বিটিআরসির প্রস্তাবের পর তরঙ্গের দাম আরও কম চায় অপারেটররা, রাজস্ব নিয়ে চিন্তায় সরকার
মুঠোফোনে কথা বলা, ইন্টারনেটে ভিডিও দেখা কিংবা কাজের প্রয়োজনে অনলাইনে যুক্ত থাকা—এসব সেবার পেছনে রয়েছে মোবাইল অপারেটরদের ব্যবহৃত বেতার তরঙ্গ। এই তরঙ্গ ব্যবহারের অনুমতি নবায়ন করতে অপারেটরদের কত টাকা দিতে হবে, তা নিয়ে এখন আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) তরঙ্গ নবায়নের মূল্য আগের দরের চেয়ে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তবে অপারেটররা বলছে, প্রস্তাবিত দামও বেশি। তারা আরও কম দাম ও দীর্ঘ সময়ে কিস্তিতে টাকা পরিশোধের সুযোগ চায়।
মুঠোফোন সেবায় তরঙ্গ নবায়ন ফি মানে শুধু অপারেটরদের খরচের হিসাব নয়। এর সঙ্গে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, সেবার মান উন্নয়ন ও সরকারের রাজস্ব আয়ও যুক্ত। আর সব শেষে খরচের ধাক্কা এসে লাগবে গ্রাহকের ঘাড়েই। আবার তরঙ্গ নবায়ন ফি কমালেই যে গ্রাহকের ইন্টারনেট বা কলের খরচ কমবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই।
প্রযুক্তি নীতিমালা পরামর্শক আবু নাজম মো. তানভীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তরঙ্গের দাম ৩০ শতাংশ কমানো হলে সেবার মান নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতাও সে অনুপাতে বাড়ানো উচিত। এ ক্ষেত্রে কোয়ালিটি অব সার্ভিসের (কিউওএস) মানদণ্ড বৈশ্বিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আরও কঠোর করতে হবে এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। দিন শেষে এমন মূল্য নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অপারেটরদের ব্যবসা টেকসই হয় এবং গ্রাহকেরা সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত সেবা পান। এই দায়িত্ব বিটিআরসিরই।
মুঠোফোন সেবায় যেসব তরঙ্গ ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর সব ব্যান্ডের কাজ এক রকম নয়। যেমন ৯০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত এলাকায় নেটওয়ার্কের আওতা তৈরি ও ঘরের ভেতরে সংযোগ পৌঁছাতে বেশি কার্যকর। ১ হাজার ৮০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে নেটওয়ার্কের আওতা ও ধারণক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য পাওয়া যায়। আর ২ হাজার ১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড ব্যবহার করা হয় মূলত নেটওয়ার্কের ধারণক্ষমতা ও ডেটা সেবার চাহিদা মেটাতে।
তরঙ্গ সীমিত সম্পদ। তাই এর ব্যবহারের অনুমতি পেতে অপারেটরদের অর্থ দিতে হয় সরকারকে। এ ব্যয় তাদের ব্যবসার অন্যতম খরচ। এর বাইরে টাওয়ার স্থাপন, যন্ত্রপাতি কেনা, বিদ্যুৎ, নেটওয়ার্ক রক্ষণাবেক্ষণ ও নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের খরচ রয়েছে।
অপারেটরগুলোর কর্মকর্তারা বলেন, তরঙ্গের দাম বেশি হলে, নবায়ন খরচ বেড়ে গেলে তাঁদের হাতে নেটওয়ার্ক উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগের টাকা কমে যায়। বিপরীতে, তরঙ্গের খরচ কমলে সেই অর্থের একটি অংশ নেটওয়ার্কের আওতা বাড়ানো, ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি কিংবা সেবার মান উন্নয়নে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশে বর্তমানে গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের হাতে থাকা ৯০০, ১ হাজার ৮০০ ও ২ হাজার ১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের তরঙ্গ নবায়নের প্রক্রিয়া চলছে। এসব তরঙ্গ ব্যবহারের বিদ্যমান লাইসেন্সের মেয়াদ আগামী ১০ নভেম্বর শেষ হবে। তিন অপারেটরের হাতে রয়েছে মোট ৭৯ দশমিক ২ মেগাহার্টজ তরঙ্গ। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের ৩২ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ, রবির ২২ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ এবং বাংলালিংকের ২৪ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ রয়েছে।
বর্তমান নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, এসব তরঙ্গ নবায়নে ব্যয় হওয়ার কথা ১৬ হাজার ৮৪৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। তবে বিটিআরসির নতুন প্রস্তাবে তা কমিয়ে ১৩ হাজার ১০০ কোটি ৫০ লাখ টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রস্তাবটি কার্যকর হলে আগের হিসাবের তুলনায় সরকারের সম্ভাব্য আয় হবে ৩ হাজার ৭৪৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা। ১৫ অক্টোবর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে এ প্রস্তাব পাঠিয়েছে বিটিআরসি। অন্যদিকে আগে নবায়নের মেয়াদ ১২ বছর ৪ মাস রাখার প্রস্তাব করা হলেও এবার তা বাড়িয়ে ২০ বছর করার কথা বলেছে কমিশন।
বিটিআরসি বলছে, বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে গবেষণা করে তরঙ্গ নবায়নের মূল্য নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে চারটি পদ্ধতি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আয় ও নগদ অর্থপ্রবাহের হিসাব, টাওয়ারের খরচ সাশ্রয়ের প্রকৌশলভিত্তিক মডেল, বিভিন্ন দেশের তরঙ্গের দামের তুলনা এবং আর্থসামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ।
অপারেটররা আরও কম চায় কেন
বিটিআরসির প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেও তরঙ্গের দাম আরও কমানোর দাবি জানিয়েছে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (অ্যামটব)। ২৫ অক্টোবর বিটিআরসির চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়ে এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে সংগঠনটি।
চিঠিতে অ্যামটবের মহাসচিব মোহাম্মদ জুলফিকার তরঙ্গ নবায়নের অর্থ ২০ বছরে সমান কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ চেয়েছেন। এ ছাড়া বার্ষিক তরঙ্গ চার্জ প্রত্যাহারেরও দাবি জানিয়েছে অপারেটরদের সংগঠনটি। অ্যামটবের যুক্তি হলো, দীর্ঘ মেয়াদের জন্য তরঙ্গের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি দামের হিসাব সরাসরি দীর্ঘ সময়ের ওপর প্রয়োগ করা ঠিক নয়। ভবিষ্যতের আয়-ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, প্রযুক্তির পরিবর্তন ও বিনিয়োগের ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সংগঠনটির হিসাবে, বাংলাদেশের মোবাইল অপারেটররা তাদের আয়ের ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ তরঙ্গের পেছনে ব্যয় করে। বিশ্বে এ হার গড়ে ৭ দশমিক ৭ শতাংশ এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ।
গ্রাহকের কী লাভ
বিটিআরসির হিসাবে দেশে এখন মুঠোফোন গ্রাহকসংখ্যা ১৯ কোটির বেশি। টেলিযোগাযোগ সেবায় অতীত অভিজ্ঞতা বলে সরকারের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে গ্রাহকের লাভ তেমন হয় না। অভিযোগ রয়েছে, অপারেটররা গ্রাহকদের সুবিধার কথা বলে সরকারের থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা আদায় করলেও সেই সুফল গ্রাহকেরা পাননি।
তরঙ্গ নবায়ন ফি কমালে গ্রাহকেরা কীভাবে লাভবান হবে জানতে চাইলে অ্যামটব মহাসচিব মোহাম্মদ জুলফিকার প্রথম আলোকে বলেন, তরঙ্গের দাম হ্রাস করা হলে তার দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া সম্ভব হবে। এতে অপারেটরদের নেটওয়ার্কে বিনিয়োগের সক্ষমতা বাড়বে, সেবার মান উন্নত হবে এবং নেটওয়ার্কের আওতা আরও সম্প্রসারিত হবে। এর ফলে দেশের মানুষের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
সরকারের চিন্তা রাজস্ব
তরঙ্গ নবায়ন ফি কমানোর প্রস্তাবের সঙ্গে যুক্ত সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা। প্রতি অর্থবছরের শুরুতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দেয় সরকারের অর্থ বিভাগ। নথিপত্র অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগকে ৬ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছে অর্থ বিভাগ। এই টাকার মধ্যে আবার বিটিআরসির কাছেই ৬ হাজার ৩৬ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এই লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে অপারেটরদের তরঙ্গ নবায়ন ফিও রয়েছে।
জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, তরঙ্গের নবায়ন মূল্য কমানো হলে সরকারের সম্ভাব্য আয় কমতে পারে। সরকারের বিভিন্ন খাত থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা থাকে। ফলে একটি খাতের আয় কমলে সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণেও প্রভাব পড়তে পারে। তাই সব দিক বিবেচনা করেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।