ঘটনা–১
গত ৩১ জানুয়ারি বেলা একটার দিকে ডিবি পরিচয়ে রাজধানীর ফকিরাপুলের আলিজা টাওয়ারে ‘হেরার জ্যোতি ডিজাইন অ্যান্ড প্রিন্টিং’ নামের একটি ছাপাখানায় অভিযান চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারী সাইফুল ইসলামকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন ডিবি কার্যালয়ে গেলে তারা এ নামের কাউকে আটক করার কথা অস্বীকার করে। সাইফুলকে তুলে নেওয়ার পর এ ছাপাখানার মালিক ও গ্রাফিক ডিজাইনার মমিনুল ইসলাম নিখোঁজ হন। …নিখোঁজ থাকার দুই দিন পর গত বৃহস্পতিবার (২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩) ব্যবসায়ী মমিনুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করার কথা জানায় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। (নিখোঁজ সেই ব্যবসায়ীকে দুই দিন পর গ্রেপ্তারের কথা জানাল ডিবি, প্রথম আলো অনলাইন, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩)
ঘটনা–২
গত ২২ জানুয়ারি মগবাজার আদ্-দ্বীন হাসপাতালের সামনে থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে শিক্ষানবিশ আইনজীবী আবুল হোসাইন রাজনকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর খোঁজে বিভিন্ন থানায় হন্যে হয়ে ঘোরেন তাঁর স্বজনেরা। তাঁকে হাতিরঝিল থানায় আটকে রাখা হয়েছে বলে খবর পান তাঁরা। কিন্তু পুলিশের পক্ষ থেকে ওই আইনজীবীকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি অস্বীকার করা হয়। এক সপ্তাহ ‘নিখোঁজ’ থাকার পর গত ২৯ জানুয়ারি তাঁকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে হাতিরঝিল থানার পুলিশ। পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় রাজনকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে বলে তাঁর স্বজনেরা অভিযোগ করেন। …রাজনের ছোট ভাই মহিউদ্দিন খান বলেন, রাজনকে নির্যাতনের জন্য হাতিরঝিল থানা থেকে প্রতিদিন ডিবির প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হতো। ( ল’ ইয়ার টরচার্ড, সেন্ট টু জেল, ডেইলি স্টার, ৩০ জানুয়ারি ২০২৩)।
ঘটনা–৩
গত ২৩ জানুয়ারি সাতক্ষীরায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে রঘুনাথ খাঁ নামের এক সাংবাদিককে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। একদিন পর তাঁকে বিস্ফোরক মামলায় গ্রেপ্তারের কথা জানায় পুলিশ। …রঘুনাথ খাঁর স্ত্রীর অভিযোগ, সোমবার সকালে তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়; এরপর থানায় খোঁজ নিয়ে তাঁর সন্ধান পাওয়া যায়নি। (সাতক্ষীরায় ‘তুলে নেওয়ার একদিন পর’ বিস্ফোরক মামলায় গ্রেপ্তার সাংবাদিক, বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোর ডটকম, ২৪ জানুয়ারি ২০২৩)
আইনি প্রশ্ন
ঘটনাস্থল ও সময়ের পার্থক্য থাকলেও ওপরের তিনটি ঘটনার মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে। সেটি হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে কাউকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠেছে। কিন্তু থানা বা পুলিশ আটকের বিষয়টি স্বীকার করেনি। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ পর আটকের বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে এবং ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়েছে। এ ঘটনাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। কোন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি তা অস্বীকার করতে পারে? প্রথম দুটি ঘটনায় আটককৃত ব্যক্তিদের যত সময় পুলিশি হেফাজতে রাখার অভিযোগ ওঠেছে, সেটা কি আইনসংগত? এ ছাড়া পুলিশি হেফাজতে শিক্ষানবিশ আইনজীবীকে নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ করেছেন তাঁর স্বজনেরা। নির্যাতনের এই অভিযোগ সত্যি হলে সেটা কি পুলিশের বেআইনি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নয়?
সংবিধান, আইন ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনা
‘গ্রেপ্তার আটক সম্পর্কে রক্ষাকবচ’ শিরোনামে সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদের প্রথম দফায় বলা হয়েছে, গ্রেপ্তারের কারণ না জানিয়ে কোনো ব্যক্তিকে আটক করা যাবে না এবং আটক ব্যক্তিকে অবশ্যই তাঁর মনোনীত আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট একটি মামলায় [বাংলাদেশ বনাম ব্লাস্ট, ৬৯ ডিএলআর (এডি) (২০১৭) ৬৩] পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ ও নিম্ন আদালতের জন্য কিছু দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে, গ্রেপ্তারের সময় যদি গ্রেপ্তার ব্যক্তির বন্ধু বা নিকটাত্মীয় পাশে না থাকেন, তবে গ্রেপ্তারের পরে যত দ্রুত সম্ভব (অবশ্যই ১২ ঘণ্টার ঊর্ধ্বে নয়) গ্রেপ্তার ব্যক্তির বলে দেওয়া আত্মীয় বা বন্ধুকে গ্রেপ্তারের তারিখ, সময় ও হেফাজতে রাখার স্থান (থানার নাম) অবহিত করবেন।
সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদের দ্বিতীয় দফায় বলা হয়েছে, আটক ব্যক্তিকে অবশ্যই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে উপস্থিত করতে হবে এবং ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তিকেই ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় আটক রাখা যাবে না। গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ব্যতীত ২৪ ঘণ্টার অধিক আটক না রাখা হচ্ছে রাষ্ট্রের প্রতি সংবিধানের নির্দেশনা।
সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোন ব্যক্তিকে যন্ত্রণা দেওয়া যাইবে না কিংবা নিষ্ঠুর, অমানুষিক বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাইবে না কিংবা কাহারও সহিত অনুরূপ ব্যবহার করা যাইবে না।’ বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে কাউকে নির্যাতন করা নিষিদ্ধ। গ্রেপ্তারের পর আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের দ্বারা নির্যাতনের অভিযোগ ওঠায় সরকার ২০১৩ সালে ‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ)’ আইন প্রণয়ন করে। এখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন একটি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে এবং নির্যাতনকারী আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই আইনে মামলা হয় না বললেই চলে।
জবাবদিহিতার অভাব
গ্রেফতার বা আটকের পর অস্বীকার করা, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির না করা এবং পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের যে অভিযোগ ওঠেছে, এগুলো স্পষ্টতই আমাদের সংবিধান, আইন ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরিপন্থী। কিন্তু এসব ঘটনা বাংলাদেশে নতুন নয়। এর আগেও দেশি–বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে গুম ও ধরে নিয়ে নির্যাতনের যেসব অভিযোগ করেছে এবং সেগুলো তদন্তের আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু সরকার সেই ব্যাপারে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটি ২০১৯ সালে বলেছিল, পুলিশ ও অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা দায়মুক্তি নিয়ে কার্যক্রম চালাতে পারে এবং তাদের মোটেও জবাবদিহি করতে হয় না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, জবাবদিহির অভাবেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘বেআইনি’ আটক ও নির্যাতনের মতো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে।