রাজনৈতিক সহিংসতায় ২০২৪ সালে নিহত ৮৯: এমএসএফ

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)

মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) বলেছে, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৭০১টি। এসব ঘটনায় সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৪ হাজার ৯১৯ জন। তাঁদের মধ্যে ৮৯ জন নিহত এবং ৪ হাজার ৮৩০ জন আহত হন।

এমএসএফ বলেছে, আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৯৮ জন গুলিবিদ্ধ। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৩ জন আওয়ামী লীগ, ২৩ জন বিএনপি এবং ১৩ জন বিভিন্ন শ্রেণি–পেশা ও বয়সের সাধারণ নাগরিক, যাঁদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া যায়নি।

২০২৪ সালের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে এসব তথ্য উল্লেখ করেছে এমএসএফ। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি সুলতানা কামালের স্বাক্ষরিত এ প্রতিবেদনটি আজ মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো হয়।

এমএসএফ বলেছে, দুষ্কৃতকারী, পূর্বশত্রুতা ও রাজনৈতিক রোষানলে পড়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ২৩ জন নেতা–কর্মী নিহত হন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৬ জন আওয়ামী লীগের, ৬ জন বিএনপির এবং ১ জন জামায়াতে ইসলামের কর্মী। বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুষ্কৃতকারীদের হাতে নিহত হয়েছেন ১২ জন, রাজনৈতিক রোষানলে ৪ জন এবং ৭ জনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে।

গণ–অভ্যুত্থানে হতাহত

এমএসএফ বলেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রাষ্ট্রীয় সহিংসতায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের সঠিক সংখ্যা নিরূপণের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি সারা দেশে একটি জরিপ পরিচালনা করে। ‘স্টাডি অন হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনস ইন বাংলাদেশ: জুলাই–আগস্ট ২০২৪’ স্বল্প সময়ের এ জরিপ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগের কর্মীদের অতিরিক্ত বল প্রয়োগের সহিংস ঘটনায় ৫ আগস্ট পর্যন্ত সহিংসতা ও পুলিশি হামলা শিকার হয়েছেন ১০ হাজার ৪৭২ জন। সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে নিহত হয়েছেন ৮৮১ জন, আহত হয়েছেন ৭৮৭৩, হুমকির শিকার ৯৩৩ জন, নির্যাতনের শিকার ৭৩১ জন এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৫৪ জন। ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে ৩১ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৮৭৬টি; যার মধ্যে অগ্নিসংযোগ ৩৩৩, ভাঙচুর ও লুটপাট ৩০০, সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি আক্রমণ ২২৩, মন্দির ও মাজারে আক্রমণের ২০টি ঘটনা রয়েছে।

সংখ্যালঘু নির্যাতন

চলতি বছরে ২৬১টি ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ২৪০টি এবং জাতিগত সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ২১টি। ৮৭টি ঘরবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে, ৪৪টি প্রতিমা ভাঙচুর, ৫৫টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখলের চেষ্টা ও অগ্নিসংযোগ, জমি দখল ও ২৩টি উপাসনালয়ে আক্রমণ ও অগ্নিসংযোগ করা, ১০টি ঘটনা ঘটেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তির অভিযোগে সহিংসতা, ৫টি ঘটনাতে চাঁদা দাবি করা হয়েছে এবং জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১১টি ঘটনায় ১ জন নিহত ও ৩৭ জন আহত হন। এ ছাড়া আগস্ট মাসে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সাতক্ষীরাতে এক গৃহবধূ ধর্ষণের শিকার হন এবং বাগেরহাট ও খুলনাতে ২ জন সংখ্যালঘুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

বিচারবহির্ভূত হত্যা

এমএসএফ বলেছে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বেআইনি, অসাংবিধানিক এবং ফৌজদারি অপরাধ, যা কখনই সমর্থনযোগ্য নয়। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধে মানবাধিকার সংগঠনগুলো সোচ্চার ভূমিকা রাখলেও ‘ক্রসফায়ার’ বা বন্দুকযুদ্ধে মৃত্যুর ঘটনাগুলো সরকার অস্বীকার করে আসছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও এমএসএফের সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের ১৬টি ঘটনা হয়েছে। সংঘটিত বন্দুকযুদ্ধে ঘটনায় ২২ জন যুবক নিহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে ১৯ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। ১৬টি ঘটনার মধ্যে ১৩টি ঘটনায় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ অভিযানে ১৯ জন, অপর তিনটি ঘটনায় বিজিবি, পুলিশ ও র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ৩ জন নিহত হন।

কারা হেফাজতে মৃত্যু

এমএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে কারা হেফাজতে ১০৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ বছর কারা হেফাজতে মৃত্যু কারাবন্দীদের মধ্যে কয়েদি ৪৯ জন ও হাজতি ৫৯ জন। তথ্য অনুযায়ী, ৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে অসুস্থতার কারণে। একজনের মৃত্যুর ক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ, কারাবন্দীদের মধ্যে সংঘর্ষে দুজন নিহত হয়েছেন। কারাগারে অভ্যন্তরে ছয়জন আত্মহত্যা করেছেন, যাঁদের মধ্যে তিনজনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গাজীপুরের কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারের অফিস সহকারীর লাশ উদ্ধার করা হয়।