প্রথম আলো এক্সপ্লেইনার
দ্বিতীয় বিয়েতে কার অনুমতি নিতে হয়, হাইকোর্টে কী রায় হয়েছে, আইনে কী আছে
হাইকোর্টের এক রায় নিয়ে ‘দ্বিতীয় বিয়ে করতে লাগবে না স্ত্রীর অনুমতি’—এমন শিরোনামে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বিষয়টি নতুন করে এসেছে আলোচনায়। বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় অর্থাৎ স্ত্রী থাকা অবস্থায় আরেকটি বিয়ের ক্ষেত্রে কার অনুমতি নিতে হয়? আইনের কোন বিধান নিয়ে রিট আবেদনটি হয়েছিল, হাইকোর্টের রায় কী হয়েছে, আইনেই বা কী বলা হয়েছে—চলুন খুঁজি তার উত্তর।
রিট আবেদনের বিষয়বস্তু কী ছিল
১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারায় বহুবিবাহ ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলা আছে। বিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় আরবিট্রেশন কাউন্সিলের (সালিস পরিষদ) লিখিত পূর্বানুমতি ছাড়া আবার বিয়ে করতে পারবেন না বা এমন অনুমতি ছাড়া অনুষ্ঠিত কোনো বিয়ে ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রিকরণ) আইনের অধীনে রেজিস্ট্রি হবে না।
৬ ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান ২০২১ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। আবেদনকারীর ভাষ্য, একজন পুরুষের একাধিক স্ত্রী রাখার স্বীকৃতি মুসলিম পারিবারিক আইনে দেওয়া হয়েছে। তবে তাঁদের প্রতি ন্যায়বিচার ও সম-অধিকার নিশ্চিত না করেই আইনে বহুবিবাহের অনুমতির বিধান রাখা হয়েছে। বিয়ে বলবৎ অবস্থায় সালিস কাউন্সিলের (আরবিট্রেশন কাউন্সিলের) অনুমতি নিয়ে একাধিক বিয়ে করা যায়। তবে স্ত্রীর ভরণপোষণসহ অন্য প্রমাণাদি যাচাই ও খোরপোশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সালিসি কাউন্সিলের নেই। এতে নারীর সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়।
কী রুল হয়েছিল
রিট আবদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি হাইকোর্ট রুল দিয়েছিলেন। স্ত্রীদের মধ্যে সম-অধিকার নিশ্চিত ছাড়া বিয়ে বলবৎ থাকা অবস্থায় আরেকটি বিয়ের অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, রুলে তা জানতে চাওয়া হয়েছিল। পারিবারিক জীবনের বৃহত্তর সুরক্ষায় বহুবিবাহ আইনের ক্ষেত্রে নীতিমালা প্রণয়ন করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তা–ও জানতে চাওয়া হয়েছিল।
হাইকোর্টের রায় কী বলা হয়েছে
চূড়ান্ত শুনানি শেষে রুল ডিসচার্জ (খারিজ) করে গত বছরের ২০ আগস্ট হাইকোর্ট রায় দেন। পূর্ণাঙ্গ রায়টি গত ডিসেম্বর মাসে হাতে পান রিট আবেদনকারী আইনজীবী ইশরাত হাসান। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ অধীন আরেকটি বিয়ের অনুমতির প্রক্রিয়া কোনোভাবেই বৈষম্যমূলক কিংবা স্বেচ্ছাচারী নয় বলে হাইকোর্টের রায়ে এসেছে। রায়ে বলা হয়, আইনটি কোনো পক্ষের (পুরুষ ও নারী উভয়ই) অধিকার খর্ব করে না বা কেড়ে নেয় না। এমনকি এটি বহুবিবাহের জন্য সালিস পরিষদের অনুমতি দিতে অথবা প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা আরোপ করে না। সালিস পরিষদ বিবাহের জন্য কোনো পক্ষের ওপর একতরফা কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না।
রায়ের শেষাংশে বলা হয়, ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারা বহুবিবাহের অনুমতি প্রক্রিয়ায় দেশের নারী নাগরিকদের কোনো মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে না। রুল সমর্থন করে উত্থাপিত যুক্তির সারবত্তা নেই। রুল ডিসচার্জ করা হলো।
তাহলে আবার বিয়েতে কার অনুমতি নিতে হবে
১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ (১) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় তিনি আরবিট্রেশন কাউন্সিল (সালিস পরিষদ) লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন না বা এমন অনুমতি ছাড়া অনুষ্ঠিত কোনো বিয়ে ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রিকরণ) আইনের অধীনে নিবন্ধিত হবে না।
(২) ১ উপধারা অনুযায়ী, অনুমতির ও দরখাস্ত নির্ধারিত ফিসসহ চেয়ারম্যানের নিকট নির্দিষ্ট দপ্তরে দাখিল করতে হবে ও তাতে প্রস্তাবিত বিয়ের কারণগুলো এবং এই বিবাহের বিষয়ে বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীদের সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না, তা উল্লেখ থাকবে।
(৩) ২ উপধারা অনুযায়ী, দরখাস্ত গ্রহণ করার পর চেয়ারম্যান আবেদনকারীকে ও বর্তমান স্ত্রী অথবা স্ত্রীদের প্রত্যেককে একজন করে প্রতিনিধি মনোনীত করতে বলবেন। ওইরূপ গঠিত সালিস কাউন্সিল প্রস্তাবিত বিয়ে প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সংগত বলে মনে করলে যুক্তিযুক্ত বলে মনে হতে পারে—এমন সব শর্ত থাকলে প্রার্থিত আবেদন মঞ্জুর করতে পারেন।
(৪) উপধারা অনুযায়ী, দরখাস্তের বিষয় নিষ্পত্তি করার জন্য সালিসি কাউন্সিল নিষ্পত্তির কারণাদি লিপিবদ্ধ করবেন। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যেকোনো পক্ষ নির্দিষ্ট ফি দিয়ে নির্দিষ্ট দপ্তরে সংশ্লিষ্ট সহকারী জজের কাছে পুনর্বিবেচনা চেয়ে দরখাস্ত দাখিল করতে পারে; তাঁর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে ও কোনো আদালতে এ বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না।
যদি কোনো ব্যক্তি সালিসি কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া আরেকটি বিয়ে করে, সে ক্ষেত্রে কী হবে তা আইনের ৬ (৫) উপধারায় বলা হয়েছে। ৫ (ক) অনুসারে, বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের তলবি ও স্থগিত দেনমোহরের সম্পূর্ণ টাকা তৎক্ষণাৎ পরিশোধ করতে হবে। এই টাকা ওইরূপ পরিশোধ না করা হলে বকেয়া ভূমি রাজস্বরূপে আদায়যোগ্য হবে; এবং ৫ (খ) অনুসারে, অভিযোগে অপরাধী সাব্যস্ত হলে এক বছর পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা জরিমানা (দশ হাজার টাকা পর্যন্ত) বা উভয় প্রকার দণ্ডে দণ্ডিত হবে।
রায়ের পর কী হলো
আইনজীবী ইশরাত হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারা অনুসারে আরেকটি বিয়ে করার অপরাধ প্রমাণ হলে স্বামী বা স্ত্রীর ক্ষেত্রে সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৬১ সালে মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ হয়। অধ্যাদেশে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি ছাড়া যদি স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তাহলে তার এক বছর পর্যন্ত সাজা এবং দশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। কীভাবে অনুমতি নেবে, তাও আইনে বলা আছে। নির্ধারিত ফরম থাকবে, ফি থাকবে—এগুলো দিয়ে তিনি অনুমতি চাইবেন।
চেয়ারম্যান ও দুজন সদস্য নিয়ে সালিস পরিষদ গঠিত হয় উল্লেখ করে এই আইনজীবী বলেন, আরবিট্রেশন কাউন্সিল ব্যক্তির স্ত্রী বা স্ত্রীদের শুনবেন। তারপর আরবিট্রেশন কাউন্সিল অনুমতি দিতেও পারেন, আবার নাও দিতে পারেন। এটি আইনে আগে থেকেই ছিল। নতুন করে হাইকোর্ট দেননি। বহুবিবাহের বিধান (আইনের ৬ ধারা) চ্যালেঞ্জ করেই রিট আবেদনটি করা হয়। কেননা আরবিট্রেশন কাউন্সিলের কাছে এই ক্ষমতাটা থাকা সমীচীন নয়, চেয়ারম্যান পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারেন। তাই আমরা চাচ্ছিলাম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া হবে না, নতুন করে একটি নীতিমালা হোক। শুধু তাই নয়, স্ত্রীদের সম–অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে, সে বিষয়ে কোনো নীতিমালা নেই। উপরন্তু একজন ব্যক্তি একাধিক বিয়ের জন্য শারীরিক, মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম কি না, তা যাচাইয়ের সক্ষমতা কাউন্সিলের নেই।
ইশরাত হাসান বলেন, ‘বহু বছর ধরে অনেকে ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন যে দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি লাগবে। আসলে আইনের কোথাও প্রথম স্ত্রীর অনুমতির বিষয়টি বাধ্যতামূলক আগে থেকেই ছিল না। আগে থেকেই ছিল, আরবিট্রেশন কাউন্সিল। গত বছরের ২০ আগস্ট হাইকোর্ট রুল ডিসচার্জ (খারিজ) করে দেন। ফলে আইনের বিধানটি বহাল থাকল। অর্থাৎ আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি পেলে তারপরে দ্বিতীয় বিয়ে; যেটি আগেও ছিল, এখনো সেটিই আছে।’
তবে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করা হবে বলে জানান তিনি।