কথাসাহিত্যিক শওকত আলী ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াস অসাধারণ সব শিল্পকর্ম সৃষ্টি করে রেখে গেছেন; কিন্তু মানুষ বই পড়ছে না। ফলে বুঝতে পারছে না শওকত, আখতারুজ্জামানসহ কত বড় বড় শিল্পী এ দেশে জন্মেছিলেন।
‘শওকত আলী ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কথাসাহিত্য: মানুষের সংগ্রামের শিল্পরূপ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তারা এ কথা বলেন। বুধবার বিকেলে রাজধানীর পরীবাগে সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্রে এই আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সাহিত্যসভা।
১৯৩৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে জন্মগ্রহণ করেছিলেন শওকত আলী। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের জন্ম ১৯৪৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে। ১২ ফেব্রুয়ারি প্রখ্যাত এ দুই কথাসাহিত্যিকের জন্মদিন হলেও সেদিন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সে কারণে আগেই এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
প্রখ্যাত এ দুই কথাসাহিত্যিক সম্পর্কে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ভারতভাগ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বড় শিকার ছিল কথাসাহিত্যিক শওকত আলীর পরিবার। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিষবাষ্পের কারণে তিনি এ পাশে (ভারত থেকে বাংলাদেশে) চলে আসেন।
আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘চলে এলেই তো চলে আসে না মানুষ। কোনো না কোনোভাবে সারাক্ষণই একটা যন্ত্রণার মধ্যে থাকে। তার মধ্য দিয়ে যে একটা অভিজ্ঞতা হয়, সেই অভিজ্ঞতাও তাকে তাড়িত করতে থাকে। হাসান ভাইয়ের (কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক) ক্ষেত্রেও এ কথা সত্য। বদরুদ্দীন উমরও (চিন্তক ও লেখক বদরুদ্দীন উমর) সাম্প্রদায়িক পরিবেশের কারণে এ পাশে এসেছেন।’
এই শিক্ষাবিদ বলেন, ‘তাঁদের লেখার মধ্যে সাম্প্রদায়িক এসব বিষয় পাওয়া যায়। আর ইলিয়াস ভাইয়ের যৌবন গেছে সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে। দেখেছেন উনসত্তরের গণ–অভ্যুত্থান, পরে মুক্তিযুদ্ধ। এসব ঘটনা একেবারে ভেতর থেকে মানুষকে পরিবর্তন করে দেয়। সমাজ থেকে ইচ্ছা করলেই দূরে থাকা যায় না। বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের মানুষেরা বাস্তবতাকে অস্বীকার করেন না। বাস্তবতা থেকে নিজেকে আড়াল রেখে লেখালেখি করেন না।’
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া ছিল তাঁদের জন্য বিশাল আনন্দ ও শিক্ষার বিষয় বলেও উল্লেখ করেন আনু মুহাম্মদ।
আয়োজনের সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস। তিনি বলেন, শওকত আলীর বাড়িতে তাঁদের প্রচুর যাতায়াত ছিল। তাঁর (শওকত) মতো বিনয়ী লোক খুব কম দেখেছেন তিনি।
খালিকুজ্জামান ইলিয়াস বলেন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ছিলেন লাজুক প্রকৃতির। তিনি ছিলেন আত্মপ্রচারবিমুখ। কিন্তু লেখাকে তিনি সাধনার মতো নিয়েছিলেন। সস্তা লেখা কখনো লেখেননি। তাঁর লেখার সংখ্যা কম। কিন্তু আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বলতেন, একটা উপন্যাস লিখতে তাঁকে যে পরিশ্রম করতে হয়, যত বছর লাগে, তাতে তাঁর মনে হয় না, তিনি কম লিখছেন।
এই আয়োজনে কথাসাহিত্যিক মশিউল আলম বলেন, মানুষ বই পড়ছে না। ফলে শওকত আলী ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের শিল্পকর্ম মানুষের হাতে পৌঁছাচ্ছে না। মানুষ বুঝতে পারছে না কত বড় দুজন শিল্পী তাঁরা বা আরও অনেক শিল্পী এ দেশে জন্মেছিলেন। তাঁরা কী অসাধারণ সব সৃষ্টি করেছিলেন।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন নাট্যকর্মী কাজী তৌফিকুল ইসলাম, প্রাবন্ধিক চঞ্চল আশরাফ ও সাংবাদিক ধ্রুব সাদিক। আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন অভিনয়শিল্পী নাঈমা তাসনিম।