ভারত–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল নিয়ে প্রত্যাশার কথা জানাল বাংলাদেশ
ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগর ঘিরে কয়েক বছর ধরে বেড়ে চলা ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কে বিভিন্ন দেশের কৌতূহল ছিল। বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত আজ সোমবার বিকেলে ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগর ঘিরে রূপরেখা ঘোষণা করেছে। ১৫ দফার ওই রূপরেখায় মূলত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির স্বার্থে নিরাপত্তা পূর্বশর্ত—এই বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এই অঞ্চল ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় কোনো পক্ষে ঝুঁকে না পড়ার বিষয়ও এতে স্পষ্ট করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরের ঠিক আগের দিন আনুষ্ঠানিকভাবে এই রূপরেখা ঘোষণা হলো। রূপরেখায় বাংলাদেশ এই অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট সবার সমৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি অবাধ, উন্মুক্ত, শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিকের ধারণা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফর উপলক্ষে আজ সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় রূপরেখা চূড়ান্ত হওয়ার ঘোষণা করেন।
ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগর ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ২০১৭ সালে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস) ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত এই উদ্যোগে জাপান, ভারত ও অষ্ট্রেলিয়া যুক্ত আছে। আইপিএসকে এই অঞ্চলে চীনের অগ্রগতিকে প্রতিহত করার প্রয়াস বলে মনে করে বেইজিং। ২০১৮ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে আইপিএসের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার কথা বলে আসছে।
আইপিএস নিয়ে এ অঞ্চলে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, আসিয়ান সদস্যসহ সবাই তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি ও সম্প্রতি কানাডা তাদের কৌশল ঘোষণা করেছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরের আগে বাংলাদেশের ভারত মহাসাগরীয় রূপরেখা ঘোষণা তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশ ২০১৬ সালে সমঝোতা স্মারক সইয়ের মধ্য দিয়ে চীনের অঞ্চল ও পথের উদ্যোগে (বিআরআই) যুক্ত হয়েছিল। এবার টোকিও সফরে বাংলাদেশ যে আইপিএস নিয়ে নিজেদের অবস্থান চূড়ান্ত করেছে, সেই বার্তা দেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে শাহরিয়ার আলম বলেন, বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধিকে তার ‘ভিশন ২০৪১’ বাস্তবায়ন তথা ২০৪১ সালের মধ্যে একটি আধুনিক, জ্ঞানভিত্তিক, উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করে। বৈশ্বিক জিডিপিতে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামষ্টিক অংশ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অগ্রগণ্য অবস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সামগ্রিক কার্যক্রম এবং প্রযুক্তি খাতের গতিশীল বিকাশ বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি টেকসই অর্থনীতি ও সমৃদ্ধি অর্জনে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ তাই এই অঞ্চলের সংশ্লিষ্ট সবার সমৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি অবাধ, উন্মুক্ত, শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ধারণা বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, রূপরেখা চূড়ান্ত করার সময় বাংলাদেশ চারটি মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ করেছে। এগুলো হচ্ছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’; বাংলাদেশ সংবিধান অনুসারে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূলনীতিসমূহ; সমুদ্র আইনসংক্রান্ত জাতিসংঘ সনদ ১৯৮২-সহ প্রযোজ্য জাতিসংঘের চুক্তিসমূহ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সনদসমূহ মেনে চলা এবং টেকসই উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা, মানবিক কার্যক্রম এবং মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে গঠনমূলক আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, চারটি মৌলিক নীতিমালার আলোকে বাংলাদেশ ১৫টি অভিলক্ষ্যের মাধ্যমে রূপরেখা এবং এ-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের ভারত মহাসাগরীয় রূপরেখায় এ অঞ্চলের শান্তি, সমৃদ্ধি, নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সম্মান অক্ষুণ্ন রাখা, অংশীদারত্ব ও সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ এবং সংলাপ ও বোঝাপড়ার ওপর গুরুত্বারোপ।
এই অঞ্চলের সামুদ্রিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তার বিদ্যমান কাঠামোকে শক্তিশালীকরণ, যেমন সমুদ্রে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আনক্লস, ১৯৮২-সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আন্তর্জাতিক আইন ও সনদ অনুযায়ী অবাধ সামুদ্রিক চলাচল ও কোনো দেশের ভূখণ্ড বা জলসীমার ওপর দিয়ে আন্তরাষ্ট্রীয় বিমান চলাচলের অধিকারের বিষয়ে পূর্ণ সমর্থন বজায় রাখা।
ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে আন্তদেশীয় সংগঠিত অপরাধ দমনে নীতি কাঠামো প্রণয়ন ও ব্যবহারিক পদক্ষেপের মাধ্যমে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়াসের প্রতি সমর্থন; উন্মুক্ত, স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক বহুপক্ষীয় ব্যবস্থাসমূহ সুসংহতকরণের মধ্য দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নয়নের অধিকার এবং সবার সার্বিক সমৃদ্ধির মাধ্যমে এই অঞ্চল এবং এর বাইরেও সুষম ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে ভূমিকা রাখা; ভৌত, প্রাতিষ্ঠানিক, জ্বালানি, অন্তর্জাল ও জনগণের সংযুক্তির প্রসার, নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পণ্য, সেবা, পুঁজি এবং জনগণের চলাচল সহজতর করা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর, অভিগম্য উদ্ভাবন এবং উন্মুক্ত ও মহাকাশে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে কার্যক্রম অব্যাহত রাখা।
রূপরেখায় বলা হয়েছে, সবার জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি হস্তান্তরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো; ভবিষ্যতে মহামারি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এবং স্বাস্থ্য নিরাপত্তা জোরদারকরণের লক্ষ্যে টিকা, ডায়াগনস্টিক ও চিকিৎসা সুরক্ষা সামগ্রীর মতো ‘বৈশ্বিক সম্পদ’-এ সবার অভিগম্যতা নিশ্চিত করাসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম অব্যাহত রাখা।
রূপরেখায় উল্লেখ করা হয়েছে আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ এবং পরস্পরের পরিপূরক স্বার্থ সমুন্নত রাখতে উপ-আঞ্চলিক অংশীদার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করা।
এ ছাড়া বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতে সহযোগিতা ও সংযুক্তি বাড়ানোর মাধ্যমে সবার সামষ্টিক কল্যাণ নিশ্চিতপূর্বক ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ রূপকল্প পূরণে অগ্রসর হওয়ার প্রয়াস অব্যাহত রাখা।