পাঠকের লেখা–৮৭
বায়েজিদ হারিকেনের সেই আলোটা আজও নেভেনি
প্রিয় পাঠক, প্রথম আলোয় নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে আপনাদের লেখা। আপনিও পাঠান। গল্প-কবিতা নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। আপনার নিজের জীবনের বা চোখে দেখা সত্যিকারের গল্প; আনন্দ বা সফলতায় ভরা কিংবা মানবিক, ইতিবাচক বা অভাবনীয় সব ঘটনা। শব্দসংখ্যা সর্বোচ্চ ৬০০। দেশে থাকুন কি বিদেশে; নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ পাঠিয়ে দিন এই ঠিকানায়: [email protected]
বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়নের বাদলপাড়া গ্রামে যেন খুব দ্রুত সন্ধ্যা নামত। সূর্য ডুবে যেত খরস্রোতা রাঙামাটি নদীর ওপারে। গ্রামজুড়ে নেমে আসত গভীর অন্ধকার।
আমার মা তখন হারিকেনটা জ্বালাতেন। সলতেটা একটু উসকে দিতেন। কাচের চিমনির ভেতরে হলুদ শিখাটা কেঁপে উঠত। ছোট ঘরটা ভরে উঠত নরম আলোয়।
ষাটের দশকের কথা বলছি। আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। ছিল না আশপাশের কোনো গ্রামেও। ওই একটা শিখাই ছিল আমাদের সন্ধ্যার সবকিছু।
হারিকেনটা ছিল বায়েজিদ মার্কা। গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরে থাকত বায়েজিদ হারিকেন।
চিমনিতে লেখা থাকত ‘মেড ইন ইংল্যান্ড’। কাচ ছিল স্বচ্ছ, গায়ে বাদুড়ের ছবি। প্রতিদিন বিকেলে আমি নিজের হাতে চিমনিটা পরিষ্কার করতাম। নরম কাপড় ভেতরে ঢুকিয়ে আগের রাতের কালি তুলতাম।
এখন আমার গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হয় না বললেই চলে। একবার, ২০১৪ সালে সম্ভবত গ্রামের বাড়ির ঘরের কোণে পুরোনো জিনিসের ভেতর থেকে একটা ভাঙা হারিকেন উদ্ধার করলাম। চিমনিটা নেই। গায়ে মরিচা পড়েছে। তবু ওটা ফেলতে পারিনি।
আমাদের ঘরটি ছিল দোতলা টিনের। আরও তিনখানা টিনের ঘর ছিল। আমরা ছিলাম তিন ভাই ও চার বোন।
সন্ধ্যার পর মা খুলে বসতেন সীতানাথ বসাকের ‘আদর্শলিপি’। আমি বসতাম মায়ের গা ঘেঁষে। মা অক্ষর চেনাতেন। তালপাতা সেদ্ধ করে শুকিয়ে রাখতেন। লোহার সুচালো কলম দিয়ে কেউ একজন পাতায় বাংলা আর ইংরেজি অক্ষর খোদাই করে দিতেন। আমি কয়লার গুঁড়া গুলে কালি বানাতাম। বাঁশের কঞ্চির কলম ডুবিয়ে খোদাই করা অক্ষরের ওপর হাত ঘোরাতাম।
শীতের রাতগুলো অন্য রকম ভালোলাগা নিয়ে হাজির হতো। জ্যোৎস্না রাতে জানালা দিয়ে ঘরে চাঁদের আলো ঢুকত। ঘরের ভেতরে হারিকেনের আলোর সঙ্গে মিশে যেত। মা বলতেন, চাঁদের বুকে এক বুড়ি সারা রাত চরকায় সুতা কাটেন। আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। ভাবতাম, সত্যিই কি কেউ ওখানে
বসে আছে?
শুধু ইলিশ নয়; নানা জাতের মাছ ছিল রাঙামাটি নদীতে। বাজারে অল্প দামে ভালো মাছ কেনা যেত। তখন কেউ সের হিসাবে মাছ কিনত না।
কোনো রাতে মা ভূতের গল্প ধরতেন। রাক্ষস, কানা ভূত, বোবা ভূত। নিশুতি রাতে তালগাছের মাথায় অদৃশ্য আত্মার বাসা। পুকুরপাড়ের বড় তালগাছটা তখন রহস্যময় হয়ে উঠত। কড়ইগাছের পাতায় বাতাস লাগলে ভয়ে বুক কেঁপে উঠত। মনে হতো, অচেনা কোনো ছায়া বুঝি নেমে এল।
আমরা ভাইবোনেরা গুটিসুটি মেরে বসতাম। কেউ চিমনির গায়ে হাত রাখত। কেউ মায়ের আঁচল শক্ত করে ধরত। একে একে হাত বাড়িয়ে দিতাম চিমনির দিকে। কাচের গা তেতে থাকত। আঙুলগুলো ধীরে ধীরে গরম হতো।
আমাদের বাড়ি থেকে রাঙামাটি নদী বেশি দূরে ছিল না। সন্ধ্যার পর নদীতেও হারিকেন জ্বলত। জেলেরা ছোট ছোট নৌকায় হারিকেন ঝুলিয়ে জাল ফেলতেন। কখনো খোট জাল, কখনো লম্বা টানা জাল। ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ উঠত। রুপালি ইলিশের ঝিলিকে নদীর বুক হেসে উঠত। আমি পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম। দূর থেকে মনে হতো, নদীর বুকে জোনাকিরা ভেসে বেড়াচ্ছে।
শুধু ইলিশ নয়; নানা জাতের মাছ ছিল রাঙামাটি নদীতে। বাজারে অল্প দামে ভালো মাছ কেনা যেত। তখন কেউ সের হিসাবে মাছ কিনত না।
এখন আমার গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হয় না বললেই চলে। একবার, ২০১৪ সালে সম্ভবত গ্রামের বাড়ির ঘরের কোণে পুরোনো জিনিসের ভেতর থেকে একটা ভাঙা হারিকেন উদ্ধার করলাম। চিমনিটা নেই। গায়ে মরিচা পড়েছে। তবু ওটা ফেলতে পারিনি।
২.
চরামদ্দি ডব্লিউ কে মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করলাম ১৯৬৭ সালে। ভর্তি হলাম বরিশাল বিএম কলেজে। সেখানে প্রথম বিদ্যুতের আলো দেখলাম।
এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি, সংসার, তিন মেয়ের জন্ম। দেখতে দেখতেই জীবনের বড় একটা পথ পেরিয়ে এলাম। এখন অবসরজীবন। দুই মেয়ে দেশের বাইরে, এক মেয়ে ঢাকায়। সবারই পরিবার হয়েছে।
এখন আমার গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হয় না বললেই চলে। একবার, ২০১৪ সালে সম্ভবত গ্রামের বাড়ির ঘরের কোণে পুরোনো জিনিসের ভেতর থেকে একটা ভাঙা হারিকেন উদ্ধার করলাম। চিমনিটা নেই। গায়ে মরিচা পড়েছে। তবু ওটা ফেলতে পারিনি।
আমাদের গ্রামটাও বদলে গেছে। এখন যেন ছোটখাটো শহর। মেঠো পথ পাকা রাস্তা হয়েছে। বাঁশের সাঁকোর জায়গায় হয়েছে কালভার্ট আর ব্রিজ। বাড়ির সামনের রাস্তার পাশে উঠেছে কয়েকটা টংঘর। সন্ধ্যার পর বৈদ্যুতিক আলোয় সেখানে চায়ের আড্ডা জমে।
আমি আজও চোখ বন্ধ করে দেখতে পাই সেই হলুদ শিখাটা। শুনতে পাই মায়ের স্নেহভরা কণ্ঠ।
সময় আমাকে অনেক দূরে নিয়ে এসেছে। কিন্তু বায়েজিদ হারিকেনের সেই আলোটা আমার ভেতরে আজও নেভেনি।
শাহজালাল ফিরোজ, সড়ক ২৭, ব্লক–এ, বনানী, ঢাকা