তরুণেরা যেভাবে চিন্তা করছে, তাতে ভালো পরিবর্তন আসবে: প্রধানমন্ত্রী

সিআরআই আয়োজিত তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে আলাপচারিতার অনুষ্ঠান লেটস টক–এ তরুণদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত শুক্রবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আওয়ামী লীগের কার্যালয়েছবি: বাসস

দেশে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মতো যোগ্য অনেক ছেলেমেয়ে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এই তরুণেরা যেভাবে চিন্তা করছে, তাতে করে দেশে ভালো পরিবর্তন আসবে।

প্রধানমন্ত্রী ২২ ডিসেম্বর সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই) আয়োজিত ‘লেটস টক উইথ শেখ হাসিনা’ অনুষ্ঠানে তরুণদের মুখোমুখি হন। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানের ভিডিও ধারণ করা হয়। আজ বৃহস্পতিবার সিআরআইয়ের ফেসবুক পেজ, ইউটিউবে সেটি সম্প্রচার করা হয়।

অনুষ্ঠানে তরুণদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তোমরাই দেশের ভবিষ্যৎ।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সামনে বসা তরুণেরা সমস্বরে বলেন, ‘আমরাই পারব।’ অনুষ্ঠানের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী সামনে বসা একদল তরুণ-তরুণীকে নিজের নাতি–নাতনি বলে সম্বোধন করেন। তিনি বলেন, ‘নিজের নাতি–নাতনিরা বিদেশে থাকে, এখানে একঝাঁক নাতি–নাতনি পেয়েছেন, যা তাঁর খুব ভালো লাগছে।’

বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নত দেশ হিসেবে দেশকে এগিয়ে নিতে এখন থেকেই তরুণদের প্রস্তুতি নিতে হবে। শুধু প্রধানমন্ত্রী হওয়া নয়, দেশ ও মানুষের জন্য চিন্তা করতে হবে। অনেক সংগ্রামের ফলে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে, জাতি হিসেবে বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে চলতে হবে। বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে যে স্বীকৃতি পেয়েছে, তা তরুণদেরই ধরে রাখতে হবে।

‘যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের বিষয়ে নাক গলায়’

বাংলাদেশে মানবাধিকারসহ নানা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য–বিবৃতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করেন তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা শাহরিয়ার বাবলা। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নিজের দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলে তখন নিজের দেশের দিকে তাকায় না। স্কুলে, রেস্টুরেন্টে মানুষকে গুলি করে মারে। তাদের মোড়লিপনা কে করতে দিল জানি না। প্যালেস্টাইনের বিষয়ে চুপ থাকে। আমাদের শ্রম অধিকার নিয়ে কথা বলে, সবক দিতে আসে। অন্য দেশের বিষয়ে নাক গলায়। ইউক্রেনে এক স্ট্যান্ড নেয়, প্যালেস্টাইনের বেলায় অন্য স্ট্যান্ড নেয়। ইসরায়েলকে অস্ত্র কেনার জন্য টাকা দিচ্ছে। দেশটির মানবাধিকারের ডেফিনেশন কী, তা–ই আমার প্রশ্ন।’

সামনে নির্বাচন, কারও সঙ্গে ‘কম্প্রোমাইজ’ করে ক্ষমতায় যেতে চান না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি ট্রেনে আগুন দিয়ে মা ও শিশুকে পুড়িয়ে মারছে। তখন কিন্তু দেশটি কোনো কথা বলে না।

স্মার্ট বাংলাদেশে গুরুত্ব

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্মার্ট বাংলাদেশ নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে কম্পিউটার শিক্ষার বিষয়টিতে জোর দিয়েছিলেন। তবে তখন বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের আগ্রহ কম ছিল। কম্পিউটার, ডেস্কটপ সাজিয়ে রাখা হতো। অ্যানালগ ফোন ছিল। ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দামের মোবাইলে ফোন করলে বা ধরলেও মিনিটে ১০ টাকা দিতে হতো। এখন সবার হাতে হাতে মোবাইল। অজপাড়াগাঁয়ের মানুষেরাও ফোনে ছবি তুলছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন আমরা ফাইভজির দিকে যাচ্ছি। স্মার্ট বাংলাদেশ মানে হলো, ছেলেমেয়েরা দক্ষতা অর্জন করবে। সরকারের কাজ ডিজিটাল ডিভাইসে হবে। দেশের সার্বিক ইকোনমি স্মার্ট ইকোনমি হবে। এতে মানুষের কর্মঘণ্টা বাঁচবে।’ বর্তমানে অনলাইনেই পেনশন থেকে শুরু করে বিভিন্ন ভাতা তোলার কাজ করা যায় বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশের ৬ লাখ ৬০ হাজার তরুণ ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করছে। শুরুতে ব্যাংকে কিছুটা সমস্যা ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে ডেকে বলেছি, ছেলেমেয়েরা বৈদেশিক কারেন্সি নিয়ে আসছে, এত প্রশ্ন করার কী দরকার? পদ্ধতি সহজ করে দিলাম।’

এ পর্যায়ে হাসতে হাসতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্রিল্যান্সিংয়ের ক্ষেত্রে বিয়ের বাজারে ছেলে কোনো কামাই করে না বলে কিছুটা সমস্যা হচ্ছিল। একজন ফ্রিল্যান্সার একবার খুদে বার্তা পাঠালেন, ‘তিনি কোনো কাজ করেন না’ এ কথা বলে স্কুলে তাঁর বাচ্চাকে ভর্তি করা হচ্ছে না। করোনা মহামারি একটি ভালো সুযোগ করে দিল। দরজা খুলে গেল। করোনার সময় প্রধানমন্ত্রী নিজে মন্ত্রিসভা, একনেকসহ ১ হাজার ৬০০টির বেশি সভা অনলাইনে করেছেন বলেও উল্লেখ করেন। ২০৪১ এর বাংলাদেশে তরুণদের হাতে নতুন প্রযুক্তি থাকবে এবং তারাই দেশের কর্ণধার হবে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

‘হতাশ হওয়া চলবে না’

এক তরুণের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন তরুণেরা অল্পতেই বলে “বোর” হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সময় এমন ছিল না। এখন পাঁচজন একসঙ্গে হলেও কেউ কারও সঙ্গে কথা বলে না। সবাই মোবাইল টিপতে থাকে। কথা বলতে ভুলে যাচ্ছে সবাই। বাইরের জগৎকে চাদরে ঢেকে দিচ্ছে।’

প্রধানমন্ত্রী হতাশা কাটাতে তরুণদের সঠিক বা ভুল যা–ই করুক, তা নিজের বিশ্বাস থেকে করার পরামর্শ দেন। তিনি সময় পেলেই তরুণদের বই পড়ারও পরামর্শ দেন। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আড্ডা এমনকি ভাইবোনদের সঙ্গে ঝগড়া করলেও হতাশা গ্রাস করবে না বলে উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানের একটি পর্বে প্রধানমন্ত্রীকে কেউ গুরুগম্ভীর প্রশ্ন করতে পারবেন না বলে জানান অনুষ্ঠানের সঞ্চালক এশিয়ার শীর্ষ ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় স্থান পাওয়া অণুজীববিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহা। এ পর্বে প্রধানমন্ত্রী ব্যাডমিন্টন খেলতে, মাছ ধরতে পছন্দ করেন কি না, রান্না করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তরুণেরা জানতে চান। বাইরে কোনো রেস্তোরাঁয় খাওয়ার সুযোগ পান না বলে এ সময় প্রধানমন্ত্রী আক্ষেপও করেন। তিনি বলেন, ‘সিকিউরিটির নামে বন্দী করে রাখে। ২০০৭ সালে ছোট জেলে বন্দী ছিলাম, এখন বড় জেলে বন্দী হয়ে আছি।’

রান্না করতে ভালোবাসেন এবং ছেলে–মেয়ে ও নাতি–নাতনিরা তাঁর হাতের রান্না পছন্দ করেন বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। এখন যে পরিমাণে ফাইলপত্রসহ বিভিন্ন জিনিস পড়তে হয় স্কুলজীবনে এত পড়লে ফার্স্ট বা প্রথম হতেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গ্রামে জন্ম এবং গ্রামে থাকতে ভালোবাসেন এবং এক সময় গ্রামে ফিরে যাবেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ঢাকায় কোনো বাড়ি বানাননি। এখন পদ্মা সেতু হয়ে গেছে তাই টুঙ্গিপাড়ায় যেতে সময় লাগবে না, কম সময়েই গ্রামে পৌঁছে যেতে পারবেন।