জনশুমারি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে যেসব ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, তা কতটুকু নেওয়া হয়েছিল বলে আপনার মনে হয়। আগের শুমারিগুলোর নিরিখে জানতে চাই।

মঈনুল ইসলাম: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) হয়তো তাদের মতো যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে, ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে আমি মনে করি, শুমারিটি বর্ষাকালে করা ঠিক হয়নি। শুমারি চলাকালীন সিলেট ও উত্তরাঞ্চল বন্যাকবলিত ছিল। তা ছাড়া কুমিল্লায় স্থানীয় সরকার বা মেয়র নির্বাচন ছিল। ফলে এ সময়কালকে পরিহার করতে পারলে ভালো হতো। কতসংখ্যক মানুষ ‘আন্ডার কাউন্ট’ হয়েছে, তা অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে নির্ধারণ করতে হবে।

দেশের আর্থসামাজিক পরিকল্পনা প্রণয়নে জনগণনা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে এত বিতর্ক থাকলে এর একটি নেতিবাচক প্রভাব কি সৃষ্টি হবে না?

মঈনুল ইসলাম: বিতর্ক থাকলে অবশ্যই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সে ক্ষেত্রে বিতর্ক পরিহারের ব্যবস্থা নিতে হবে। সামনে শুমারি–পরবর্তী যাচাই (পিইসি) জাতিসংঘের নির্দেশিত নীতিমালা অনুযায়ী নিরপেক্ষ ও স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজটি করতে হয়। এরপর সংশোধিত জনসংখ্যার আকার নির্ধারণ করতে হবে।

এবারের শুমারিতে দেশের সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দুদের জনসংখ্যা আনুপাতিক হারে কমেছে দেখা গেছে। গত শুমারি প্রতিবেদনে এর পেছনে দুটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো হলো হিন্দুদের আউট মাইগ্রেশন হচ্ছে অর্থাৎ হিন্দুরা দেশ ছাড়ছে। দ্বিতীয়ত, হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে মোট প্রজনন হার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট তুলনামূলক কম। আপনার কী মনে হয়?

মঈনুল ইসলাম: আমি মনে করি, দুটি কারণই এ ক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব রাখছে। মুসলিমদের মধ্যে হিন্দুদের তুলনায় প্রজনন হার বেশি লক্ষ করা যায়। আবার সংখ্যাগত আকারও (ভিত্তি জনসংখ্যা) বেশি। তা ছাড়া হিন্দুদের আউট মাইগ্রেশনও হচ্ছে। ফলে এই দুইয়ের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করি। তবে এ ক্ষেত্রে হিন্দুদের মৃত্যুহারের বিষয়টিও বিশ্লেষণের গুরুত্ব রাখে।

লিঙ্গানুপাতে নারীর সংখ্যা শুমারিতে বেশি দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে?

মঈনুল ইসলাম: এবারই প্রথম বিষয়টি লক্ষ করা গেছে। বৈশ্বিকভাবেই নারীদের আয়ুষ্কাল বেশি। আমাদের এখানেও পুরুষদের তুলনায় নারীদের বেশি, যা লক্ষ করা যাচ্ছে। এর পাশাপাশি পুরুষেরা দেশের বাইরে বেশি মাইগ্রেট বা স্থানান্তর করে থাকে। ফলে এগুলোর প্রভাব থাকতে পারে। উপাত্তের গুণগত দিক বিবেচনায় কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না, তা শুমারি–পরবর্তী যাচাইকালে বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে।

কী পদ্ধতিতে জনশুমারি করা হয়। অন্য দেশে কীভাবে করা হয়। বাংলাদেশের সেসব ব্যবস্থা অনুসৃত হয় কতটুকু।

মঈনুল ইসলাম: আন্তর্জাতিকভাবে সাধারণত ডি-ফ্যাক্টো বা ডি-জুরি পদ্ধতিতে জনশুমারি ও গৃহগণনার কাজটি করা হয়। ডি-ফ্যাক্টো পদ্ধতিতে খানার সদস্যদের শুমারি মুহূর্তে তাদের অবস্থানে গণনাভুক্ত করা হয়। ডি-জুরি পদ্ধতিতে খানার সদস্যদের শুধু তাদের সচরাচর বসবাসের স্থানে গণনা করা হয়। তবে আরেকটি পদ্ধতি রয়েছে, যাকে মডিফাইড ডি-ফ্যাক্টো পদ্ধতি বলে। এ পদ্ধতিতে খানার সদস্যদের শুমারি মুহূর্তে তাদের অবস্থানে গণনাভুক্ত করার পাশাপাশি শুমারি মুহূর্তে যারা দায়িত্বরত ও ভ্রমণরত থাকবেন, তাদেরকে নিজ নিজ খানায় গণনাভুক্ত করা হবে। জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ মডিফাইড ডি-ফ্যাক্টো পদ্ধতিতে পরিচালনা করা হয়েছে বলে জানা যায়। এটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন করা হয়। প্রথম পর্যায়ে জোনাল অপারেশন, প্রশ্নপত্র টেস্ট, পাইলটিং, দ্বিতীয় পর্যায়ে মূল শুমারি (প্রশিক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ), তৃতীয় পর্যায়ে শুমারি–পরবর্তী যাচাই (পিইসি), চতুর্থ পর্যায়ে আর্থসামাজিক ও জনতাত্ত্বিক জরিপ এবং পঞ্চম পর্যায়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন। তবে তৃতীয় পর্যায়ে শুমারি–পরবর্তী যাচাই (পিইসি) জাতিসংঘের নির্দেশিত নীতিমালা অনুযায়ী নিরপেক্ষ ও স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করতে হয়। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশেও এসব নিয়মনীতি অনুসরণ করার কথা। যাঁরা পিইসি করবেন, তাঁদের দায়িত্ব ও ভূমিকা এখানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন