সাংবাদিকদের ওপর ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা–কর্মীদের নেতৃত্বে হামলার বিচার না করা এবং শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় পুরো প্রশাসনের পদত্যাগের দাবিতে রোববার বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে জবি শাখা ছাত্রদল ও ছাত্রশক্তি।

দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাত্তরের গণহত্যা ভাস্কর্য (বিজ্ঞান অনুষদের মাঠ) চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়ে প্রশাসনিক ভবনের সামনে এসে সমবেত হয়। এ সময় তাঁরা প্রশাসনকে উদ্দেশ করে ‘প্রশাসন লালে লাল, জামায়াতের দালাল’, ‘অথর্ব প্রশাসন দলকানা প্রশাসন, মানি না মানব না’, ‘সাংবাদিকদের ওপর হামলা কেন? প্রশাসন জবাব দে’, ‘এক দফা এক দাবি, ভিসি তুই কবে যাবি’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।

সমাবেশে জবি শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে তাঁরা কোনো সাংবাদিক সংগঠনের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করেননি। তবে জামায়াত ও শিবিরের নেতা-কর্মীরা গোপন তৎপরতার মাধ্যমে পাতানো নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সাংবাদিক সমিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন।

মেহেদী হাসান অভিযোগ করেন, জামায়াত-শিবিরের প্রেসক্রিপশনে বর্তমান উপাচার্য সাংবাদিক সমিতির জন্য নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করে শিক্ষক সমিতির সভাপতিকে উপদেষ্টা পরিষদ থেকে বাদ দিয়েছেন। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের আবাসন ভাতার দাবিতে যমুনার সামনে তিন দিন আন্দোলনের পর বিশেষ বৃত্তির ঘোষণার পর এক বছর পেরিয়ে গেলেও প্রশাসন তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। দ্রুত এই বৃত্তি প্রদান না করলে প্রশাসনকে পদত্যাগ করতে হবে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।

ছাত্রদলের সদস্যসচিব শামসুল আরেফিন বলেন, ‘সাংবাদিকদের ওপর জামায়াত-শিবিরের ন্যক্কারজনক হামলার নিন্দা জানাই। এই হামলার পেছনে জামায়াতপন্থী উপাচার্যের দায় রয়েছে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত কমিটি হয়নি। বৃত্তি না দিতে পারা এবং এই হামলার দায় নিয়ে প্রশাসনকে পদত্যাগ করতে হবে।’

জবি শাখা ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক ফয়সাল মুরাদ বলেন, ‘প্রশাসন আমাদের দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা যখন অনশন করেছিলাম, তখন প্রশাসন আমাদের কথা দিয়েছিল যে জানুয়ারিতে সম্পূরক বৃত্তি দিতে না পারলে তারা পদত্যাগ করবে। শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণে ব্যর্থতা এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে আমরা জবি উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করছি।’

ছাত্রশক্তির মুখপাত্র ফেরদৌস শেখ বলেন, ‘আমরা প্রশাসনের পদত্যাগের দাবি আজ নতুন করে করিনি, অনেক আগে থেকেই এই দাবি করে আসছি। প্রশাসন আমাদের সম্পূরক বৃত্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছে এবং দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। এই প্রশাসন একটি ব্যর্থ প্রশাসন। আমরা অনতিবিলম্বে তাদের পদত্যাগের দাবি জানাচ্ছি।’

এ সময় জাতীয় ছাত্রশক্তির জবি শাখার বিভিন্ন নেতা-কর্মী এবং ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাফর আহমেদ, সুমন সরদার, মো. মোস্তাফিজুর রহমান রুমি, মো. শাহরিয়ার হোসেন, মাহমুদুল হাসান, রবিউল আউয়াল, নাহিয়ান বিন অনিক, শাখাওয়াত হোসেন পরাগ, মিয়া রাসেলসহ ছাত্রদলের শতাধিক নেতা-কর্মী উপস্থিত ছিলেন।