ফারহানা বলেন, ‘মধু ছিল আমার শক্তি। এক মধু চলে গেছে, কিন্তু আমার চারপাশে তো অনেক মধু আছে।’ গতকাল শনিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরে শৈশবে ফারহানার সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তিনি বলেন, ‘মধু মারা যাওয়ার পর প্রথমে মনে হয়েছে, এটা আমার সঙ্গেই কেন হবে? কেন মধুকে এত কম বয়সে চলে যেতে হবে? একটা পর্যায়ে বুঝতে পারলাম, মধু আমাকে শক্তি দিতেই এসেছিল। মধুর জন্মের পরই শৈশবের যাত্রা শুরু হয়েছিল। মধু তার মাকে তৈরি করতে এসেছিল। মা যাতে আরও ১০টি শিশুকে বুঝতে পারে, খেলতে পারে, শেখাতে পারে।’

জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর মধুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল ৩ নভেম্বর। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারেনি মধু। তাকে খুলনায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

মধুকে হারিয়ে একা হয়ে গেছে তার বড় বোন সাত বছর বয়সী ফেলিসিয়া মান্নান মোহাম্মদী (চিনি)। গতকাল সকালে চিনি তার মায়ের সঙ্গে এসেছিল শৈশবে।

ফারহানা সব কষ্ট বুকে চেপে শৈশবের শিশুদের সঙ্গে জাতীয় সংগীত পরিবেশনসহ সব কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। সবার সঙ্গে কষ্টটাও ভাগাভাগি করে নিয়েছেন।

ফারহানা বলেন, ‘মধু চলে যাওয়ার পর মনে হয়, এখন যদি আমি আমার কাজ থামিয়ে দিই, তাহলে তো সবই হারিয়ে যাবে। মেয়ে হারানোর কষ্টটা সারা জীবনই বয়ে বেড়াতে হবে। দুঃখটা ভেতরে আছে। সুপ্ত অবস্থায় আছে। তবে শৈশবের শিশুদের মধ্যে ফিরে স্বস্তি পাচ্ছি।’

শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ নিয়ে পড়াশোনা করেছেন ফারহানা। পড়াশোনা চলাকালে চিনি ও মধুর জন্ম হয়। তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে চিনি ও মধু আসার পর নিজেকে শক্তিশালী মনে হতো। খেলার সাথি হয়ে ওদের সঙ্গে খেলেছি। বৃষ্টিতে ভেজা, ঘাসের ওপর খালি পায়ে হাঁটা, ফুল কুড়ানো, গান গাওয়া—সে অনেক স্মৃতি। আমাদের তিনজনের একটা দল ছিল। ফুচকা খাওয়া, একই রকম পোশাক পরা—এসব দেখে সবাই আমাদের দলের নাম দিয়েছিলেন—তিন কন্যা।’

ফারহানা বলেন, শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ নিয়ে তিনি পাঠ্যপুস্তকে যা পড়তেন, বাসায় ফিরে দুই মেয়ের ওপর তা পরীক্ষা করতেন। বোঝার চেষ্টা করতেন, এটা আসলে কতটুকু কার্যকর। দুই মেয়ের সঙ্গে খেলতে খেলতেই তাঁর মনে নতুন ধারণার জন্ম নিত। মেয়েদের সময় দিতে গিয়েই গল্পের শক্তি কোথায়, গল্পের সঙ্গে খেলার সম্পর্ক—এসব বিষয় মাথায় আসে। তারপর শৈশবের জন্ম।

দাদি শাশুড়ি ফারহানাকে আদর করে ‘মধু, ও মধু’ বলে ডাকতেন। ছোট মেয়ের জন্মের পর হঠাৎ একদিন ‘মধু’ নামটি মুখে চলে আসে। তখন মধুর সঙ্গে মিল রেখে বড় মেয়ের নামের সঙ্গে যোগ হয় চিনি। সেই থেকেই মেয়েদের নাম হয় চিনি ও মধু। আর ফারহানা হন চিনি-মধুর মা। স্বজন-বন্ধুদের কাছে তিনি এই নামেই বেশি পরিচিত।

মধু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালে ফারহানা ও তাঁর স্বামী বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মেয়ের জন্য রক্ত চেয়ে পোস্ট দিয়েছিলেন। সবার কাছে দোয়া চেয়েছিলেন। মেয়ে মারা যাওয়ার পর বাবা লিখেছিলেন, ‘আমাদের ছোট মধু আকাশে উড়াল দিয়েছে।’

হাসপাতালের বিছানায় শেষবারের মতো মেয়েকে স্পর্শ করা, মেয়ের হাতে চুমু খাওয়া, মেয়ের লাশ কাঁধে নেওয়ার ছবি ফারহানা ফেসবুকে শেয়ার দিয়ে নিজের আবেগ প্রকাশ করেছিলেন। এ নিয়ে ফেসবুকে অনেকে নানা কথা বলেন। এ প্রসঙ্গে ফারহানা প্রথম আলোকে বলেন, ফেসবুকে এসব ছবি প্রকাশকে তিনি ও তাঁর স্বামী স্বাভাবিকভাবেই দেখেছেন।

ফারহানা বলেন, ‘মধু যখন ছিল, তখন আমরা একসঙ্গে ছবি তুলে ফেসবুকে দিয়েছি। আমরা ভেবেছি, ওর চলে যাওয়ার সময়ের একটা ছবিও ফেসবুকে থাকুক। এ ছবিই পরে শক্তি হিসেবে কাজ করবে। আমার আবেগ বুঝতে হবে। সবার আবেগ প্রকাশের ভঙ্গি এক রকম হয় না। মৃত মেয়েকে জড়িয়ে ধরে ছবি তুলেছি, এত বড় ব্যথা, অভিনয় বা লোকদেখানোর জন্য করিনি। শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করার জন্যই করেছি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মেয়ের সঙ্গে থেকেছি।’

ফারহানা বললেন, ‘মধু চলে গেছে, তবে ওর কাছ থেকে প্রাপ্তিটা নিয়ে ভাবতে হবে। বাস্তবতা হলো, মেয়েটা নেই। তবে আমাদের চারপাশে অনেক মধু আছে। তাদের জন্য কাজ করতে হবে। আমার এ শক্তি দেখে অন্য মায়েরাও শক্তি পাবেন। অন্য জগতে গিয়ে আমাদের মেয়েটা ভালো থাকবে বলেই মনে করি। স্মৃতিগুলো তো হারায় না।’

রাজধানীসহ সারা দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ে ফারহানা বললেন, ‘আজ আমার মেয়ে গেল, কাল আরেকজনের যাবে। নিজের না হারালে আমরা ব্যথাটা বুঝতে পারি না। এভাবে তো চলতে পারে না। চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা যাদের দায়িত্ব, তাদের সচেতন হতে হবে।’

আলাপের শেষ পর্যায়ে ফারহানা বলেন, মধু বয়সে ছোট ছিল, কিন্তু তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খুবই চমৎকার। প্রতিদিন জাতীয় সংগীত গাওয়া, সংবাদপত্র-বই পড়া, বইয়ের রিভিউ করা—কত কিছু যে সে করত! এসব কাজের মধ্য দিয়ে মধু মানুষের মতো মানুষ, দেশপ্রেমিক হয়ে উঠত বলে বিশ্বাস ছিল ফারহানার।

ফারহানা এখন বলছেন, মধু না থাকলেও চিনি আছে। আছে অন্য মধুরা। এই শিশুদের জন্য ফারহানা কাজ করতেন চান। তাঁর প্রতিষ্ঠান শৈশবকে অনেক বড় করতে চান। যেখানে শিশুরা আসবে, খেলবে, জানবে। তারা তাদের মতো করে বড় হবে। এভাবেই তারা খেলতে খেলতে জীবন সম্পর্কে শিখবে।