গুম, মানবাধিকার কমিশন আইনের খসড়া নিয়ে সংলাপ
গুমের অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত না হলে ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পাবেন না
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং র্যাব-সংক্রান্ত প্রস্তাবিত আইনে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের স্বাধীন তদন্তের সুযোগ খর্ব হচ্ছে। তিনটি পৃথক আইনের খসড়ায় একই ধরনের পরিবর্তন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা কাকতালীয় বিষয় নয়; বরং এর মধ্য দিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সুরক্ষা দেওয়ার একটি নীতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যা বিচার নিশ্চিতের অন্তরায়।
‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ও গুম প্রতিরোধ আইন ২০২৬ (খসড়া): প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা’ শীর্ষক সংলাপে মানবাধিকারকর্মী, গুমের শিকার ব্যক্তি ও অধিকাকর্মীরা এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। আজ বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিডিবিএল ভবনে যৌথভাবে এই সংলাপের আয়োজন করে নাগরিক কোয়ালিশন ও ভয়েস ফর রিফর্ম।
সংলাপে মানবাধিকারকর্মী ও গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান লিটন বলেন, গুমের অভিযোগের তদন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে দেওয়া হলে কার্যকর তদন্ত হবে না। প্রস্তাবিত আইনে নতুন বাহিনী স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তা প্রকৃত তদন্তের সুযোগ তৈরি করে না। একইভাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে শুধু আইন পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; কমিশনে সৎ, দক্ষ, যোগ্য ও সাহসী ব্যক্তিদের নিয়োগও জরুরি।
নতুন আইনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় সরকারের প্রভাব বেশি থাকলে কমিশনের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে বলে সতর্ক করেন নূর খান লিটন। তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের দোহাই দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গুমের ঘটনাগুলো আড়াল করা হয়েছে।
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাবেক গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের আরেক সদস্য নাবিলা ইদ্রিস। তিনি বলেন, গুমের অভিযোগ পুলিশের কাছে দেওয়া এবং পুলিশকেই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় সমস্যা রয়েছে। গুম কমিশনের কাছে পাওয়া দেড় হাজারের বেশি অভিযোগের মধ্যে প্রায় ২৫০টিতে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। আগে এসব বিষয়ে অগ্রগতি না হওয়ার একটি কারণ ছিল, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ জিডি বা অভিযোগ গ্রহণ করত না।
নিরাপত্তা বাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার কারণে তারা আর প্রকৃত অর্থে নিরাপত্তা বাহিনী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে না
সংলাপে আলোকচিত্রী ও অধিকারকর্মী শহিদুল আলম বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার কারণে তারা আর প্রকৃত অর্থে নিরাপত্তা বাহিনী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে না। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নিজেরাও এভাবে ব্যবহৃত হতে চান না; তাঁরা পেশাজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে চান।
জনগণের করের টাকায় পরিচালিত নিরাপত্তা বাহিনীর কাজ জনগণকে সুরক্ষা দেওয়া, কোনো সরকারের রাজনৈতিক স্বার্থে জনগণের বিরুদ্ধে তাদের ব্যবহার করা নয় বলে উল্লেখ করেন শহিদুল আলম। সরকারের প্রতি নিরাপত্তা বাহিনীকে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আগের সরকারের মতো একই ধরনের আচরণ নতুন সরকারের কাছ থেকে পেলে জুলাইয়ের শহীদদের আত্মত্যাগের অর্থ কী, সেই প্রশ্ন উঠবে।
‘অপরাধীই যদি তদন্তকারী হয়, ন্যায়বিচার হবে কীভাবে?’
সংলাপে সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান বলেন, প্রস্তাবিত আইন নিয়ে সংসদে আলোচনা ও মতামত দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা সরকার উপেক্ষা করেছে। আইন বাতিলের সময় সংসদের কার্যনির্বাহী কমিটিতে এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার সিদ্ধান্ত ছিল। প্রস্তাবিত খসড়া সামনে আসার পর তিনি মনে করছেন, আগের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন এতে নেই। বরং এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের ভেতরে থাকা পুরোনো ক্ষমতাকাঠামো বা ‘ডিপ স্টেট’ এখনো সংস্কারের পথে বাধা হয়ে আছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।
গুমের শিকার মীর আহমাদ বিন কাসেম বলেন, প্রস্তাবিত আইন পাস হলে সরকারকে বোঝাতে হবে যে এতে তাদের ক্ষমতা বাড়বে না, বরং জনগণ ও ভুক্তভোগীদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে বিদ্যমান ক্ষমতাও হারাতে হতে পারে। তিনি বলেন, গুম ও মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে কোনো রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা মতাদর্শিক বিভাজনের সুযোগ নেই। নিজের সন্তানসহ পরবর্তী প্রজন্ম যেন গুমের ভয় ছাড়া মতপ্রকাশ করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব।
এ বিষয়ে কোনো আপস না করার ঘোষণা দিয়ে জামায়াতে ইসলামীর এই সংসদ সদস্য বলেন, সরকারকে প্রস্তাবিত আইন থেকে সরে এসে কার্যকর ও অর্থবহ আইন করার জন্য প্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করতে তিনি বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক ভূমিকা রাখবেন।
গুমের অভিযোগের তদন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে দেওয়া হলে কার্যকর তদন্ত হবে না। প্রস্তাবিত আইনে নতুন বাহিনী স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তা প্রকৃত তদন্তের সুযোগ তৈরি করে না
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক প্রধান কৌঁসুলি তাজুল ইসলাম বলেন, গুমের অভিযোগে অভিযুক্ত নিরাপত্তা বাহিনীকে নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না। তিনি বলেন, ‘অপরাধীই যদি তদন্তকারী হয়, ন্যায়বিচার হবে কীভাবে?’
তাজুল ইসলামের মতে, প্রস্তাবিত আইনে বাহিনীর বিরুদ্ধে অপরাধ তদন্তের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট বাহিনীর হাতে দেওয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি লঙ্ঘিত হচ্ছে। তদন্ত সঠিকভাবে না হলে আদালতের পক্ষেও বিচার করা সম্ভব নয়। তাই প্রস্তাবিত আইন সংসদে পাস না করে পুনর্বিবেচনার জন্য পাঠানোর আহ্বান জানান তিনি।
গুমসংক্রান্ত আইন পাস ঠেকাতে ভূমিকা রাখার আহ্বান
সংলাপে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান বলেন, কোনো ঘটনা তদন্তই করা না গেলে তা প্রমাণ করা সম্ভব নয়। তদন্ত ও সাক্ষ্য—দুটিই বিচারপ্রক্রিয়ার জন্য অপরিহার্য।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে একতাবদ্ধ হয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি এবং প্রয়োজনে এ দাবিতে আন্দোলনও করার পরামর্শ দেন মজিবুর রহমান।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া তরুণদের রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম অল্টারনেটিভসের সংগঠক তাজনূভা জাবীন অভিযোগ করে বলেন, ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পালনকে অপরাধ থেকে অব্যাহতির কারণ হিসেবে রাখা হয়নি, কিন্তু ২০২৬ সালের প্রস্তাবিত আইনে সেই সুযোগ ফিরিয়ে আনা হয়েছে। একই সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তদন্ত পুলিশের হাতে দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
তাজনূভা বলেন, রাজনৈতিক মতাদর্শের বিভেদ ভুলে সবাইকে এক হয়ে প্রস্তাবিত মানবাধিকার ও গুমসংক্রান্ত আইনটি সংসদে পাস হওয়া ঠেকাতে ভূমিকা নিতে হবে।
সংলাপ সঞ্চালনা করেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর। এতে আরও বক্তব্য দেন গুমের শিকার হওয়া ফাহাদ চৌধুরী, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রচার ও প্রকাশনাবিষয়ক সমন্বয়ক সৈয়দ হাসিব উদ্দিন হোসেন, ডেইলি ওয়াদার ম্যানেজিং এডিটর ফয়সাল মাহমুদ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় সংগঠক আরমান হোসাইন ও সাবেক পুলিশ সংস্কার কমিশনের সদস্য জারিফ রহমানসহ অনেকে।