নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ জরুরি

‘রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্ব ও সুরক্ষা নিশ্চিতকণ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে আলোচক ও অতিথিরা ফটোসেশনে অংশ নেন। গতকাল দুপুরে রাজধানীর বনানীর লেকশোর গ্র্যান্ড হোটেলেছবি: দীপু মালাকার

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার ছিল প্রায় ৪ শতাংশ। ৮৫ নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র ৭ জন। নানা প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে নারীদের নির্বাচনে অংশ নেওয়া এবং বিজয়ী হওয়া রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। রাজনীতিসহ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

‘রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্ব ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক সংলাপ ও সম্মাননা অনুষ্ঠানের আলোচকেরা এ কথা বলেন। ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস সামনে রেখে একশনএইড বাংলাদেশ ও প্রথম আলো গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে এ সংলাপের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া নারীরা তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে করণীয় নিয়েও কথা বলেন তাঁরা।

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির, একশনএইড ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সোসাইটির চেয়ারম্যান ইব্রাহিম খলিল আল জায়াদ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া নারীদের সম্মাননা জানান। সম্মাননাপ্রাপ্ত নারীদের একশনএইড বাংলাদেশের ‘হ্যাপি হোম’ প্রকল্পের সুবিধাবঞ্চিত মেয়েশিশুদের আঁকা ছবি উপহার দেওয়া হয়।

‘রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্ব ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক সংলাপ ও সম্মাননা অনুষ্ঠানে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী। বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে
ছবি: প্রথম আলো

আলোচনায় গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, এবারের নির্বাচনে বিজয়ীরা নারী হিসেবে নয়, সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় সংসদে কথা বলবেন, এটাই সবার প্রত্যাশা। নারীর অধিকার আদায়ে সংসদে পুরুষদেরও কথা বলতে হবে। কেননা নারীরা ভোট না দিলে তাঁরা সংসদে আসতে পারতেন না।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী রুমিন ফারহানা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নারীবিদ্বেষ মনোভাবের উদাহরণ এবারের নির্বাচন। যে দল নারীদের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয় না, সেই দলকে নারীরা যাতে ভোট না দেন, সে আহ্বান জানান তিনি। রুমিন বলেন, ‘পরিবারে কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য না করলে সেই কন্যাশিশু মেরুদণ্ড সোজা করে বাঁচতে পারে। এই যে আমি, আমার পরিবারই আমাকে তৈরি করেছে।’

‘রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্ব ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক সংলাপ ও সম্মাননা অনুষ্ঠানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী রুমিন ফারহানা। বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে
ছবি: প্রথম আলো

ফরিদপুর-৩ আসনে বিএনপির বিজয়ী প্রার্থী চৌধুরী নায়াব ইউসুফ বলেন, ‘আমি নারী, তাই নমিনেশন পাব কি না, কোনো পুরুষ প্রার্থীকে এ সিট দিয়ে দেওয়া হবে কি না—এসব ভেবে অনেকে তদবির করতে বলেছেন। তবে আমার আত্মবিশ্বাস ছিল। শেষ পর্যন্ত এলাকার ভোটাররা আমাদের ওপর আস্থা রেখেছেন।’

ঢাকা–৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন তাসনিম জারা। তিনি বলেন, নির্বাচনে কত নারী অংশগ্রহণ করলেন, সেই সংখ্যা শুধু বিবেচনায় না নিয়ে মন্ত্রিসভা, রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্তসহ সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়ায় কত নারী আছেন, সে বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। অনলাইনে হয়রানির কারণে নারীরা রাজনীতি থেকে পিছিয়ে যান বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নারীর অধিকার আদায়ে সংসদে পুরুষদেরও কথা বলতে হবে। কেননা নারীরা ভোট না দিলে তাঁরা সংসদে আসতে পারতেন না
রাশেদা কে চৌধূরী, নির্বাহী পরিচালক, গণসাক্ষরতা অভিযান

ঢাকা–২০ আসনে এনসিপির প্রার্থী নাবিলা তাসনিদ বলেন, নির্বাচনী প্রচার চালানোর সময় তিনি সাইবার হয়রানির শিকার হয়েছেন। পুরুষের তুলনায় নারী প্রার্থীরাই বাড়তি হয়রানির শিকার হন এবং দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়।

ঢাকা–১২ আসনের প্রার্থী তাসলিমা আখতার বলেন, একজন নারী নাগরিক হিসেবে সমঅধিকার পাচ্ছে কি না, তা দেখতে হবে। এ অধিকার নিশ্চিত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

‘রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্ব ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক সংলাপ ও সম্মাননা অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকদের একাংশ। বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে
ছবি: প্রথম আলো

ঢাকা–১০ আসনের প্রার্থী নাসরিন সুলতানা জানান, নির্বাচনে অংশ নিতে গিয়ে তিনি নিজেই অনলাইনে বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন। থানায় মামলা করেছেন। সেই মামলার এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।

রংপুর–৩ আসনের হিজড়া প্রার্থী আনোয়ারা ইসলাম রানী বলেন, নির্বাচনের পাঁচ দিন আগে তিনি প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। হিজড়াসহ প্রান্তিক নারীদের সংসদে সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

‘রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্ব ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক সংলাপ ও সম্মাননা অনুষ্ঠানে কথা বলেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে
ছবি: প্রথম আলো

অনুষ্ঠানে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, প্রথম আলো নারীদের বিষয়গুলো সব সময় গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করার চেষ্টা করে। অ্যাসিড সন্ত্রাস কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রথম আলোর ভূমিকার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, একসময় বছরে ৫০০–এর বেশি মানুষ অ্যাসিডদগ্ধ হতেন। প্রথম আলো, ব্র্যাক, অ্যাসিড সার্ভাইভারস ফাউন্ডেশন নানা কার্যক্রম হাতে নেয়। সরকার শক্তিশালী আইন তৈরি করে। বর্তমানে অ্যাসিডদগ্ধের সংখ্যা কমে বছরে ১০ থেকে ১২ জনে নেমেছে। উদ্যোগী হলে, চাপ তৈরি করতে পারলে কাজ হয়, এটা তার প্রমাণ। রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন আন্দোলনে নারীরা সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিলেও পরে আর এই নারীদের দেখা যায় না
ফারাহ্‌ কবির, কান্ট্রি ডিরেক্টর, একশনএইড বাংলাদেশ

একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্‌ কবির বলেন, নারীর ক্ষমতায়নের প্রথম শর্ত, নারীর জন্য সহিংসতামুক্ত নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। নারীর প্রতি সহিংসতার ক্ষেত্রে সাইবার বুলিং নতুন উপদ্রব হিসেবে দেখা দিয়েছে। চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন আন্দোলনে নারীরা সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিলেও পরে আর এই নারীদের দেখা যায় না। তিনি সংসদ ও সংসদের বাইরে নারী ককাস গঠনের ওপর গুরুত্ব দেন।

মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে আরও বক্তব্য দেন পাবনা-৩ আসনের সরদার আশা পারভেজ, পাবনা-৪–এর শাহনাজ হক, ঝিনাইদহের মনিকা আলম, ঢাকা–৭–এর সীমা দত্ত, ঢাকা–৮–এর মেঘলা আলম, ফরিদপুর–৩–এর আরিফা আক্তার ও নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের সদস্য সাদাফ সায সিদ্দীকী।

উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ হাইকমিশনের সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাডভাইজার তাহেরা জাবীন, ইউএনডিপি বাংলাদেশের সিনিয়র জেন্ডার অ্যানালিস্ট শারমিন ইসলাম, জাগো ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা করভি রাখসান্দ। জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার চিত্র উপস্থাপন করেন একশনএইড বাংলাদেশের উইমেন রাইটস অ্যান্ড জেন্ডার ইকুইটি টিম লিড মরিয়ম নেসা।

অনুষ্ঠানের শুরুর দিকে নাট্য সংগঠন পালাকারের সদস্যরা চেনা পরবাস নামের একটি নাটক পরিবেশন করেন।