জুলাই শহীদের পরিবারকে ‘বিক্রি করে’ সমন্বয়করা আজ কোটি টাকার মালিক, অভিযোগ জুলাই শহীদের বাবার
এক সংবাদ সম্মেলনে এসে জুলাই অভ্যুত্থানের নেতাদের থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যরা। এক শহীদের বাবা অভিযোগ করেছেন, শহীদ পরিবারকে ‘বিক্রি’ করে কোটি টাকার মালিক হয়েছেন ছাত্র সমন্বয়কেরা। আর অন্তর্বর্তী সরকার বিচারের নামে ‘ঘুমপাড়ানি গল্প’ বলছে।
আজ শনিবার ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে মাওলানা আকরম খাঁ হলে এই সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে ‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’। শতাধিক শহীদ পরিবারের সদস্যরা এতে অংশ নেন। ‘জুলাই ২৪-এর শহীদদের হত্যাকাণ্ডের বিচারে সরকারের অনীহা ও আসামিদের গ্রেপ্তার না করার প্রতিবাদে এবং শহীদ পরিবারের ন্যায্য অধিকার’-এর দাবিতে ডাকা এই সংবাদ সম্মেলনে ছয়টি দাবি জানানো হয়।
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, রক্তাক্ত এক পথ পেরিয়ে তা অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। তাতে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
হাজারো মানুষের আত্মত্যাগে দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই সমন্বয়কসহ অভ্যুত্থানের তিন নেতা সরকারে যোগ দেন। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে তাঁরা পদত্যাগ করেন, তাঁদের একজন নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন।
সংবাদ সম্মেলনে শহীদ শাহরিয়ার হাসানের (আলভী) বাবা মো. আবুল হাসান বলেন, ‘আজকে আমাদের পুঁজি করে এই ছাত্র সমন্বয়কেরা শহীদ পরিবারকে বিক্রি করে আজকে হাজারো কোটি টাকার মালিক হয়েছে। তারা রাজনৈতিক দল করেছে, তারা আজকে ফায়দা লুটে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। অথচ শহীদ পরিবারের আমাদের ন্যায্য দাবি ছিল, আমরা আমাদের সন্তানদের হত্যাকারীর বিচার চাই।’
জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার হলে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদিকে জীবন দিতে হতো না মন্তব্য করে আবুল হাসান বলেন, ‘তার প্রধান কারণ হচ্ছে এই সরকারের বিশ্বাসঘাতকতা। এই সরকার আসামিদের গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হয়েছে।’
অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের জুলাই শহীদ এবং আহত ব্যক্তিদের জুলাই যোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়েছে। গত জানুয়ারিতে জুলাই শহীদদের তালিকা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তখন সংখ্যাটি ছিল ৮৩৪। এরপর জুন মাসে আরও ১০ জনের নাম যুক্ত হলে জুলাই শহীদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৪৪। তাঁদের তালিকার গেজেটও প্রকাশিত হয়। এরপর আটজনের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। জুলাই শহীদের পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধারা এককালীন অর্থের পাশাপাশি সরকার থেকে ভাতা পাচ্ছেন।
জুলাই শহীদ ও জুলাই যোদ্ধার প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি দাবি করে যাঁদের নাম গেজেটভুক্ত হয়নি, তাঁদের তালিকায় আনার দাবি জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।
বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ জানিয়ে আবুল হাসান বলেন, ‘এই সরকার একটা অপদার্থ সরকার। আজকে উপদেষ্টার চেয়ারে বসে আছে, তাদের ভেতরে ন্যূনতম কোনো কৃতজ্ঞতাবোধ নেই। যদি কৃতজ্ঞতাবোধ থাকত, তাহলে আজকে আমরা বিচারের অগ্রগতি দেখতে পেতাম। এখনো বিচারের নামে আমাদের ঘুমপাড়ানি গল্প শোনানো হচ্ছে।’
সংবাদ সম্মেলনে শহীদ সায়েমের মা শিউলি আক্তার বলেন, ‘দেড়টা বছর হয়ে গেছে আমাদের ছেলেরা শহীদ হইছে, কিন্তু এখনো বিচার পাই নাই। এই সরকার আমাদের ছেলেদের রক্তের ওপর দাঁড়াইয়া আইসা বসল, কিন্তু এখনো কোনো বিচার করে নাই। এতগুলো ছেলেরা পা হারাল, চোখ হারাল, হাত হারাল—ওদেরও সুচিকিৎসা করা হইল না। আমরা তো চেয়েছিলাম এই সরকার আসুক, এসে আমাদের ছেলের হত্যার বিচার করুক, আহতদের সুচিকিৎসা দিক। কিন্তু ওদের কোনো কিছুই দেওয়া হয় নাই।’
শহীদ পরিবারগুলো নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে জানিয়ে তাদের নিরাপত্তাও দিতেও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি দাবি জানান শিউলি আক্তার।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে যে ছয়টি দাবি জানানো হয়, সেগুলো হলো জুলাই শহীদদের হত্যাকাণ্ডের বিচার, আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার; শহীদ পরিবারের ও আহত পরিবারের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত, আহত ও শহীদ পরিবারের সুচিকিৎসা নিশ্চিত; আহত ও শহীদ যাঁদের নাম এখনো তালিকাভুক্ত হয়নি, তাঁদের যুক্ত করে গেজেট প্রকাশ; শহীদের প্রায় ২৫০ জন এতিম শিশুর লেখাপড়ার দায়িত্ব সরকারকে বহন; জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের দায়মুক্তির আইন প্রণয়ন।