‘কাকে বলবেন দোর খোল, কে চোখ খুলবে’

শিশুদের প্রতীকী মরদেহ নিয়ে এই বিশেষ প্রতিবাদী আয়োজন করেছিল নাট্যসংগঠন প্রাচ্যনাট। ২৩ মেছবি: প্রথম আলো

কালো পোশাকের একদল নারী-পুরুষ ধীর পায়ে এগিয়ে চলেছেন। তাঁদের মুখে গভীর বিষাদের ছায়া। দুই হাতে সাদা কাফনে মোড়ানো ছোট ছোট শিশুর মরদেহ আঁকড়ে ধরে আছেন বুকের সঙ্গে। তাঁদের এই বুকের ধন এখন নিথর, নিস্তব্ধ। ফুল হয়ে ফুটে ওঠার আগে কুঁড়িতেই ঝরে গেছে বড্ড অসময়ে। সন্তান হারানো অনির্বচনীয় শোকে তাঁরা মুহ্যমান। তাঁদের সামনে থেকে তাঁদেরই সহযাত্রীদের কেউ কেউ প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছেন জনতার প্রতি—‘কাকে বলবেন ভোর হলো?’, ‘কাকে বলবেন দোর খোল?, ‘কে চোখ খুলবে?, ‘কে জাগাবে?’ যে জাগবে, জাগাবে সে তো নেই।

আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর কাঁটাবন মোড়ের ‘কনকর্ড এম্পোরিয়াম শপিং কমপ্লেক্স’–এর সামনে শিশুদের প্রতীকী মরদেহ নিয়ে এই বিশেষ প্রতিবাদী আয়োজন করেছিল নাট্যসংগঠন প্রাচ্যনাট। ‘শিশুমর্গ’ নামের এই চলমান পরিবেশনা (পারফরম্যান্স ) করা হয়েছিল হামে আক্রান্ত হয়ে বিপুলসংখ্যক শিশুমৃত্যুর ঘটনায়। চলতি বছরের মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে হঠাৎ করেই দেশে হামের দেখা দেয়। ক্রমেই তা প্রাদুর্ভাবে রূপ নেয়। হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত হতে থাকে। পরিণতি হয় ভয়ংকর। অকালমৃত্যু ঘটে পাঁচ শতাধিক শিশুর (শনিবার সর্বশেষ মৃতের সংখ্যা ৫২১)।

প্রাচ্যনাট মনে করে শিশুদের এই মৃত্যু ঘটেছে চিকিৎসাব্যবস্থায় নিদারুণ অবহেলায়। নাট্যকর্মীরা এই ‘ইচ্ছাকৃত’ অবহেলায় জড়িতদের কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন। প্রাচ্যনাটের প্রধান আজাদ আবুল কালাম প্রথম আলোকে বলেন, সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে তাঁরা এই বিপুল শিশুমৃত্যুর ঘটনার প্রতিবাদ ও চিকিৎসা অবহেলার বিচার দাবি করে প্রতীকী ‘শিশুমর্গ’ নিয়ে পথে নেমেছেন। প্রাচ্যনাট বরাবরই সামাজিক সংকটে প্রতিবাদ প্রতিরোধে সোচ্চার হয়েছে।

নাট্যকর্মীরা ফুটিয়ে তুলেছেন সেই সব সন্তানহারা বাবা-মায়ের বুকভাঙা বেদনা
ছবি: প্রথম আলো

চলমান এই পরিবেশনায় প্রাচ্যনাটের কর্মীদের মধ্যে একদল ছিলেন শিশুদের প্রতীকী মৃতদেহ কোলে নিয়ে। যেমন দৃশ্য প্রায়ই খবরের কাগজে বা টিভি পর্দায় দেখা যাচ্ছে—বাবা-মায়েরা তাঁদের প্রাণপ্রিয় সন্তানের মরদেহ কাপড়ে ঢেকে নিয়ে বের হয়ে যাচ্ছেন হাসপাতাল থেকে। তেমনি করে নাট্যকর্মীরা ফুটিয়ে তুলেছেন সেই সব সন্তানহারা বাবা-মায়ের বুকভাঙা বেদনা। আরেক দল নাট্যকর্মী চারপাশের পথিক, উৎসুক জনতাকে প্রশ্ন করেছেন ‘কে ফিরিয়ে দেবে এই সব তাজা প্রাণ? ‘কে বলবে আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?’

ভ্যানের মাঝখানে লাল চক্ষু মেলে থাকা বিশালকায় হামের জীবাণু।
ছবি: প্রথম আলো

কাঁটাবন থেকে নাট্যকর্মীদের যাত্রা শুরু হয়ে এসে থামে শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে। তিনটি রিকশাভ্যানে করে সাজানো হয়েছিল প্রতীকী মর্গ। ভ্যানের মাঝখানে লাল চক্ষু মেলে থাকা বিশালকায় হামের জীবাণু। তার পাশে স্তূপাকার শিশুদের কাফন মোড়া মরদেহ। মরদেহগুলোতে নম্বর লেখা। ভ্যানগুলো এসে থামলে নাট্যকর্মীরা শিশুমৃত্যুর বিষয় নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তুলতে থাকেন। তাঁরা মরদেহগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘এই শিশুদের মেরে ফেলা হয়েছে।’ ‘হামে শিশুদের মৃত্যু প্রকৃতপক্ষে এক মর্মান্তিক গণহত্যা’। তাঁরা বলেন, ‘শত শত মায়ের বুক খালি করা হয়েছে।’ প্রশ্ন তোলেন, ‘কবে বন্ধ হবে শিশুদের নিয়ে রাজনীতির দাবা খেলা?’

শাহবাগ থেকে যাত্রা করে শিশুমর্গ এসে থামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে স্বোপার্জিত স্বাধীনতা ভাস্কর্যের সামনে। যাত্রাপথে পরিবেশনার সঙ্গে সঙ্গে মৃদুস্বরে ‘ভোর হলো দোর খোলো’, ‘নোটন নোটন পায়রাগুলো’, ‘থাকব নাকো বদ্ধ ঘরে’ এমন শিশুতোষ কবিতা ও গান বাজানো হয়। সব মিলয়ে সৃষ্টি হয় আবেগময় পরিবেশ।

টিএসসিতে পরিবেশনার পরে শিশুমর্গ আবার যাত্রা করে আসে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে ‘স্মৃতি চিরন্তন’ চত্বরের সামনে। এখানে ছিল শেষ পরিবেশনা। প্রতিটি স্থানেই অনেক কৌতূহলী দর্শক জড়ো হয়ে এই প্রতিবাদী আয়োজনে অংশ নিয়েছেন। শিশুমৃত্যু নিয়ে নাট্যকর্মীদের বেদনাবিধুর পরিবেশনা ও তাঁদের প্রতিবাদী জিজ্ঞাসা দর্শকদের হৃদয় স্পর্শ করেছিল। তাঁরাও চেয়েছেন দ্রুত এই মৃত্যুর মিছিল প্রতিরোধ করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

পরিবেশনার শেষে প্রাচ্যনাটের জ্যেষ্ঠ সদস্য জগন্ময় পাল সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, এই দেশ শিশুস্বর্গ হয়ে উঠবে এমনই প্রত্যাশা ছিল তাঁদের। কিন্তু পরিকল্পিত চিকিৎসা অবহেলায় তা আজ পরিণত হয়েছে শিশুমর্গে। তিনি এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি দাবি করে বলেন, তাঁদের এই প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে। হাম ও সম্প্রতি শিশু নির্যাতন–হত্যার যেসব ঘটনা ঘটছে, তার প্রতিবাদে ঈদের পরে আবার তাঁরা পথে নামবেন।