২০ বছর আগের তুলনায় হৃদ্‌রোগের ধরন ও চিকিৎসায় কেমন পরিবর্তন দেখছেন?

মোমেনুজ্জামান: হৃদ্‌রোগের ধরনের কোনো পরিবর্তন হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। কিন্তু হৃদ্‌রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার যথেষ্ট পরিবর্তন হয়েছে। ২০ বছর আগে চিকিৎসক কম ছিল, হাসপাতাল কম ছিল, যাতায়াতব্যবস্থা দুরূহ ছিল। হৃদ্‌রোগ হতো, প্রত্যন্ত অঞ্চলেও হতো। কিন্তু রাস্তাঘাটের সমস্যার কারণে তাঁরা সময়মতো আসতে পারতেন না। সুযোগ–সুবিধা কম ছিল। সারা বাংলাদেশের রোগীদের জন্য ছিল শুধু জাতীয় হৃদ্‌রোগ হাসপাতাল। আর পুরোনো আটটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নামসর্বস্ব একটা করোনারি কেয়ার ইউনিট ছিল। তাই মানুষের রোগ থাকলেও ডায়াগনোসিস হতো না, চিকিৎসা হতো না।
কিন্তু ১৫-২০ বছরে যে পরিবর্তন এসেছে, তা সর্বক্ষেত্রেই এসেছে। হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ বেড়েছে। হাসপাতাল ও যন্ত্রপাতির সুবিধা বেড়েছে। যাতায়াতব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। টেকনাফে একটা লোক হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হলেন, তিনি দ্রুত কাছাকাছি কোনো হাসপাতালে আসতে পারবেন। এখন ইসিজি মেশিন উপজেলা পর্যায়েও রয়েছে। কোনো কোনো জায়গায় বিশেষজ্ঞও রয়েছেন। তাই দ্রুত রোগ নির্ণয় সেখানেই হয়ে যায়। তারপর কেউ চট্টগ্রামে থাকেন, কেউ ঢাকায় চলে যাচ্ছেন।

কোন বয়সের রোগী এখন বেশি পাওয়া যায়?

মোমেনুজ্জামান: যুবক বয়সের রোগী তুলনামূলক বেশি পাওয়া যাচ্ছে। এটা শুধু বাংলাদেশে নয়, পুরো এশিয়াতেই একই অবস্থা। বিশেষ করে বয়স চল্লিশের নিচে, এই গ্রুপের হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতাটা বেড়েছে। আমি যদি বলি, ৪০-৫০ বছর আগের তুলনায় এটা কিছুটা যুবক বয়সীদের মধ্যে শিফট হচ্ছে (বাড়ছে)। তাঁদের পরিবেশগত কারণে, খাদ্যাভ্যাসগত কারণে, অতিরিক্ত চাপ নেওয়া এবং প্রতিযোগিতামূলক জীবনের কারণে এটা বেড়ে যাচ্ছে। মা–বাবার যদি হৃদ্‌রোগ থাকে এবং ছেলে যদি তাঁর খাদ্যাভ্যাস ঠিক না রাখেন, তাহলে তাঁর হৃদরোগের একটা প্রবণতা দেখা দিতে পারে। তরুণ-তরুণীরা এখন পেশাগত জীবন নিয়ে বেশি ব্যস্ত। টুকটাক অসুবিধা হয়, কিন্তু পাত্তা দেন না। বুকে ব্যথা হচ্ছে, গ্যাসের ব্যথা বলে চালিয়ে দিচ্ছেন কিছুদিন। তখনই চিকিৎসকের কাছে যান, যখন অবস্থা সংকটাপন্ন হয়।

ডায়াগনোসিসের ক্ষেত্রে পরিবর্তনটা কেমন দেখছেন?

মোমেনুজ্জামান: আগে রোগ নির্ণয় ছিল ইসিজিসর্বস্ব। এখন ইকোকার্ডিওগ্রাফি এসেছে। জেলা পর্যায়েও আছে। উপজেলা পর্যায়ে যদি না–ও থাকে, যেকোনো মানুষ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির কারণে দ্রুত জেলাপর্যায়ে গিয়ে এসব সেবা পাচ্ছে। ইটিটি, কিছু ল্যাব পরীক্ষা রয়েছে সব জেলায়। কোনো কোনো জেলায় আরও অধিকতর সুবিধা রয়েছে। যেমন ক্যাথ ল্যাব আছে। এনজিওগ্রাম সুবিধা রয়েছে, যেটা দিয়ে রক্তনালির ব্লক শনাক্তকরণ করা যায়। আমাদের দেশে এখন প্রায় ৯২টি ক্যাথ ল্যাব রয়েছে। যদিও বেশির ভাগ ঢাকাকেন্দ্রিক, অন্যান্য জেলায়ও রয়েছে। চট্টগ্রামেও ছয়-সাতটি হাসপাতালে রয়েছে।

দেশে হৃদ্‌রোগের চিকিৎসায় রোগীদের আস্থা কেমন?

মোমেনুজ্জামান: দেশে হৃদ্‌রোগ চিকিৎসার প্রসারটার কারণ হলো, রোগীদের আস্থা আগের তুলনায় বেড়েছে। যে কারণে এতগুলো হাসপাতালে কার্ডিয়াক সুবিধা রয়েছে। কার্ডিয়াক হাসপাতাল করতে অনেক টাকা খরচ হয়। যাঁরা করছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই হিসাব করেই করছেন। এ কারণে মানুষের আস্থা অনেক বেড়েছে। ২০ বছর আগে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হলে এক পক্ষ চলে যেত পাসপোর্ট করতে, আরেক পক্ষ পাসপোর্ট থাকলে ভিসা করতে চলে যেত। আমাদের প্রতিবেশী দেশে তারা যেত। ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রে তারা বাইরে চলে যেত। কিন্তু এখন রোগীদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতাটা রোগীরা উপলব্ধি করছেন। এতে আত্মবিশ্বাস বেড়েছে। চিকিৎসকদেরও দায়বদ্ধতা বেড়েছে অনেক। এতে করে ভবিষ্যতে আরও উন্নত চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা আসার পথ সুগম হয়েছে।

স্ট্যান্ট না পরিয়ে ও বাইপাস না করে ব্লক ছোটানোর একটা কথা শোনা যায়। এটা আসলে কতটা সঠিক?

মোমেনুজ্জামান: আমি বলব না যে নেই। তবে যতটা না বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে, তার চেয়ে বেশি গুজব। কিছু কিছু ব্লক রয়েছে, যেখানে সার্জারির সুযোগ নেই, স্ট্যান্ট বা রিং পরানোরও সুযোগ নেই। সে ক্ষেত্রে কিছু কিছু বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি আছে। কিন্তু এ রকম কিছু নেই যে ওই সব পদ্ধতি দিয়ে সব ব্লক ছোটানো যাবে। যাঁদের বাইপাস করতে হবে, তাঁদের বাইপাস করতে হবে। যাঁদের স্ট্যান্ট পরাতে হবে, তাঁদের স্ট্যান্ট পরাতে হবে।

হৃদ্‌রোগ চিকিৎসার খরচটা নিয়ে যদি একটু বলেন।

মোমেনুজ্জামান: খরচটা একটা ফ্যাক্টর। স্ট্যান্টের দাম সরকার নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে, তার চেয়ে অনেক কম দামে, এক-তৃতীয়াংশ মূল্যে ভারতে স্ট্যান্ট পাওয়া যায়। যাঁরা নীতিনির্ধারক আছেন, তাঁদের ভাবার ব্যাপার আছে। যদি হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে হয়, সে ক্ষেত্রে এসব জিনিসপত্রের ওপর যেন অতিরিক্ত কর আরোপ করা না হয়। এ ছাড়া বহুজাতিক কোম্পানি যারা এই স্ট্যান্ট বিক্রি করছে, তাদের চাপ দিতে হবে। অন্যান্য দেশে কম দিতে পারলে এখানে কেন পারবে না। মানুষ যদি দেখে, আমার দেশের চিকিৎসা ব্যয়বহুল আর ভারতে কম, তাহলে রোগীরা চলে যাবেন।

ঢাকা ও চট্টগ্রামের রোগীর সংখ্যা ও চিকিৎসাপদ্ধতির যদি তুলনা করা হয়, সেটা কেমন দাঁড়াবে?

কায়সার নসরুল্লাহ খান: চট্টগ্রামে আমার বাড়ি। চট্টগ্রামের লোকেরা গরুর মাংস ও মেজবান খেতে বেশি পছন্দ করেন। সে কারণে চট্টগ্রামের লোকের হৃদ্‌রোগ একটু বেশি হয়। দুটি কারণ— একটা জেনেটিক (বংশগত), আরেকটি খাদ্যাভ্যাস। এ কারণে দেখা যায়, ঢাকায়ও আমরা চট্টগ্রামের রোগী বেশি পাচ্ছি। আর চট্টগ্রামে চিকিৎসাব্যবস্থা আগে এত উন্নত ছিল না। যন্ত্রপাতি ছিল না। আমরা চেষ্টা করেছি চট্টগ্রামেও এ ধরনের সেবা দিতে। হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হলে আধা ঘণ্টা, এক ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা না করলে রোগী মারা যেতে পারে। সে কারণে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ এখন সাত-আটটি জায়গায় ক্যাথ ল্যাব খোলা হয়েছে। সিএসসিআরেও আমরা হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞরা বসে, পরিকল্পনা করে উন্নতমানের একটি ক্যাথ ল্যাব বসিয়েছি। প্রতিদিন তাতে আট-দশ রোগীর চিকিৎসা হচ্ছে।

চট্টগ্রামে কি এখন হৃদ্‌রোগের শতভাগ চিকিৎসা সম্ভব?

কায়সার নসরুল্লাহ খান: ৯৫ ভাগ চিকিৎসা এখন চট্টগ্রামে হওয়া সম্ভব। তিন-চার বছরের মধ্যে শতভাগ চিকিৎসা এখানে হবে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মা ও শিশু হাসপাতাল, মেট্রোপলিটন হাসপাতাল, ম্যাক্স হাসপাতাল, এভারকেয়ার, ইম্পিরিয়াল অ্যাপোলো  হাসপাতাল এবং সিএসসিআর কার্ডিয়াক সেন্টারে চিকিৎসা হচ্ছে। সিএসসিআরের ক্যাথ ল্যাবে অতিরিক্ত দুটি যন্ত্র রয়েছে। এই যন্ত্র দুটি দিয়ে হৃদ্‌যন্ত্রের অধিকতর আধুনিক চিকিৎসা করা সম্ভব।