আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথম অবকাশ
দেশের অন্য সব আদালতের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও এখন বছরের নির্দিষ্ট সময় থাকবে অবকাশ বা ছুটি। এ জন্য সংশোধন আনা হয়েছে ট্রাইব্যুনাল আইনের কার্যবিধিতে। দেড় দশকের মধ্যে এই প্রথম অবকাশে যাচ্ছেন বিশেষ এই আদালত। প্রথম দফায় ছুটি থাকছে আগামী ১ জুলাই থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো.আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ১ জুলাই থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল বন্ধ থাকবে। বন্ধের মধ্যে রুটিন কাজ হবে, স্বাভাবিক কাজ হবে না।
দেড় দশক আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের যাত্রা শুরু হলেও অন্য সব আদালতের মতো অবকাশ ছিল না।
ট্রাইব্যুনালকে ‘আলাদা সত্তা’ উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ট্রাইব্যুনাল আইনের কার্যবিধি সংশোধন করে ছুটির বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের কার্যবিধির সংশোধন করা হয়েছে গত ১৭ মে। সংশোধনীতে বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনাল আইনের কার্যবিধির ৫৯ (এ) ধারায় ‘অবকাশ’ সংযোজিত হবে।
৫৯ (এ) ধারায় চারটি উপধারা যুক্ত করা হয়েছে। এসব উপধারায় বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনাল ও রেজিস্ট্রি প্রতিবছরের ১ জুলাই থেকে ২০ জুলাই এবং ১৭ ডিসেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অবকাশ পালন করবে। অবকাশকালীন ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম কমপক্ষে একজন সদস্য অথবা চেয়ারম্যানের মাধ্যমে অব্যাহত থাকবে। অবকাশকালে দায়িত্ব পালনকারী চেয়ারম্যান বা সদস্য বছরের অন্য যেকোনো মাসে একই সময়সীমার অবকাশ ভোগ করতে পারবেন।
১ জুলাই থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল বন্ধ থাকবে। বন্ধের মধ্যে রুটিন কাজ হবে, স্বাভাবিক কাজ হবে না।
কার্যবিধির সংশোধনীতে আরও বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনালের কর্মকর্তা ও অন্যান্য কর্মচারী অবকাশকালীন সময়ে পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করবেন। অবকাশের সময় কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দায়িত্ব বণ্টন করবেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বা রেজিস্ট্রার। জুলাই ও ডিসেম্বরে উল্লিখিত অবকাশ ছাড়াও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা অন্যান্য যেসব ছুটি ও সরকারি অবকাশ ভোগ করেন, সেসবও ভোগ করতে পারবেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা।
ট্রাইব্যুনালে ছুটির বিষয়ে প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ট্রাইব্যুনালের স্থাপনের পর এই ছুটির বিধান ছিল না। এর আগে সরকারি ছুটি ও ব্যক্তিগত ছুটি ছাড়া এমন ছুটিতে ট্রাইব্যুনাল যায়নি। এটা নতুন যুক্ত করা হয়েছে।
এই ছুটিতে জরুরি কিছু কাজ চলবে জানিয়ে তিনি বলেন, কাউকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে এল, কাউকে জিজ্ঞাসাবাদে নেওয়া প্রয়োজন—এমন ছোটখাট কাজগুলো চলবে।
দেড় দশক পর অবকাশ
একাত্তরে সংঘটতি মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ (আইন), ১৯৭৩–এর আওতায় ২০১০ সালের ২৫ মার্চ গঠিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। বর্তমানে কার্যক্রম–নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ তখন ছিল ক্ষমতায়।
প্রথমে তিন সদস্যের একটি ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল। এরপর ২০১২ সালের ২২ মার্চ আরও একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।
ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ৪৪টি ও ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে ১১টি মামলার রায় এসেছে। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ছয় আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচজনই জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় নেতা।
২০১৫ সালের শেষ দিকে ট্রাইব্যুনাল–২ অকার্যকর হয়ে যায়। তবে ট্রাইব্যুনাল–১–এর কার্যক্রম চলমান ছিল।
বর্তমানে দুটি ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ আমলে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে। এ পর্যন্ত চার মামলার রায়ে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছে। ৪৩ জন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া এবং একজন পেয়েছেন ক্ষমা।
ছাত্র–গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই আন্দোলন এবং আওয়ামী লীগের সময়কালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারও এই ট্রাইব্যুনালে করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এরপর প্রথমে ট্রাইব্যুনাল–১ পুনর্গঠন করা হয়। বিচার কার্যক্রমকে গতিশীল করতে গত বছরের ৮ মে ট্রাইব্যুনাল–২ গঠন করে সরকার।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে চারটি মামলার রায় ইতিমধ্যে দিয়েছেন এই ট্রাইব্যুনাল দুটি। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ চার মামলার রায়ে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছে। ৪৩ জন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া এবং একজন পেয়েছেন ক্ষমা।