শিল্পকে ‘মনিটাইজ’ না করতে পারলে শিল্পী বাঁচবে না: অর্থমন্ত্রী

জধানীর ধানমন্ডিতে বেঙ্গল শিল্পালয়ে ‘দ্য লং প্রেজেন্ট: বিস্তৃত বর্তমান’ শীর্ষক চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ১৩ জুনছবি: প্রথম আলো

শিল্প ও শিল্পীকে টিকিয়ে রাখতে হলে শিল্পকর্মকে পণ্য হিসেবে ‘মনিটাইজ’ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, দেশে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানোর পর্যাপ্ত প্ল্যাটফর্মের অভাব রয়েছে। শিল্পকলা হোক, সংগীত হোক ‘মনিটাইজ’ (অর্থ আয়ের উপযোগী) করতে না পারলে উন্নতি করা সম্ভব নয়। ‘মনিটাইজ’ না করতে পারলে শিল্পী বাঁচবেন না।

আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর ধানমন্ডিতে বেঙ্গল শিল্পালয়ে ‘দ্য লং প্রেজেন্ট: বিস্তৃত বর্তমান’ শীর্ষক চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ১৫ জন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পীর ৪৬টি শিল্পকর্ম নিয়ে এই চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে বেঙ্গল শিল্পালয়। ৪ জুলাই পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত প্রদর্শনী চলবে।

প্রদর্শনীতে হাশেম খান, রফিকুন নবী, আবদুস শাকুর শাহ, নাজলী লায়লা মনসুর, ফরিদা জামান, মোহাম্মদ ইউনুস, জামালুদ্দিন আহমেদ, রঞ্জিত দাস, আহমেদ শামসুদ্দোহা, শিশির ভট্টাচার্য, কনকচাঁপা চাকমা, মোহাম্মদ ইকবাল, মাকসুদা ইকবাল নিপা, কামাল উদ্দিন ও সাহিদ কাজীর চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে।

আয়োজকেরা বলছেন, ষাটের দশকের পর থেকে শুরু করে এখনকার সময় পর্যন্ত এই ১৫ শিল্পীর শিল্পযাত্রা ও অভিজ্ঞতার ভিন্নতাকে একই ক্যানভাসে ধারণ করাই প্রদর্শনীর মূল ভাবনা। তাঁদের ভাষ্য, এটি কোনো ধারাবাহিক শৈলীর ইতিহাস নয়; বরং সময় কীভাবে শিল্পীর ক্যানভাসে থিতু হয়, তারই এক জীবন্ত অনুসন্ধান।

অনুষ্ঠানে সৃজনশীল অর্থনীতি বা ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, গ্রামের কামার-কুমার থেকে শুরু করে থিয়েটারশিল্পী পর্যন্ত সবাইকে মূলধারার অর্থনীতিতে আনতে সরকার শুধু নীতি প্রণয়নেই সীমাবদ্ধ নেই, বাজেটে বরাদ্দও দিচ্ছে। এ লক্ষ্যে একটি কেন্দ্রীয় ডিজাইন সেন্টার গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। যেখানে দেশের সব ডিজাইনারকে একত্র করে কারুশিল্পীদের দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা দেওয়া হবে।

বরিশালের শীতলপাটির উদাহরণ টেনে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সামান্য ডিজাইন সহায়তা ও ঋণসুবিধা দিলে ৭০০-৮০০ টাকার শীতলপাটি ২০০০-৩০০০ টাকায় বিক্রি হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও এর চাহিদা রয়েছে। থাইল্যান্ডের ‘ওয়ান ভিলেজ ওয়ান প্রোডাক্ট’ মডেলের উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের পণ্যও একইভাবে গ্রামীণ কারুপণ্য প্রশিক্ষণ, ব্র্যান্ডিং ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দেশ এবং বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

১৫ জন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পীর ৪৬টি শিল্পকর্ম নিয়ে এই চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে বেঙ্গল শিল্পালয়। ১৩ জুন
ছবি: প্রথম আলো

লন্ডনের থিয়েটার ডিস্ট্রিক্টের উদাহরণ দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সেখানে একজন দর্শক থিয়েটার দেখতে গিয়ে আর্ট শপ, ডিজাইনার শপে, স্ট্যান্ডআপ কমেডিতে অর্থ ব্যয় করেন। এই পুরো চক্রটি ‘ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রি’র অংশ এবং এটি সরাসরি জিডিপিতে যোগ হয়। বাংলাদেশে এ ধরনের সমন্বিত সাংস্কৃতিক অর্থনীতির বড় অভাব রয়েছে।

শিল্প–সংস্কৃতিকে ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে উল্লেখ করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কোরিয়ান সংস্কৃতি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের পল্লিগীতি, লালনগীতিসহ নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেও সেভাবে ‘মনিটাইজ’ ও প্রসার করা সম্ভব। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারি–বেসরকারি এবং এনজিও খাতের সম্মিলিত প্রচেষ্টা দরকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

উদ্বোধন অনুষ্ঠান শেষে অতিথি, আয়োজক ও শিল্পীরা ফটোসেশনে অংশ নেন। ১৩ জুন
ছবি: প্রথম আলো

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী (রনবী)। তিনি বলেন, ‘অনেক দিন পর আবার সবার কাজ নিয়ে এই প্রদর্শনী আমাকে আশাবাদী করে তোলে। এই বহুমাত্রিক প্রদর্শনী বেঙ্গলের কারণে আরও অনেকের কাছে পৌঁছে যাবে, অনেকে দেখবে,  ভাববে, আগ্রহী হবে—এটাই আমাদের অর্জন।’

শিল্পকলার যেকোনো শাখায় অংশগ্রহণের জন্য তরুণ প্রজন্মকেও আরও বেশি উৎসাহ দিতে হবে উল্লেখ করে রফিকুন নবী বলেন, মনন বিকাশে শিল্প–সাহিত্য চর্চার বিকল্প নেই।

অনুষ্ঠানে সরকারের ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ উদ্যোগের প্রশংসা করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সভাপতি আবুল খায়ের। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম সৃজনশীল অর্থনীতিকে মূলধারায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের ২০ কোটি মানুষকে ও তরুণ প্রজন্মকে যুক্ত রাখতে শিল্প ও সংস্কৃতির কোনো বিকল্প নেই।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন চিত্রশিল্পী মোহাম্মদ ইউনুস ও কনকচাঁপা চাকমা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক লুভা নাহিদ চৌধুরী। আয়োজনের শুরুতে অংশগ্রহণকারী চার প্রজন্মের শিল্পীদের সঙ্গে বেঙ্গলের পথচলাকে স্মরণ করে ‘পথ চলাতেই আনন্দ’ শীর্ষক তথ্যচিত্র দেখানো হয়।