একক বক্তৃতায় অধ্যাপক ফায়েক উজ্জামান
মুজিবনগর সরকার ‘অস্থায়ী’ নয়, বাংলাদেশের প্রথম স্থায়ী সরকার
মুজিবনগর সরকারকে বাংলাদেশের প্রথম বৈধ ও স্থায়ী সরকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ফায়েক উজ্জামান। তিনি বলেছেন, এই সরকারকে প্রায়ই ‘অস্থায়ী সরকার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, কিন্তু এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। মুজিবনগর সরকারের ধারাবাহিকতা আজও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে বহমান।
বাংলাদেশের ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরতে মুজিবনগর দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে একক বক্তৃতা দেন অধ্যাপক ফায়েক উজ্জামান। ‘মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকার: গঠন ও তাৎপর্য’ শীর্ষক অনুষ্ঠানটি আজ শুক্রবার বিকেলে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সেমিনার হলে অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানোর পর ১০ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়। এরপর ১৭ এপ্রিল তৎকালীন মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে (মুজিবনগর) স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথ গ্রহণ করে। দিনটি উপলক্ষে প্রতিবছর সরকারি নানা আয়োজন থাকলেও এবার কোনো কর্মসূচি পালিত হচ্ছে না। মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।
অধ্যাপক ফায়েক উজ্জামান বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গঠিত মুজিবনগর সরকার কোনো অন্তর্বর্তী বা সাময়িক ব্যবস্থা ছিল না; বরং এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সূচনা। ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তীতে এর কার্যক্রম প্রমাণ করে যে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সরকার হিসেবে কাজ করেছে। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, প্রশাসনিক কাঠামো এবং সামরিক নেতৃত্বের বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত ছিল, যা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সরকারের বৈশিষ্ট্য বহন করে।
মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করা মুজিবনগর সরকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল উল্লেখ করে এই অধ্যাপক বলেন, পাশাপাশি প্রশাসনিক কাঠামো গঠন, আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়, অর্থ সংগ্রহ, শরণার্থীদের ব্যবস্থাপনা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ—সবকিছুই একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রের সরকারের মতোই পরিচালিত হয়েছে। যুদ্ধকালীন প্রায় এক কোটি শরণার্থীর খাদ্য, আশ্রয় ও ন্যূনতম সেবার ব্যবস্থা করা এবং সংগঠিতভাবে প্রশিক্ষণ ও সশস্ত্র লড়াই পরিচালনা করা—এসবই সরকারের কার্যকর উপস্থিতির প্রমাণ।
অধ্যাপক ফায়েক উজ্জামান বলেন, কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও এই সরকারের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জনমত গঠন, বিদেশে অবস্থানরত বাঙালি কূটনীতিকদের বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য প্রকাশের আহ্বান এবং আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জনের প্রচেষ্টা—এসব উদ্যোগ একটি সক্রিয় রাষ্ট্রীয় সরকারের বৈশিষ্ট্যই তুলে ধরে। একই সঙ্গে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে জনমত গঠন এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন পরিচালনা ছিল সরকারের পরিকল্পিত কার্যক্রমের অংশ।
যুদ্ধকালে মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে সামরিকভাবে দেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে যুদ্ধ পরিচালনা এবং তার পাশাপাশি বেসামরিক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয় বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক ফায়েক উজ্জামান। তিনি বলেন, এই সমন্বিত ব্যবস্থা প্রমাণ করে যে সরকারটি কেবল যুদ্ধ পরিচালনাই করেনি, বরং একটি রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।
মুজিবনগর সরকারের ধারাবাহিকতার প্রসঙ্গ তুলে এই শিক্ষক বলেন, ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে যে প্রশাসনিক পরিবর্তন ঘটে, তা পূর্ববর্তী সরকারেরই ধারাবাহিক রূপান্তর। অর্থাৎ মুজিবনগর সরকার বিচ্ছিন্ন কোনো অধ্যায় নয়, বরং বর্তমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভিত্তি। এটি ছিল বাংলাদেশের প্রথম সরকার, যা যুদ্ধকালীন বাস্তবতায় প্রতিষ্ঠিত হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার সব মৌলিক বৈশিষ্ট্য বহন করেছে এবং স্বাধীন বাংলাদেশের ভিত্তি নির্মাণে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে।
স্বাধীনতার ঘোষণা
অধ্যাপক ফায়েক উজ্জামান বলেন, ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তারপর সেটা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তারপর জিয়াউর রহমান ২৭ তারিখে ঘোষণা দেন প্রভিশনাল হেড অব বাংলাদেশ বলে এবং এরপর জিয়াউর রহমান এই ঘোষণা পরিবর্তন করে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে আবার দেন।
মুজিবনগর সরকার গঠন একটি ‘নির্ধারক’ অধ্যায় ছিল
বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাসে মুজিবনগর সরকার গঠন একটি ‘নির্ধারক’ অধ্যায় ছিল বলে উল্লেখ করেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারওয়ার আলী। অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের এপ্রিলের ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহ—বিশেষ করে ১০ এপ্রিল সরকার গঠন ও পরবর্তী সময়ে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় শপথ—মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত ও কাঠামোবদ্ধ রূপ দেয়।
মুজিবনগর সরকারের কাজের কথা উল্লেখ করে সারওয়ার আলী বলেন, এই অস্থায়ী সরকার কেবল যুদ্ধ পরিচালনাই করেনি; একই সঙ্গে রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিমালা নির্ধারণ করে। ঘোষণাপত্রে যে তিনটি ভিত্তি স্পষ্ট করা হয়েছিল—সমতা, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র—তা আজও বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
মুজিবনগর শুধু একটি স্থান নয়, বরং স্বাধীনতার সাক্ষ্যবাহী এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক বলে উল্লেখ করেন সারওয়ার আলী। সে জন্য এই স্থানের সংরক্ষণ ও সংস্কার অত্যন্ত জরুরি উল্লেখ করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পক্ষ থেকে তিনি রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, মুজিবনগরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো যথাযথভাবে সংস্কার করে পূর্বের মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি সামগ্রিকভাবে জাতির দায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকার নিয়ে জাদুঘরের শ্রুতি-দৃশ্য কেন্দ্রনির্মিত তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কর্মসূচি নিয়ে ব্যবস্থাপক (কর্মসূচি) রফিকুল ইসলামের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন শিল্পী শিরিন ইসলাম ও ইকবাল খোরশেদ জাফর।