হামের টিকা নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য বনাম বাস্তবতা: কোথায় বিভ্রান্তি, কোথায় সংকট

সরদার সাখাওয়াত হোসেনফাইল ছবি

বেসরকারি চাকরিজীবী শামীমা নাসরিনের মেয়েটির বয়স ৪ বছর। জন্মের পর থেকে শিশুদের যতগুলো টিকা নিতে হয়, তার সবই দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে হামের টিকাও ছিল। কিন্তু তিনি এখন দ্বিধাগ্রস্ত, আদৌ কি তাঁর মেয়ে হামের টিকা পেয়েছিল? নাকি হামের টিকার নাম করে অন্য টিকা দেওয়া হয়েছিল!

শামীমা নাসরিনের এই দ্বিধা ও শঙ্কার কারণ নতুন সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেনের সাম্প্রতিক এক বক্তব্য। গত রোববার রাজধানী ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, আট বছর আগে দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর দেওয়া হয়নি।

ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ করেন রুমানা বেগম, থাকেন পান্থপথের পাশের বৌবাজার এলাকায়। তাঁর ছোট মেয়েটির বয়স এখন ৩ বছর। জানালেন, ৯ মাস বয়সে তিনি মেয়েকে হামের টিকা দিয়েছেন।

আরও পড়ুন
ঈদের আগে হাসপাতালে ভর্তি হয় নরসিংদী থেকে আসা ৬ মাসের শিশু মোহাম্মদ। হামে আক্রান্ত হয়ে সে রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। রোববার বিকেলে
ছবি: প্রথম আলো

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এ বক্তব্য শামীমা নাসরিন বা রুমানা বেগমের মতো অনেক অভিভাবককেই দ্বিধান্বিত করেছে, করেছে শঙ্কিত। কারণ, দেশে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। চলতি মাসেই হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৫০টির বেশি শিশু। হাসপাতালগুলোয় রোগীর চাপ বাড়ছে। এ প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য নানা মহলে প্রশ্ন তুলেছে।

মন্ত্রীর এ বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং জনমনেও বিভ্রান্তি বাড়তে থাকে। কিন্তু তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিষয়টি এত সরল নয়।

মন্ত্রী আসলে কী বলেছেন

গত রোববার বাংলাদেশ–চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক ওষুধশিল্প মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আট বছর আগে হাম টিকা দেওয়া হয়েছিল, এরপর আর দেওয়া হয়নি।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ছিল—বর্তমানে হামের রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং নতুন করে টিকা কেনার উদ্যোগ।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এ বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনা–সমালোচনা হচ্ছে।

আরও পড়ুন
হামে আক্রান্ত বা হামের লক্ষণ নিয়ে ভর্তি শিশুদের জন্য আইসোলেশন ওয়ার্ড করা হয়েছে। সেখানে উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। সোমবার রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতলে
ছবি: প্রথম আলো

তথ্য–উপাত্ত বলছে, টিকাদান বন্ধ ছিল না

সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১২ মাস বয়সী শিশুদের হামসহ নানা টিকাদানের হার ছিল সর্বনিম্ন ৮৯ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ১০৩ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে সর্বনিম্ন ৮৯ দশমিক ৪ শতাংশ ছিল ২০১৮ সালে। আর সর্বোচ্চ ছিল ২০২২ সালে—১০৩ দশমিক ৬ শতাংশ। কিন্তু ২০২৪ সালে টিকাদানের হার কমে যায়, নেমে আসে ৮৬ দশমিক ৬ শতাংশে। আর গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে এ হার অনেক কমে গিয়ে হয় ৫৯ দশমিক ৬ শতাংশ।
অর্থাৎ নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি চালু ছিল এবং টিকাদানের উচ্চহার বজায় ছিল অন্তত ২০২৩ সাল পর্যন্ত।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো রুটিন টিকাদান (ইপিআই) এবং আর বড় আকারের ক্যাম্পেইন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মন্ত্রী হয়তো বড় ক্যাম্পেইনের কথা বলেছেন, কিন্তু সেটিকে ‘টিকা দেওয়া হয়নি’ হিসেবে উপস্থাপন করা বিভ্রান্তিকর। তবে বড় আকারের ক্যাম্পেইনও কিন্তু হয়েছে ২০২০ সালে ডিসেম্বর মাসে। ওই সময় হাম ও রুবেলার টিকাদানের কর্মসূচি ছিল দেশজুড়ে। অর্থাৎ মন্ত্রী যদি বড় আকারের ক্যাম্পেইনের কথাও বলেন, তা–ও ঠিক নয়।

অথচ গতকাল সোমবার মন্ত্রী আবার বলেছেন, ‘২০১৮ সালে একটা ক্যাম্পেইন হয়েছে, এরপর কোনো ক্যাম্পেইন হয়নি। এখন যে মিজেলসগুলো (হাম) হচ্ছে, ওদের মধ্যে যে আউটব্রেক (প্রাদুর্ভাব) হয়েছে, যারা ভ্যাকসিনেটেড নয়, তাদের মধ্যে বেশি করে, মারাত্মকভাবে মিজেলসটা দেখা দিয়েছে।’

২০২০ সালের ডিসেম্বরে প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, হাম ও রুবেলার টিকা দেওয়ার ক্যাম্পেইন শুরু হয় ওই বছরের ১২ ডিসেম্বর, তা চলে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

খোদ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কথাতেও মন্ত্রীর বিপরীত বক্তব্য এসেছে। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আজই কথা হয় সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছরই বাংলাদেশে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে, কোনো বছরই বাদ যায়নি।’


অর্থাৎ সরকারি বাস্তবায়ন পর্যায়ের তথ্য মন্ত্রীর বক্তব্যকে সমর্থন করে না।

তাহলে কেন হঠাৎ হাম বাড়ছে

এখানেই আসল সংকট। ২০২৫ সালে এসে দেখা যাচ্ছে, টিকাদানের হার ৬০ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। বিসিজি টিকাদানে ঘাটতির হার ১৩ দশমিক ২ শতাংশ।

দেশের খ্যাতিমান শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, গত দেড় বছরে টিকাদান কর্মসূচির ক্ষেত্রে আগের হার বজায় রাখা হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম এমন সংক্রামক রোগ যে এর ক্ষেত্রে হার্ড ইমিউনিটি বজায় রাখতে হলে ৯৫ শতাংশের বেশি কভারেজ বা টিকাপ্রাপ্ত রোগীর হার বজায় রাখা দরকার। কভারেজ ৭০ শতাংশের নিচে নামলে প্রাদুর্ভাব প্রায় অনিবার্য।

এ থেকে ধারণা করা যায়, সমস্যা ‘৮ বছর টিকা না দেওয়া’ নয়, বরং সাম্প্রতিক কভারেজে–ঘাটতির বড় কারণ সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে।

সম্ভাব্য কারণগুলো কী

বিশ্লেষকদের মতে, হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে।

এর মধ্যে আছে কোভিড মহামারি-পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবার ব্যাঘাত, শহরের বস্তি ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টিকাদানে ফারাক।

মাইগ্রেশন ও ‘টিকা না পাওয়া’ শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি, নিয়মিত মনিটরিংয়ের ঘাটতি। এর ফলে একটি ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে।

দেশে শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয় দুবার—প্রথমবার ৯ মাস এবং দ্বিতীয়বার ১৫ মাস বয়সে। ধরা হয়, একটি শিশু তার মায়ের শরীরের ইমিউনিটির কারণে ৯ মাসের আগে হামে আক্রান্ত হবে না বা সুরক্ষা পাবে। এখন দেখা যাচ্ছে, ৯ মাসের আগের একাধিক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। তাই টিকাদানের সময়ের ক্ষেত্রে পরিবর্তন দরকার কি না, তা পর্যালোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন জনস্বাস্থ্যবিদ বেনজির আহমেদ।

মন্ত্রীর বক্তব্যের প্রভাব: কেন এটা গুরুত্বপূর্ণ

যে মায়েরা তাঁদের শিশুদের সাম্প্রতিক সময়ে টিকা দিয়েছেন, যাদের কার্ড আছে, তাদের ভীত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে মন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে জনস্বাস্থ্য যোগাযোগে ভুল বার্তা বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞেরা।

তাঁরা বলছেন, যদি মানুষ মনে করে বহু বছর টিকা দেওয়া হয়নি, তাহলে টিকাদান কর্মসূচির ওপর আস্থা কমতে পারে, বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে এবং নীতিনির্ধারণে ভুল দিকনির্দেশনা আসতে পারে।

অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বলেন, ‘মন্ত্রীর কথা মাঠপর্যায়ে যাবে। আমাদের দেশের যে সংস্কৃতি, উচ্চ মহলের কথা মাঠের কর্মীরা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে থাকে, সত্য-মিথ্যা যা–ই হোক। এখন তাই টিকা থাকলেও না থাকার কথা বলা হতে পারে। আরেকটি কথা হলো, মন্ত্রী হলেন একটি মন্ত্রণালয়ের প্রধান। তিনি যখন কোনো কথা বলেন, তখন পর্যাপ্ত তথ্য দিয়ে কথা বলা উচিত। এটা তাঁর দায়িত্ব।’