মানুষের মুখ, মানুষের প্রত্যাশা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে এমন নানা দেয়াল লিখন জনপ্রিয় হয়েছিলফাইল ছবি: প্রথম আলো

আদিলের মা এখনো সেই পাঁচ শ টাকার নোট সযত্নে রেখে দিয়েছেন। আদিল নিজের জমানো টাকা থেকে নোটটা মায়ের হাতে গুঁজে দিয়ে বলেছিল, ‘এই টাকাটা রাখো। বিকেলে আমরা গ্রিল খাব।’ সেই বিকেল আর আসেনি। ছাদে যাওয়ার কথা বলে ক্লাস টেনের ছেলেটা নেমে গিয়েছিল রাস্তায়। ফিরেছিল গুলিবিদ্ধ হয়ে, মৃত।

২০২৪–এর গণ–অভ্যুত্থানের কথা লিখতে বসলে আমার বারবার এই নোটটার কথা মনে পড়ে। গল্পটা আমি শুনেছি দেশে ফিরে, আদিলের মায়ের মুখে। যখন গণ–অভ্যুত্থান চলছিল, আমি তখন প্রবাসে। লাখ লাখ প্রবাসীর মতো ভয়ংকর একটা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম। ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেল। সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের খোঁজ নিতে পারছিলাম না। সরাসরি কল দিলেও কল যাচ্ছিল না। পরে খুঁজে বের করলাম, একটা নির্দিষ্ট সময়ে কল দিলে ভাঙা ভাঙা আওয়াজে কিছুটা কথা বলা যায়। শুধু এতটুকু নিশ্চিত হচ্ছিলাম যে তারা নিরাপদে আছে।

গুলিতে আহত হয়ে পড়ে যান এক আন্দোলনকারী। আরও একজনের সঙ্গে সড়ক বিভাজকের আড়ালে আশ্রয় নেন তিনি। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর উত্তরা পূর্ব থানার সামনে
ছবি: প্রথম আলো

এর মধ্যে দেশে ব্লক রেইড চলছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজা হচ্ছে ঘরে কোনো ছাত্র আছে কি না। জারি হলো কারফিউ। শুট অ্যাট সাইট অর্ডার। এর মধ্যেও প্রচণ্ড সাহস নিয়ে মানুষ রাস্তায় নামছিল। গুলির মুখেও পিছপা হচ্ছিল না। প্রতিনিয়ত হতাহতের খবর পাচ্ছিলাম। হাসপাতালে নিতে পারার আগেই মানুষ মারা যাচ্ছিল। কেউ গুলি খাওয়ার পর আমরা ডাক্তাররা যেভাবে রক্তপাত থামাই, সেটা তো রাস্তায় সম্ভব না। হাসপাতালের যন্ত্রপাতিও তো হাতের কাছে থাকবে না। তাহলে কারও বন্ধু গুলি খেলে, হাসপাতালে নেওয়ার আগপর্যন্ত সে তাকে বাঁচিয়ে রাখবে কীভাবে?

উত্তর খুঁজতে থাকলাম। সাধারণ ফার্স্ট এইডের জ্ঞান এখানে কাজে আসবে না। সেগুলো ধরেই নেয় যে অ্যাম্বুলেন্স আসবে, প্যারামেডিক প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে দিতে হাসপাতালে নিয়ে যাবে এবং হাসপাতালে পৌঁছালে ক্যাজুয়ালটি বা ট্রমা বিভাগ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কিন্তু যেখানে রাস্তায় গুলি চলছে, অ্যাম্বুলেন্স তো দূরের কথা, বরং রিকশায় বা সিএনজিতে করেও আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে নিতে বেগ পেতে হচ্ছে, সেখানে এসব প্রযোজ্য নয়।

এই পরিস্থিতির জন্য কী উপযুক্ত হবে, তা খুঁজছিলাম। একপর্যায়ে ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে একটা গবেষণাপত্র পেলাম: ‘ইম্প্রোভাইজড ফার্স্ট এইড টেকনিকস ফর টেররিস্ট অ্যাটাকস।’ কেউ গুলি খেলে কীভাবে হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ছাড়া ফার্স্ট এইড দেবে, সঙ্গে কী কী রাখবে, কোন উপায়ে হাসপাতালে যাওয়ার আগপর্যন্ত জীবন বাঁচাবে—সেই পদ্ধতি বলা আছে। এই গবেষণার সঙ্গে মেলাতে বসলাম আমাদের দেশের ফার্মেসিতে, মুদিদোকানে, ঘরে কী কী পাওয়া যায়। রক্ত বন্ধ করতে শিশুদের ডায়াপার, মেয়েদের স্যানিটারি প্যাড কীভাবে ব্যবহার করা যায়, ট্যাম্পন দিয়ে কী উপায়ে রক্ত বন্ধ করা যায়। প্রতিটা কৌশল মিলিয়ে দেখলাম নির্ভরযোগ্য উদাহরণের সঙ্গে। কারণ, এখানে ভুলের কোনো সুযোগ নেই। আমি যা বলব, তার ওপর হয়তো একটা মানুষের বাঁচা-মরা নির্ভর করবে।

উত্তর খুঁজতে থাকলাম। সাধারণ ফার্স্ট এইডের জ্ঞান এখানে কাজে আসবে না। সেগুলো ধরেই নেয় যে অ্যাম্বুলেন্স আসবে, প্যারামেডিক প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে দিতে হাসপাতালে নিয়ে যাবে এবং হাসপাতালে পৌঁছালে ক্যাজুয়ালটি বা ট্রমা বিভাগ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
তাসনিম জারা

আমার এখনো মনে আছে, এসব নিয়ে যখন পড়ছিলাম-লিখছিলাম, আমার হাত কাঁপছিল। ভিডিও শুট করার সময় হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছিল। লম্বা লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করতে হয়েছে। আমি কিছুতেই মানতে পারছিলাম না যে আমার দেশে এমন নির্বিচার দিনদুপুরে মানুষকে গুলি করা হচ্ছে। আমার দেশ তো কোনো যুদ্ধক্ষেত্র নয়। অথচ আমাকে মানুষকে বলতে হচ্ছে, তার পাশের মানুষটাকে গুলি করা হলে তাকে কীভাবে বাঁচাবে। আন্দোলনে যাওয়ার আগে ব্যাগে কী কী নিয়ে বের হবে, যাতে হাসপাতাল পর্যন্ত তাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারো।

ভিডিওগুলো কোটির বেশি মানুষ দেখেছিলেন। পরে অনেকে জানিয়েছেন, আন্দোলনে যাওয়ার আগে সকালবেলা ভিডিওগুলো দেখে বের হয়েছিলেন। ব্যাগে করে জিনিসগুলো নিয়ে গিয়েছিলেন। কয়েকজন জানিয়েছেন, সেই পরামর্শ কাজে লাগিয়ে বন্ধুর জীবন বাঁচাতে পেরেছেন। আবার কেউ বলেছেন, শেষ চেষ্টা করেও লাভ হয়নি। এই দ্বিতীয় দলের মানুষগুলোর কথা আমি ভুলতে পারি না। যুক্তরাজ্য থেকেই আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা নিয়ে কাজ করা শুরু করি।

এরপর দেশে এসে শহীদ পরিবার আর আহতদের কাছে গিয়েছি। পাশে থেকে চিকিৎসায় সাহায্য করার চেষ্টা করেছি যতটুকু পারি। আদিলের গল্পটা তখনই শোনা। যেদিন সে শহীদ হয়, তার আগের দিন সে মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আচ্ছা মা, এই যে এত মানুষ মারা যাচ্ছে। কে মারা গেল, সেটা মানুষ চেনে কী করে?’ মা বলেছিলেন, ‘ওদের সঙ্গে যে আইডি কার্ড থাকে, সেটা দেখেই খুঁজে বের করে।’ পরদিন সকালে আদিল মায়ের কাছে এসে বলল, ‘আম্মু, আমার আইডি কার্ডটা দাও তো।’ মায়ের মনে অজানা এক ভয় কাজ করছিল। তিনি কার্ডটা লুকিয়ে ফেললেন। সঙ্গে আইডি কার্ড ছিল না বলে গুলিবিদ্ধ ছেলেটাকে চিনে বের করতে দেরি হয়ে যায়। আদিলের মা এখনো আক্ষেপ করেন, ‘আমি যদি আইডি কার্ডটা লুকিয়ে না রাখতাম, আদিল ওটা নিয়েই বের হতো। হয়তো কেউ ওকে আগে চিনতে পারত! হয়তো আরেকটু আগে হাসপাতালে নিলে আমার ছেলেটাকে বাঁচানো যেত!’ আদিল যখন লাশ হয়ে ফেরে, তার এক হাতের কবজিতে বাঁধা ছিল ছোট্ট একটা জাতীয় পতাকা। পিঠে আরেকটা। সে প্রস্তুত হয়েই নেমেছিল।

আদিলের বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, নতুন বাংলাদেশের কাছে তাঁর চাওয়া কী। সন্তানহারা মানুষটি নিজের জন্য কিছুই চাইলেন না। চাইলেন তিনটি জিনিস।

ঠাকুরগাঁওয়ে দেখা হয়েছিল লামিমের সঙ্গে। বয়স পনেরো। মা–বাবা রাস্তায় নামতে মানা করেছিলেন। ৪ আগস্ট ফুটবল খেলার কথা বলে সে একাই যোগ দেয় আন্দোলনে। কেন? সে তার ভাইয়ের ফোনে দেখছিল, তার বয়সী ছেলেদের গুলি করা হচ্ছে। বিকেলে গুলি লাগে তার বাঁ চোখে। সেই চোখে সে আর দেখে না। ‘স্বপ্ন তো অনেক ছিল,’ লামিম আমাকে বলল, ‘কিন্তু এখন জানি না কী হবে। মনোযোগ দিতে পারি না ঠিকমতো।’ জানতে চাইলাম, দেশ নিয়ে ওর চাওয়া কী। সে বলল, ‘আমি চাই দেশ যাতে সুন্দর হয়। কোনো চুরি-বাটপাড়ি যাতে না থাকে।’ ১৫ বছরের একটা ছেলে, যার একটা চোখ রাষ্ট্র কেড়ে নিয়েছে, তার একমাত্র চাওয়া একটা সৎ দেশ।

আদিলের বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, নতুন বাংলাদেশের কাছে তাঁর চাওয়া কী। সন্তানহারা মানুষটি নিজের জন্য কিছুই চাইলেন না। চাইলেন তিনটি জিনিস।

প্রথমত, শহীদরা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নয়। তারা প্রাণ দিয়েছে এই দেশের জন্য। তারা গোটা দেশের। শহীদদের নিয়ে কোনো রাজনীতি করা যাবে না।

দ্বিতীয়ত, বিচারব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করতে হবে। দেশের যেকোনো সাধারণ মানুষ যেন সহজে ন্যায়বিচার পায়।

তৃতীয়ত, একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে, যেন দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়। কারণ, নির্বাচনব্যবস্থা ঠিক না থাকার কারণেই দেশকে এই মূল্য দিতে হলো।

আমি রাজনীতি করি। এই তালিকাটা আমি নিজের টেবিলে রেখে দিয়েছি। শহীদ-আহতদের নাম মুখে নেওয়া সহজ। কিন্তু নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষাগুলো পূরণ করা কঠিন। এই কঠিন পথেই আমাদের হাঁটতে হবে। আমাদের শহীদ ও আহতদের সাহসের মতোই সাহসী একটা দেশ আমরা গড়তে পারি কি না, এখন প্রশ্ন সেটা।

তাসনিম জারা: চিকিৎসক; রাজনৈতিক কর্মী