বড় সম্ভাবনা নিয়েও এগোতে পারছে না বাঁশের কারুশিল্প

মগ, চায়ের কাপ, পানির বোতল, কলম ও ফুলদানি বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি বান্দরবানের শৈলপ্রপাত থেকে তোলাছবি: মং হাই সিং মারমা

বাঁশের কারুশিল্পের সঙ্গে দুই দশকের বেশি সময় ধরে জড়িয়ে আছেন জেমসাংপুই বম। একসময় নারায়ণগঞ্জে লোককারুশিল্প মেলায় অংশগ্রহণ করেছেন। তখন বাঁশের মগ, গ্লাস, কলমদানি, চায়ের ট্রে, ফুলদানিসহ কারুশিল্পের বিভিন্ন পণ্যের বাজার বেশ ভালো ছিল। এখনো তিনি বাঁশের পণ্য তৈরি করেন। কিন্তু এখন কেবল অবসরেই এই কাজ করেন।

বান্দরবান জেলা শহরতলির ফারুকপাড়ায় জেমসাংপুই বমের সঙ্গে কথা হয় তাঁর বাড়িতে বসে। জানালেন, বাঁশের কারুপণ্যের চাহিদা আছে। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি পুঁজির উদ্যোক্তারা উৎপাদন এবং বিপণনে এগিয়ে না আসায় পণ্য বাজারে পৌঁছানো যাচ্ছে না। উদ্যোক্তারা এগিয়ে এলে এই খাতের সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে। এটি একটি লাভজনক ও কর্মসংস্থানমূলক খাত হয়ে উঠবে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোও বাজার সম্প্রসারণের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে পারে।

জেলা শহরের আশপাশের বিভিন্ন এলাকার বাঁশের কারুশিল্পীরা অবসর সময়ে কারুপণ্য তৈরি করেন। পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে গড়ে ওঠা দোকানপাটে এসব পণ্য বিক্রি হয়। বান্দরবান-চিম্বুক সড়কের লাইমিপাড়া, ফারুকপাড়া, গ্যেৎসেমানিপাড়া ও রাজবিলার উদালবনিয়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কারিগরেরা বাড়ির বারান্দায় অথবা আঙিনায় যন্ত্রপাতি বসিয়ে কাজ করছেন। জুমচাষ ও বাগানের কাজের অবসরে এই কাজ করেন বলে জানালেন তাঁরা।

কয়েকজন কারুপণ্যের কারিগর জানান, পর্যটকদের লক্ষ্য করে শৈলপ্রপাত, চিম্বুক পাহাড়ে ও নীলাচল ও জেলা শহরের দোকানে পণ্য দিয়ে থাকেন। কেউ কেউ চাহিদামাফিক বায়না দিলে তৈরি করেন। বিক্রি হলে পরিবারের জন্য কিছু আয় যোগ হয়। উৎপাদক, কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সবকিছু আছে। বাজারে চাহিদাও আছে। শুধু দরকার বাজার সম্প্রসারণের জন্য উদ্যোক্তা।

বাঁশ-বেতের হস্তশিল্পের কারিগর লালরিন সাং বম ও রাজবিলার থুইসাচিং মারমা জানালেন, সাত-আট বছর আগেও বাঁশের কারুপণ্যের বাজার মোটামুটি জমজমাট ছিল। তখন কিছু বেসরকারি সংস্থা এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন থেকে বাজারজাতকরণে সহযোগিতা করা হতো। তিন পার্বত্য জেলায় (বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি) বনশিল্প গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে কয়েক শ কারুশিল্পীকে প্রশিক্ষণ প্রদান ও প্রযুক্তি সহায়তা করা হয়েছিল। কিন্তু বেসরকারি সংস্থাগুলো প্রকল্প শেষে হাত গুটিয়ে নিয়েছে। উদ্যোক্তা না থাকায় উৎপাদকেরা বাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। এর ফলে পণ্য সরবরাহশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ায় বাজার সংকুচিত হয়ে গেছে।

বাঁশের কারুশিল্প হচ্ছে বাঁশকে কেটে শৈল্পিক কারুকাজে উৎপাদিত পণ্য। মগ, চায়ের কাপ, পানির বোতল, কলম ও ফুলদানি, চায়ের ট্রে, সাবান রাখার কেস, একতারা, দোতারা, ছাইদানিসহ অত্যন্ত আকর্ষণীয় আরও বহু ধরনের দ্রব্যসামগ্রী হাতে তৈরি করেন কারুশিল্পী ও উৎপাদকেরা। এ কাজের প্রধান কাঁচামাল হচ্ছে বাঁশ। বাইজ্যাবাঁশ, মুলি, মিতা, কালীবাঁশ ও ভুদুমবাঁশ ছাড়া অন্য কোনো বাঁশ দিয়ে কারুপণ্য হয় না। একেক ধরনের পণ্য তৈরিতে একেক ধরনের বাঁশের প্রয়োজন। এ ছাড়া তৈরির কাজে উপকরণ হিসেবে রং, গুল সিরিশ, পাতা সিরিশ, গাম, গ্যাস স্প্রে ও গ্রেডিং মেশিন প্রয়োজন হয় বলে কারিগরেরা জানিয়েছেন।

শৈলপ্রপাত ও বান্দরবান জেলা শহরের বাজারে ব্যবসায়ীরা জানালেন, পণ্যের ক্রেতা মূলত পর্যটকেরা। জেলার বাইরে থেকে আসা সচ্ছল ও বিদেশি পর্যটকদের পছন্দ এসব কারুপণ্য। শৈলপ্রপাতের বিক্রেতা নুং হোয় বম বলেন, বাঁশের বোতল, মগ, ছাইদানি, ফুলদানি ও কলমদানি সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। একটি বাঁশের বোতল ৩৫০ টাকা, মগ ১৫০, কলমদানি ১০০ টাকায় বিক্রি হয়। বিদেশি পর্যটক এলে বিক্রি অনেক বেড়ে যায়।
জেলা শহরের কারুপণ্যের ব্যবসায়ী রানা দাশ বলেন, স্থানীয়ভাবে এই পণ্যের চাহিদা নেই। বাইরের লোকজন, বিশেষ করে পর্যটক ও বিভিন্ন কাজে আসা সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তারা স্মারক সামগ্রী হিসেবে কিনে নিয়ে যান।

চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকায় বহু কারুপণ্যের মেলায় পণ্য নিয়ে অংশ নেওয়া জেমসাংপুই বম তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণের আগে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাজারেও বাঁশ-বেতের কারুপণ্য সরবরাহ করা হতো। বর্তমানে আগের অবস্থানে দাঁড়াতে হলে আগের মতো উদ্যোক্তা ও সরকারি-বেসরকারি সহায়তার দরকার। উৎপাদকদের ব্যাংকঋণের কোনো ব্যবস্থা নেই। এ জন্য স্থানীয়ভাবে তাঁদের পক্ষে বড় আকারে কোনো উদ্যোগ নেওয়ারও সুযোগ নেই।

বান্দরবানের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের ব্যবস্থাপক শামীম আলম বলেন, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদিত বিদেশি পণ্যের মান বেশি ও দাম কম। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে হস্তশিল্পের সঙ্গে যান্ত্রিকীকরণের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। সেভাবে পুঁজি বিনিয়োগ করে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। না হলে বিদেশি পণ্যের বিপরীতে বাঁশের কারুপণ্যের টেকা সম্ভব নয়।