ছোটবেলা থেকে খেলাধুলা করতে পছন্দ করতেন মারিয়া। স্কুল-কলেজে দৌড়ে চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। ব্যাডমিন্টন, গোলক নিক্ষেপ, দীর্ঘ লম্ফ, উচ্চ লম্ফসহ বিভিন্ন খেলায় পেতেন পুরস্কার। কিন্তু শিক্ষার্থী থাকাকালে খেলাধুলা বন্ধ করে দিতে হয় মারিয়াকে। হঠাৎ ছেদ পড়ে মারিয়ার দুরন্ত চলাফেরায়। কারণ, চট্টগ্রামের মেয়ে মারিয়া ‘লুপাস’ নামের এক রোগে আক্রান্ত হন।
মারিয়া আফেন্দীর বয়স ২৯ বছর। এই রোগের সঙ্গে লড়াই করতে করতেই তিনি আইন বিষয়ে স্নাতক করেছেন।
চার দশকের বেশি সময় আগে বাংলাদেশে লুপাসের কথা প্রথম জানা যায়। তবে আজও মানুষ রোগটি সম্পর্কে বেশি কিছু জানেন না। নিজে আক্রান্ত হওয়ার আগে মারিয়াও রোগটি সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। তবে আক্রান্ত হওয়ার পর মারিয়া লুপাস নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন। রোগটি সম্পর্কে মানুষকে জানানোর চেষ্টা করছেন। ১১ বছর ধরে লুপাসের সঙ্গে লড়াই চালানোর কথা সবাইকে বলছেন।
লুপাস কী, কার হয়
লুপাসের পুরো নাম সিস্টেমিক লুপাস ইরাইথ্রোমেটোসিস বা এসএলই। রোগটিতে নারীরা বেশি আক্রান্ত হন। সাধারণত ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী নারীরা লুপাসে আক্রান্ত হন বেশি। বয়সটি মেয়েদের প্রজননক্ষম সময়ও। নারী ও পুরুষের আক্রান্ত হওয়ার অনুপাত ৯: ১।
এই রোগের বিষয়ে আরও সহজ করে বললেন লুপাস ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ রিউম্যাটোলজি সোসাইটির সভাপতি সৈয়দ আতিকুল হক। তিনি বলেন, মানুষের শরীরে নিজস্ব রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা আছে। শরীরে কোনো জীবাণু প্রবেশ করলে এ ব্যবস্থা নিজে থেকে তা প্রতিরোধ করে। কিন্তু কোনো কোনো মানুষের ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা নিজেই রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, শারীরিক সমস্যা সৃষ্টি করে, এটাই লুপাস। অর্থাৎ, লুপাস আক্রান্ত ব্যক্তির রোগ প্রতিরোধক্ষমতা (ইমিউন সিস্টেম) নিজের শরীরের বিরুদ্ধে কাজ করে।
এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, লুপাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ত্বক, রক্তকণিকা, গিরা, কিডনি, ফুসফুস ও মস্তিষ্ক আক্রান্ত হতে পারে। এ রোগের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—গিরায় গিরায় ব্যথা, জ্বর, ত্বকে ফুসকুড়ি, শরীরে পানি জমে ফুলে যাওয়া (বিশেষ করে হাত ও পা), অস্থির লাগা, প্রচণ্ড ক্লান্তি অনুভব করা প্রভৃতি। লুপাস কেন হয়, তা এখনো অজানা। রোগটি পুরোপুরি সেরে যায় না। তাই নিয়মিত চিকিৎসা দিয়ে রোগীকে ভালো রাখার চেষ্টা করা হয়।
মারিয়ার লড়াইয়ের গল্প
৯ জুলাই রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে বসে মারিয়া আফেন্দীর সঙ্গে কথা হয়। পরে তাঁর সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনেও কথা হয়েছে। মারিয়া বলেন, ২০১২ সালে তিনি লুপাসে আক্রান্ত হন। হঠাৎ একদিন প্রচণ্ড জ্বর আসে তাঁর। এরপর মুখে ঘা, দাঁতের মাড়িতে রক্তক্ষরণ হয়। আর ছিল গিরায় গিরায় ব্যথা। এত তীব্র ব্যথা ছিল যে বিছানা থেকে উঠে বসতে পারতেন না।
লুপাসের বিরুদ্ধে লড়তে দ্রুত রোগ শনাক্ত হওয়া ও সঠিক চিকিৎসা জরুরি। দেশেই এর আধুনিক চিকিৎসা রয়েছে।
এরপর চিকিৎসক দেখান মারিয়া। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাঁর শরীরে লুপাস ধরা পড়ে। মারিয়া বলেন, ‘তখন আমি আইন বিষয়ে স্নাতকে পড়ছি। অসুস্থতার কারণে মাথার সব চুল পড়ে যায়। একের পর এক শারীরিক জটিলতা ভোগাতে শুরু করে। ২০১৪ সালে অ্যাভাসকুলার নেক্রোসিসে আক্রান্ত হই। এর ফলে নিতম্বের হাড়ের টিস্যু ক্ষয়ে যেতে শুরু করে।’
ওই সময়কার শারীরিক যন্ত্রণার কথা বলতে গিয়ে মারিয়া বলেন, ‘তখন দাঁড়াতেও কষ্ট হতো। মনে হতো, কেউ আমাকে শূলের ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। অসহ্য যন্ত্রণায় ছয় মাস বিছানায় পড়ে ছিলাম। বড় ভাই কোলে করে বাথরুমে নিয়ে যেতেন। ২০১৭ সালে কিডনিও আক্রান্ত হয়।’
অসুস্থতার কারণে পড়াশোনায় ছেদ পড়ে মারিয়ার, তবে হাল ছাড়েননি তিনি। তীব্র শারীরিক কষ্টের মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। টানা কয়েক বছরের বিরতির পর ২০১৮ সালে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবিতে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক শেষ করেন তিনি।
বিয়ে-লড়াই-বিচ্ছেদ
লুপাসে আক্রান্ত মারিয়ার হাঁটতে কষ্ট হয়। ক্রাচে ভর দিয়ে চলাফেরা করতে হয় তাঁকে। তবে অসুস্থতার বিষয়ে কখনোই লুকোছাপা করেননি তিনি। ক্রাচে ভর দিয়ে চলাফেরার ছবি ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। মারিয়া বলেন, ‘আমি কেন লুকাব? রোগ নিয়ে লজ্জার তো কিছু নেই।’
২০১৭ সালে বিয়ে হয় মারিয়ার। পাত্র পেশায় চিকিৎসক। বিয়ের আগে পাত্রপক্ষকে মারিয়ার অসুস্থতার কথা জানানো হয়। তাদের আপত্তি না থাকায় পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়ে যায় মারিয়ার। অসুস্থতার বিষয়ে স্বামী তাঁকে কখনো কিছু বলেননি। কিন্তু শাশুড়ি মেনে নিতে চাইতেন না। কথা শোনাতেন। বলতেন, ‘ল্যাংড়া-আতুর’ মারিয়ার জন্য তাঁর চিকিৎসক ছেলের সম্মান নষ্ট হচ্ছে।
শাশুড়ির চাওয়া ছিল, মারিয়া যাতে ক্রাচে ভর দিয়ে চলাফেরার ছবি ফেসবুকে আপলোড না করেন। কিন্তু মারিয়া তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে লুকোছাপা করতে চাইতেন না। অন্যদিকে তাঁর স্বামী নিজে কিছু না বললেও চাইতেন তিনি যেন শাশুড়ির কথা মেনে চলেন। এ নিয়ে সংসারে অশান্তি দেখা দেয়। ২০১৯ সালে মারিয়ার বিচ্ছেদ হয়।
নিজেকে ‘যোদ্ধা’ ভাবেন মারিয়া
লুপাসে আক্রান্ত মারিয়া নিজেকে একজন ‘যোদ্ধা’ হিসেবে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘ক্রাচে ভর করে চলাফেরা করতে দেখে অনেকেই প্রশ্ন করেন। মন খারাপ করি না। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ক্রাচ নিয়ে যাই। কারণ, আমি মনে করি, আমার স্বাস্থ্য সবকিছুর আগে।’
অসুস্থতা, পড়াশোনা ও লুপাসের বিরুদ্ধে নিজের লড়াইয়ের বিষয়ে মারিয়া বলেন, ‘আমার সহপাঠীদের অনেক আগেই পড়াশোনা শেষ হয়ে গেছে। আমি বয়সে ছোটদের সঙ্গে ক্লাস করেছি, পরীক্ষা দিয়েছি। এত বাধা আমাকে দমাতে পারেনি, এটা ভেবে গর্ব করি। দেশেই লুপাসের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে কীভাবে লড়তে হবে, টিকে থাকতে হবে, সেসব শিখে গেছি।’
মারিয়ার ‘MAP's দিন কাল’ নামের একটি ফেসবুক পেজ রয়েছে। এতে তিনি লুপাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মনোবল বাড়াতে কাজ করছেন। আক্রান্ত ব্যক্তিরা রোগটির সঙ্গে কীভাবে লড়বেন, ভালো থাকবেন—এসব নিয়ে সচেতন করছেন। তিনি বলেন, লুপাসের চিকিৎসা কিছুটা ব্যয়বহুল। এর পেছনে আমার পরিবারের প্রতি মাসে ১২ হাজার টাকা ব্যয় হয়। তাই লুপাসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আলাদা একটি তহবিল গঠন করলে ভালো হয়।
পরিবারের সহায়তা জরুরি
লুপাসে আক্রান্ত আরেকজন নারীর সঙ্গে কথা হয়। তাঁর বয়স ৪৭। তবে তিনি নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে চাইলেন না। ওই নারী জানান, এসএসসি পরীক্ষার সময় তাঁর লুপাস শনাক্ত হয়। এরপর লড়াই শুরু হয়। তবে পড়াশোনা ছাড়েননি। উচ্চ শিক্ষিত হয়ে শিক্ষকতায় যুক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু শরীরে অসহ্য ব্যথার কারণে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন তিনি।
ওই নারী বলেন, শুরু থেকে পরিবারের সদস্যরা সব সময় পাশে ছিলেন। স্বামী সমর্থন জুগিয়েছেন। এ রোগের বিরুদ্ধে লড়তে পরিবারের সদস্যরা পাশে না থাকলে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।
দেশে রোগী কত
লুপাস ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব ফারহানা ফেরদৌস বলেন, বর্তমানে দেশে আনুমানিক দুই লাখ লুপাস রোগী রয়েছেন। প্রতিবছর নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে প্রায় দুই হাজার ৫০০ মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বরাত দিয়ে তিনি আরও বলেন, বর্তমানে বিশ্বে লুপাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। প্রতিবছর নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রায় এক লাখ মানুষ।
শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে
আগে মনে করা হতো লুপাসে শুধু নারীরা (বিশেষত তরুণীরা) আক্রান্ত হন। কিন্তু শিশুদেরও এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায় বলে জানান বাংলাদেশ শিশু রিউম্যাটোলজি সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শাহানা আখতার রহমান। তিনি বলেন, ‘বিশ্বে লুপাসে আক্রান্ত মোট রোগীর ২০ থেকে ৩০ শতাংশ শিশু। এর মধ্যে মেয়েশিশু বেশি। আমি ৯ মাসের এক মেয়েশিশুর চিকিৎসা করেছি। তবে ১০ থেকে ১২ বছরের শিশুদের লুপাসে আক্রান্ত হতে বেশি দেখা যায়।’
বড়দের চেয়ে শিশুদের লুপাসের লক্ষণ কিছুটা ভিন্ন। শাহানা আখতার রহমান বলেন, লুপাসে আক্রান্ত শিশুদের ঘন ঘন জ্বর হয়। শিশুরা ক্ষুধামান্দ্য ও অস্থিরতায় ভোগে। ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ শিশুর মস্তিষ্ক, রক্তকোষ, কিডনি, ফুসফুসসহ অন্যান্য অঙ্গ আক্রান্ত হতে দেখা যায়।
লুপাসের বিরুদ্ধে লড়তে দ্রুত রোগ শনাক্ত হওয়া ও সঠিক চিকিৎসা জরুরি বলেন শাহানা রহমান। দেশেই এর আধুনিক চিকিৎসা রয়েছে বলেন তিনি। করোনা মহামারির দুই বছরে অনেক রোগী চিকিৎসক দেখাতে পারেননি। অনেকে চিকিৎসা থেকে ঝরে পড়েছেন। পরে তাঁদের অসুস্থতা গুরুতর পর্যায়ে চলে গেছে।
চিকিৎসা পাবেন যেখানে
দেশে ৯টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাসপাতালে লুপাস ক্লিনিক রয়েছে। এসব জায়গায় স্বল্পমূল্যে লুপাসের চিকিৎসা দেওয়া হয়। লুপাস ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুসারে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বহির্বিভাগের লুপাস ক্লিনিকে প্রতি রবি ও মঙ্গলবার রোগী দেখা হয়। একই হাসপাতালে রিউম্যাটোলজিক্যাল ক্লিনিকে প্রতি বুধবার লুপাস আক্রান্ত শিশুদের দেখা হয়।
অন্যদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লুপাস ক্লিনিকে প্রতি শনি ও বুধবার রোগী দেখা হয়। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতি সোম ও বুধবার, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে প্রতি রবি ও বুধবার রোগী দেখা হয়। এ ছাড়া রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বরিশাল, ফরিদপুর ও সিলেটের সংশ্লিষ্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লুপাস রোগী দেখা হয়।
রোগীরা জানান, লুপাসের চিকিৎসা করতে গিয়ে তাঁদের কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। জরুরি সময়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাওয়া যায় না। মানসম্পন্ন ওষুধের স্বল্পতা রয়েছে। আধুনিক চিকিৎসাসুবিধা মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। তাই সারা দেশের সরকারি হাসপাতালে স্বল্পমূল্যে লুপাসের চিকিৎসা চালু করা প্রয়োজন।