লিখতে হবে মনের টানে-স্বতঃস্ফূর্তভাবে, খ্যাতি কিংবা টাকার জন্য নয়

‘লেখক বন্ধু উৎসব’–এ তরুণ লেখকদের সঙ্গে অতিথি ও আলোচকেরা। আজ শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়েছবি: প্রথম আলো

লেখালেখি শুধু শব্দ সাজানোর কাজ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাঠ, পর্যবেক্ষণ, অনুভূতি ও জীবনের গভীর উপলব্ধি। প্রথম আলো বন্ধুসভার ‘লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬’–এ নতুন লেখকদের উদ্দেশে এই পরামর্শ দিয়েছেন বক্তারা। কথাসাহিত্য থেকে কবিতা, ফিচার থেকে অনুবাদ কিংবা বই প্রকাশ—লেখার নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন দেশসেরা কথাসাহিত্যিক, কবি, অনুবাদক, সম্পাদক ও প্রকাশকেরা। তাঁরা বলেছেন, ভালো লিখতে হলে পড়তে হবে, সংবেদনশীল হতে হবে এবং নিজের লেখাকে বারবার পাঠকের চোখে দেখতে হবে।

‘লেখক বন্ধু উৎসব’-এ তরুণ লেখকদের সঙ্গে অতিথি ও আলোচকেরা। আজ শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে
ছবি: প্রথম আলো

আজ শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ের সভাকক্ষে দিনব্যাপী ‘লেখক বন্ধু উৎসব’ হয়। সকাল সাড়ে ৯টায় সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই উৎসব। এতে সারা দেশের নির্বাচিত লেখক বন্ধুরা অংশ নেন।

উৎসবে ‘ভ্রমণ ও অনুবাদ’ বিষয়ে আলোচনা করেন অনুবাদক ও কথাসাহিত্যিক ফারুক মঈনউদ্দিন। তিনি বলেন, অনুবাদককে সৃষ্টিশীল হতে হবে। অনুবাদের মূল বিষয়টা বোঝার জন্য যে ভাষা থেকে অনুবাদ করছেন, সেই ভাষার, সেই দেশের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রা সম্পর্কেও জানতে হবে। অন্যথায় ভালো অনুবাদ হবে না।

ভ্রমণকাহিনি বা সাহিত্য লেখার প্রসঙ্গে ফারুক মঈনউদ্দিন বলেন, যেখানে যাচ্ছেন সেখানকার মানুষের চরিত্র, জীবনযাপন, ইতিহাস, সংস্কৃতি সেই লেখায় থাকতে হবে।

অনুভূতির প্রকাশমাত্রই কবিতা নয় বলে মনে করেন কবি ও প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ। তিনি বলেন, ‘অনুভূতিকে ভাষার মধ্য দিয়ে সর্বজনীন করতে পারলেই কবিতা হয়ে উঠবে। কোনো প্রবন্ধে যে শব্দটি ব্যবহৃত হয়, সেটি যখন কবিতার মধ্যে ঢোকে তখন অর্থ পরিবর্তন হয়ে যায়। আমরা যে কবিতা পড়ি, গল্প পড়ি, সিনেমা দেখি—এগুলো আমাদের নতুন একটা পৃথিবী দেখায়।’

‘লেখক বন্ধু উৎসব’-এ কথা বলেন কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল। আজ শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে
ছবি: প্রথম আলো

লেখার ক্ষেত্রে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হওয়ার পরামর্শ দেন কথাসাহিত্যিক মোহিত কামাল। তিনি বলেন, লেখকের কাজ লিখে যাওয়া। লেখক, পাঠ্য ও পাঠক আলাদা। পাঠকের অংশগ্রহণ ও মূল্যায়নের মাধ্যমে সাহিত্য শিল্পে পরিণত হয়।

এই উৎসবের আয়োজন সহযোগী হিসেবে ছিল মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশ। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক (কমিউনিকেশন) রুখসানা মিলি তরুণ লেখকদের শুভ কামনা জানিয়ে বলেন, ‘লেখার কৌশল নিয়ে আজ আপনারা যা শুনছেন, শিখছেন তা অনেক বড় পাওয়া।’

‘লেখক বন্ধু উৎসব’-এ কথা বলেন কবি ও প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ। আজ শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে
ছবি: প্রথম আলো

অনুষ্ঠানে ছিল লেখক–প্রকাশক–সম্পাদক আলাপচারিতা। এই পর্বে সময় প্রকাশনের প্রকাশক ফরিদ আহমেদ বলেন, বই বের করার জন্য একটা প্রস্তুতি দরকার। কিন্তু সেই প্রস্তুতিটার জন্য এখনকার লেখকদের মধ্যে ধৈর্য কম। এই জায়গাটায় ধৈর্য লাগবে। লেখায় কঠিন শব্দ থাকা যাবে না।

বাতিঘরের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও প্রধান সম্পাদক (চিফ এডিটর) জাফর আহমদ রাশেদ বলেন, প্রকাশকের কাছে পাণ্ডুলিপি পাঠাতে হবে সম্পূর্ণ করে। সূচিপত্র, পৃষ্ঠা নম্বর, লেখক পরিচিতি, ভূমিকা, বইয়ের সারসংক্ষেপ, বইটি কেন প্রকাশযোগ্য সেই সম্পর্কেও কিছু লিখতে হবে।

‘ফিচার ও সংবাদ’ বিষয়ের আলোচনায় প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন বলেন, ফিচার সাংবাদিকতারই একটি অংশ। ফিচার লেখার ক্ষেত্রে সঠিক তথ্যের ব্যবহার সাহিত্যিক ঢঙে লিখতে হবে। শিরোনাম হতে হবে এমন কিছু শব্দের সমাহার, যা পাঠককে আকৃষ্ট করবে। লেখায় বাস্তব জীবন থেকে শব্দ নিতে হবে। পাঠককে নতুন তথ্য দিতে হবে।

‘লেখক বন্ধু উৎসব’-এ কথা বলেন কথাসাহিত্যিক ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক। আজ শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে
ছবি: প্রথম আলো

কথাসাহিত্যিক ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হকের আলোচনায় উঠে আসে লেখকজীবনের সংগ্রামের কথা। তিনি বলেন, ‘শিল্পী হওয়া মানেই ব্যর্থ হওয়া। আর ব্যর্থ হলেই শিল্পী হবেন। মনে রাখবেন লেখালেখি করে কখনো প্রশংসিত হবেন না। অনেকেই সমালোচনা করবে। খ্যাতির জন্য লিখবেন না। টাকার জন্য লিখবেন না।’ তাহলে কেন লিখব–সে প্রশ্নের জবাবে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি লেখাকে উদ্ধৃত করে আনিসুল হক বলেন, ‘বলিয়া লিখিয়া যদি দেশের মানুষের উপকার করিতে পারো, সৌন্দর্য সৃষ্টি করিতে পারো, তাহলে লেখো।’

লেখালেখির কোনো সর্বজনীন সূত্র নেই বলে উল্লেখ করেন কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন। তিনি বলেন, লিখতে হলে প্রচুর পড়তে হবে। পাশাপাশি অনুভূতি প্রবণতা, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, সংবেদনশীলতা লাগবে। স্পর্শিত হওয়াটা খুব জরুরি। এটা তখনই হবে যখন আপনি সংবেদনশীল হবেন।

বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের সভাপতি জাফর সাদিক সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে উৎসবে অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা ভালো লিখছেন এবং লিখবেন বলে আমরা আশাবাদী।’

‘লেখক বন্ধু উৎসব’-এ কথা বলেন কথাসাহিত্যিক সাদাত হোসাইন। আজ শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে
ছবি: প্রথম আলো

অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ‘লেখক বন্ধু উৎসব ২০২৬’-এর আহ্বায়ক সৌমেন্দ্র গোস্বামী। এ ছাড়া উৎসবে অনুভূতি প্রকাশ করেন বন্ধুসভা জাতীয় পর্ষদের উপদেষ্টা উত্তম রায়, সহসভাপতি মোহাম্মদ আলী ফিরোজ ও রুবাইয়াত সাইমুম চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক সাইমুম মৌসুমী বৃষ্টি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা মুহসিনা বুশরা, সাংগঠনিক সম্পাদক তৌহিদ ইমাম ও কার্যনির্বাহী সদস্য তাপসী রায়।

অনুষ্ঠানের শেষ দিকে ‘লেখক বন্ধু পুরস্কার ২০২৬’ বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। তাঁরা হলেন ভৈরব বন্ধুসভার আফিফুল ইসলাম, ময়মনসিংহ বন্ধুসভার মো. আবুল বাশার, ঢাকা মহানগর বন্ধুসভার খোন্দকার হুমায়ূন কবীর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভার নুসরাত রুষা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভার জাসেদুল ইসলাম। ২০২৫-২৬ সালে বন্ধুসভার ওয়েবসাইটে ও স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশিত লেখার জন্য তাঁরা এই পুরস্কার পান।

লেখালেখি কর্মশালা মূল্যায়নে সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত পাঁচজনের হাতেও তুলে দেওয়া হয়েছে পুরস্কার। তাঁরা হলেন যথাক্রমে বদরুল হাসান, সাব্বির আহমেদ, তাসফিয়া তাসমিন, নুসরাত ভূঁইয়া ও শহীদুল আলম।

এ ছাড়া চিঠি লেখা প্রতিযোগিতার সেরা তিনজনকেও পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। চিঠি লেখা প্রতিযোগিতার সেরা তিনজন হলেন শারমিন সুলতানা, ভূঁইয়া শফি ও তাজিন সুরভী।