নিপাহ ভাইরাস এসেছে নতুন তিন বিপদ নিয়ে, দুই বছরে আক্রান্ত শতভাগ রোগীর মৃত্যু
দেশে নিপাহ ভাইরাসের তিনটি নতুন ও ভীতিকর বৈশিষ্ট্য দেখা দিয়েছে। প্রথমত, গত দুই বছরে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত শতভাগ রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এর আগে এ রোগে ৭০ শতাংশের বেশি আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হতো।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমে এলেও এটি এখন আগের চেয়ে বেশি এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হলো, দেশে প্রথমবারের মতো গরমকালে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
নিপাহ ভাইরাস নতুন বিপদ নিয়ে হাজির হলেও খেজুরের রস বিক্রি ও পান বন্ধ হচ্ছে না। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে খেজুরের রস বিক্রির প্রচার দেদার চলছে।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, নিপাহ ভাইরাস রোধে খেজুরের রস বিক্রি বন্ধ করা দরকার। এ নিয়ে কঠোর আইনের দরকার। কিন্তু সে বিষয়ে কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
মারাত্মক ও সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ হলো নিপাহ। এ রোগের বাহক টেরোপাস (ফল আহারি) গোত্রের বাদুড়। বাদুড় থেকে মানুষে এই রোগের সংক্রমণ হয়। বাদুড়ের মুখের লালা বা মল-মূত্র দ্বারা খেজুরের রস বা তালের রস, আধা খাওয়া ফল ইত্যাদির মাধ্যমে নিপাহ ভাইরাস ছড়াতে পারে। এ রোগের প্রধান লক্ষণগুলো হলো জ্বরসহ মাথাব্যথা, খিঁচুনি, অজ্ঞান হওয়া, মানসিক অবস্থার পরিবর্তন (আবলতাবল বা ভুল বলা), কোনো কোনো ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট। সংক্রমিত প্রাণী বা মানুষের শারীরিক সংস্পর্শে এ রোগ ছড়ায়।
বাংলাদেশে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট ৩৪৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৪৯ জন রোগী মারা গেছেন। বাংলাদেশে এই রোগে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুহার ৭২ শতাংশের বেশি। কিন্তু আইইডিসিআর বলছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিপাহ রোগে আক্রান্ত সব রোগীই মারা গেছেন।
মৃত্যু শতভাগ
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০০১ সালে মেহেরপুরে প্রথম নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হয়। এরপর নওগাঁয় ২০০৩ সালে রোগী শনাক্ত হয়। তবে এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব হয় ফরিদপুর জেলায়, ২০০৪ সালে। সে বছর ফরিদপুরে নিপাহ ভাইরাসে ৩৫ জন আক্রান্ত হন, তার মধ্যে ২৭ জনের মৃত্যু হয়।
বাংলাদেশে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মোট ৩৪৭ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৪৯ জন রোগী মারা গেছেন। বাংলাদেশে এই রোগে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুহার ৭২ শতাংশের বেশি। কিন্তু আইইডিসিআর বলছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিপাহ রোগে আক্রান্ত সব রোগীই মারা গেছেন।
আইইডিসিআরের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, ২০২৪ সালে ৫ জন এবং ২০২৫ সালে চারজন রোগী নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হন। তাঁরা সবাই মারা যান। এর আগে কোনো বছরে শতভাগ মৃত্যু হয়নি।
এখন পর্যন্ত দেশের ৩৫ জেলায় নিপাহ ভাইরাসের রোগী পাওয়া গেছে। নতুন নতুন এলাকায় এখন ছড়িয়ে পড়ছে এ ভাইরাস। এটা একটা বিপদের লক্ষণ।শারমিন সুলতানা, আইইডিসিআরের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা
গরমেও মৃত্যু
খেজুরের রস থেকে ছড়ায় নিপাহ ভাইরাস। আর খেজুরের রস মূলত শীতের সময়ই পাওয়া যায়। এতে আক্রান্ত ও মৃত্যুও তাই এ সময়ই হয়। কিন্তু দেশে প্রথমবারের মতো গত বছর (২০২৫) গরমের সময় একজনের মৃত্যু হয় নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে। গত বছরের আগস্টে তাঁর মৃত্যু হয়। এর ফলে নিপাহ এক ভিন্ন ও ক্ষতিকর বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বাদুড়ে খাওয়া পেয়ারা খাওয়ার ফলে ওই ব্যক্তি নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। অর্থাৎ খেজুরের রসের বাইরে অন্য ফল খাওয়ার ফলেও নিপাহ ছড়াচ্ছে। আবার দেখা যাচ্ছে, নিপাহ এখন শীতকাল ছাড়াও গরমেও ছড়াচ্ছে। এটা শঙ্কাজনক।
নিপাহ ভাইরাস থেকে সুরক্ষায় খেজুরের কাঁচা রস পান বন্ধ করা দরকার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের কথা, বিজ্ঞাপন দিয়ে এর বিক্রিও বন্ধ করতে হবে। এর জন্য আইন দরকার।
বাড়ছে বিস্তৃতি
যদি বাংলাদেশের মানচিত্রকে উলম্বভাবে ভাগ করা হয়, তাহলে দেখা যায় যে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলেই নিপাহ ভাইরাসের বিস্তৃতি ছিল। এখনো উত্তরের জেলা নওগাঁ, মধ্যাঞ্চলের ফরিদপুর ও পশ্চিমাঞ্চলের মেহেরপুর এলাকায় এর বিস্তৃতি বেশি। কিন্তু দিন দিন নিপাহ নতুন নতুন জেলায় ছড়িয়ে গেছে। গত বছর ভোলা জেলায় প্রথমবারে মতো নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হয়। আবার ২০২৪ সালে শরীয়তপুরে এ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়।
আইইডিসিআরের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত দেশের ৩৫ জেলায় নিপাহ ভাইরাসের রোগী পাওয়া গেছে। নতুন নতুন এলাকায় এখন ছড়িয়ে পড়ছে এ ভাইরাস। এটা একটা বিপদের লক্ষণ।
খেজুরের রস নিরাপদ রাখার ভুল দাবি
নেট বা জাল দিয়ে ঢেকে বাদুড়ের মুখের সংস্পর্শ ঠেকানোর যে কথা বলা হয়েছে, তাকে পুরোপুরি অবাস্তব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। আইইডিসিআরের সঙ্গে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ মিলে নিপাহ ভাইরাস সার্ভিলেন্স বা পর্যবেক্ষণ করে। এই সার্ভিলেন্সের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সৈয়দ মঈনুদ্দীন সাত্তার প্রথম আলোকে বলেন, বাদুড়ের প্রস্রাব ধরে রাখার প্রকোষ্ঠ অনেক ছোট। তাই যখন বাদুড় রস পান করে, তখনই প্রস্রাব করতে থাকে। আর নেট দিয়ে পানি কী ধরে রাখা সম্ভব? কোনোটাই সম্ভব নয়। তাই রস নিরাপদ রাখার যে কথা বলা হচ্ছে, তা শতভাগ ভুল।
আইন হচ্ছে না
নিপাহ ভাইরাস থেকে সুরক্ষায় খেজুরের কাঁচা রস পান বন্ধ করা দরকার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের কথা, বিজ্ঞাপন দিয়ে এর বিক্রিও বন্ধ করতে হবে। এর জন্য আইন দরকার। আইইডিসিআরের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে এ বিষয়ে একাধিকবার বলা হয়েছে বলে জানান ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে একমত। কিন্তু একটি আইন করতে যে ধরনের উদ্যোগ দরকার, তা আর হয়নি।