আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, তাই দেশে দাম বাড়ানোর বিকল্প ছিল না। ইরান যুদ্ধের আগে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের যে দাম ছিল, এখন সেই দামের চেয়ে বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। এর পাশাপাশি বেড়েছে জ্বালানি তেল পরিবহন খরচ। পাশাপাশি অন্যান্য আমদানি খরচও বেড়েছে। এখন হুতিদের কারণে আরও অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এমন অবস্থায় রোববার ডিজেল, পেট্রল, অকটেনের দাম বাড়ানো হয়েছে।
দেশে জ্বালানি তেলের দাম এখন কম রাখলে সরকারকে বেশি ভর্তুকি দিতে হবে। সরকারের আর্থিক সংগতি সেই অবস্থায় নেই। ডিজেলের দাম বেড়েছে। এই ডিজেল সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এর প্রভাবও বেশি।
বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের একটি নীতি আছে। ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে এই নীতি করা হয়। প্রতি মাসের ১ তারিখ একটি পদ্ধতি (ফরমুলা) অনুসরণ করে দাম নির্ধারণ করা হয়। প্রতিবারই যে দাম বাড়বে, তা নয়। বেশ কয়েকবার কমানোও হয়েছে। এবার মাসের ২০ তারিখ দাম বাড়ানো হলো। নির্ধারিত নীতি অনুসরণ না করে স্বেচ্ছাচারীভাবে সরকার দাম বাড়িয়েছে। সরকার এখানে নির্ধারিত নীতির পথে হাঁটেনি। এতে এই বার্তা যাচ্ছে যে নীতি অনুসরণ না করেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। ১ তারিখে জ্বালানি তেলের দাম ঠিক করে দেওয়া হলে পুরো মাসের পরিকল্পনা করা যায়।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ যেন অন্যরা নিতে না পারে। তেলের মূল্যবৃদ্ধি অনেকটা ছোঁয়াচে বিষয়। যেমন জিনিসপত্রের দাম বাড়বে—এটা প্রত্যাশার মধ্যে থাকে। তবে এই অজুহাতে যেন অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা তৈরি না হয়। ব্যবসায়ীরা একদিকে দাম বাড়াবেন, অন্যদিকে সরকারের কাছে এসে ভর্তুকি চাইবেন, এটি যেন না হয়। সার্বিকভাবে বাজার ব্যবস্থাপনার তদারকি বাড়াতে হবে। বাস–ট্রাকভাড়া যেন অযৌক্তিকভাবে না বাড়ে। মূল্যস্ফীতি যেন ছড়িয়ে না পড়ে, মূল্যস্ফীতি যেন বেশি না বাড়ে—সেদিকে নজর বাড়াতে হবে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির শঙ্কা মাথায় রেখে মুদ্রানীতি নিয়েও ভাবা উচিত। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এখন মুদ্রানীতিতে কিছুটা ছাড় দেওয়ার মনোভাবের মধ্যে আছে সরকার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ মূল্যস্ফীতি সামাল দিতে মুদ্রানীতি কঠোর করছে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও কঠোর অবস্থানে যাওয়া যায় কি না, তা বিবেচনা করা যেতে পারে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, এটাই প্রত্যাশিত। গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষ যেন বাড়তি মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে পারে, সে জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাড়ানোর মতো আর্থিক সংগতি এই মুহূর্তে সরকারের নেই। এত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। তাই বিদ্যমান কর্মসূচির সুবিধা যেন প্রকৃত সুবিধাভোগীরা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে
*জাহিদ হোসেন: সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়